‘তারেক রহমান চাচ্চু আমাদের বাবাদের খুঁজে দিন’

‘বহু সন্তান আজও অপেক্ষায় আছে, তাদের গুম হয়ে যাওয়া বাবা একদিন ফিরে এসে দরজায় কড়া নাড়বেন। বহু মা এখনো আশায় আছেন, হারিয়ে যাওয়া সন্তানটি আবার ‘‘মা’’ বলে ডাকবেন। এই অপেক্ষা রাষ্ট্রের জন্য একটি বড় দায়’ বলছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

গতকাল শনিবার দুপুরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে মতবিনিময় করেন তিনি। ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’ এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে সাবেক বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

তারেক রহমানকে কাছে পেয়ে স্বজনরা তুলে ধরেছেন গুমের শিকার হওয়া তাদের সেই প্রিয়জনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি। কেউ জানাচ্ছিলেন বাবাকে হারিয়ে কী নিরানন্দ জীবন কাটছে তাদের। সন্তানহারা মা তুলে ধরছিলেন, নিজের প্রিয় সন্তানকে তারা আর দেখতে পান না অনেক অনেক বছর, তারা কোথায় হারিয়ে গেল! গুম হওয়া এক সন্তানের মা তারেক রহমানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে দেখা যায়।

এসময় কাঁদতে কাঁদতে গুম হওয়া পারভেজ হোসেনের মেয়ে আদিবা ইসলাম হৃদি। গুম কমিশনের উদ্দেশে বলে, গুম কমিশন বলে, ধরে নিন ওরা গুম... ওরা মৃত। কেন? এটা কী হাতের অঙ্ক? যে আমরা ধরে নেব আমাদের বাবারা আর নেই? একটা দল করা কোনো অপরাধ না। দল সবাই করে। এর জন্য এটা কেমন বিচার এই বাংলাদেশে?

বক্তব্যের একপর্যায়ে হৃধি বলে ‘আমি তারেক রহমান চাচ্চুর কাছে আশা করি যে আমাদের বাবাদের খুঁজে দেবেন। এই বাংলাদেশের মাটিতে বিচার করবেন এই গুমের।’

২০১৩ সালে ২ ডিসেম্বর গুম হওয়া সোহেল হোসেনের মেয়ে শাফা হোসেন বলে, ‘এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাবার অপেক্ষায় আছি, কিন্তু আজও বাবার মুখটা দেখতে পারিনি। আমরা আমাদের বাবাকে ফেরত চাই।’

একই বছরের ৪ ডিসেম্বর গুম হওয়া কায়সার হোসেনের কন্যা লামিয়া আক্তার মিম বলে, ‘আমি জানি না “বাবা” জিনিসটা আসলে কী। যদি জানতাম, বাবাকে আর কোনোদিন দেখতে পাব না, তাহলে সেদিন শক্ত করে বাবাকে জড়িয়ে ধরতাম।’

স্বজনদের এসব আর্তনাদ স্পর্শ করে তারেক রহমানকেও। মঞ্চেই বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখা যায় তাকে।

পরে দেওয়া বক্তব্যে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘রাষ্ট্র কখনোই আপনাদেরকে ভুলে যেতে পারে না। সব শহীদের আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করে রাখতে আগামী দিনে বিএনপি কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতার কারণে এই মুহূর্তে আমি হয়ত বিস্তারিতভাবে সেই পরিকল্পনা আজকের এই অনুষ্ঠানে তুলে ধরতে পারছি না। কিন্তু তারপর বলতে যদিও কষ্ট হচ্ছে যে আমরা দেখেছি নির্বাচন কমিশনের রিসেন্ট কিছু বিতর্কিত ভূমিকা বা বিতর্কিত অবস্থান। তারপরও রাজনৈতিক একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে আমরা ধৈর্য্যরে পরিচয় দিতে চাই।’

তিনি বলেন, ‘প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে গণতান্ত্রিক মানুষ যেন এই শহীদদের বা এই গুম হয়ে যাওয়ার সদস্য এখনো যাদের অপেক্ষায় আমরা আছি, পরিবার অপেক্ষায় রয়েছেন, তারা প্রেরণা হয়ে থাকবেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আমাদের দল বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন নিয়ে রাষ্ট্র গঠনে, সরকার গঠনে সক্ষম হলে পরে শহীদ পরিবারদের নামে রাষ্ট্রে বা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কিংবা রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পেশা স্থাপনার নামকরণ করব যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাদের গৌরবের সঙ্গে স্মরণ রাখতে পারে।’

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রপ্রিয় প্রতিটি মানুষের সামনে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ আমাদের সামনে এসেছে। কেউ কেউ বিভিন্ন রকম কথা বলে একটি অবস্থা তৈরি করার চেষ্টা করছে, যেখানে এই গণতন্ত্রের পথ যেটি তৈরি হয়েছে সেটি যাতে বাধাগ্রস্ত হয়। আমি অনুরোধ করব, বাংলাদেশের দলমত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, মানুষকে আজ সজাগ থাকার জন্য যারা বিভিন্ন অসিলা দিয়ে বিতর্ক তৈরি করে গণতন্ত্রের পথকে আবার নষ্ট করার বা ব্যাহত করার চেষ্টা করছেন। তারা যাতে সফল না হয়।’

অতীতের সব অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করতে আগামীতে গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতিষ্ঠা জরুরি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘এবার যদি আমরা একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকার গঠনের সুযোগ হাতছাড়া করি, তাহলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের প্রতি জুলুম করা হবে, তাদের আত্মত্যাগের প্রতি অমর্যাদা করা হবে, ’৭১ সালে যারা শহীদ হয়েছেন দেশকে স্বাধীন করার জন্য, ’৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, বিগত ১৬ বছরে যারা গুম-শহীদ হয়েছেন, বিভিন্নভাবে নির্যাতিত পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, ’২৪ সালের ৫ আগস্টের আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন প্রত্যেকটি অন্যায়ের বিচারকে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে আগামী দিনে অবশ্যই বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার দরকার।’

তিনি বলেন, ‘দেশের আইন অনুযায়ী যাতে ন্যায়বিচার পেতে পারে তার একটি মাত্র উপায় হচ্ছে, আগামী দিনে অবশ্যই একটি গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যেই সরকার জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণে কাজ করবে, যারা নির্যাতিত, অত্যাচারিত হয়েছেন তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করবে। আসুন, আমরা আজকে সেই শপথ গ্রহণ করি। আমরা ধৈর্য্য ধারণ করি, আমরা সজাগ থাকি যাতে আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রা যা শুরু হয়েছে তাতে যাতে ব্যাঘাত করতে না পারে। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর প্রতি সাধ্যমতো রাষ্ট্রীয় সহায়তার হাত বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি।’

বিএনপির একজন নেতাকর্মীও রাজপথ ছাড়েনি মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, ‘গুম খুন অপরণের শিকার এসব মানুষের শোকাতুর পরিবারগুলোর আশা ভাষা হয়ে কাজ করে যাচ্ছে একটি সংগঠন “মায়ের ডাক”। দল হিসেবে সাধ্য এবং সামর্থ্যরে সবটুকু নিয়ে নির্যাতিত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছে “আমরা বিএনপি পরিবার”। দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের তীব্রতা কখনো কখনো হয়তো কিছুটা স্তিমিত হয়েছে কিংবা আন্দোলন কখনো তুঙ্গে উঠেছে এবং এই আন্দোলন করতে গিয়ে বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য গুম-খুন, অপহরণ মিথ্যা মামলার হয়রানি-নির্যাতনের পর বিএনপির একজন নেতাকর্মীও কিন্তু রাজপথে ছাড়েনি। একই পরিবারের এক ভাই গুম হয়েছে আরেক ভাই গিয়ে তার জায়গায় পরের দিন রাজপথে আন্দোলনকে আরও তীব্রতর করার প্রতিজ্ঞার শপথ নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে।’

আমাদের কর্মীরা গুপ্ত বেশ ধারণ করেনি জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘কৌশলের নামে গুপ্ত কিংবা সুপ্তবেশ ধারণ করেনি বিএনপির কর্মীরা। আমি বিশ্বাস করি, দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, যে দলের নেতাকর্মীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের আপসহীন ভূমিকা রাখতে পারে সেই দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কিংবা অপপ্রচার চালিয়ে কেউ এই দলকে দমন করে রাখতে পারবে না ইনশাআল্লাহ। ফ্যাসিবাদী আমলের নির্যাতনের শিকার আমার সামনে বসা হাজারো প্রিয় মুখ, আপনাদের বুকে আত্মত্যাগ, আপনাদের বুকভরা কষ্ট আমরা যারা আজ পেছনে রয়ে গিয়েছি আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে চেষ্টা করব যাতে এটি বৃথা না যায় ইনশাআল্লাহ। ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা গুম হয়েছেন, শহীদ হয়েছেন তাদের প্রতি আগামী দিনে এর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আকাক্সক্ষা আমরা দেখছি। সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকারের অবশ্যই অনেক অনেক দায় এবং দায়িত্ব রয়েছে।’

আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনের সভাপতিত্বে মায়ের ডাকের সভানেত্রী সানজিদা ইসলাম তুলি, আমরা বিএনপি পরিবারের সদস্য জাহিদুল ইসলাম রনি ও মোকসেদুল মোমিন মিথুনের যৌথ সঞ্চালনায় মতবিনিময় অনুষ্ঠানে গুম থেকে ফিরে আসা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আনিসুর রহমান তালুকদার খোকন, আমরা বিএনপি পরিবারের প্রধান উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, গুম হওয়া এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিণী তাহসিনা রুশদীর লুনাসহ গুম হওয়া পরিবারের সদস্যরা তাদের বেদনা ও কষ্টের কথা তুলে ধরেন।