৭
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সমর্থনকে ঘিরে যে সমালোচনা চলছে, তা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে ‘ভিত্তিহীন’ বলে মন্তব্য করেছে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর।
সরকারের পক্ষ থেকেই এরই মধ্যে এই গণভোট নিয়ে নানা রকম প্রচারণা চালানো হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে গণভোটে শিক্ষার্থীদের ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করতে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, স্কুল ও মাদ্রাসা পর্যায়ে প্রচারণা চালানোরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রচারণার অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবর্তনের জন্য ‘হ্যাঁ’ শিরোনামের লিফলেট ও পুস্তিকা বিতরণ, মোবাইল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে গণভোটের ওপর নির্মিত ডকুমেন্টারি, ভিডিও ক্লিপ ও গান রিলিজ, বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে ব্যানার, ফেস্টুন ও স্টিকার সাঁটানো হবে। গতকাল রবিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে (ইউজিসি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির সঙ্গে এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) ড. আলী রীয়াজ বলেন, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রকাঠামো ভেঙে রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটাবে এবারের গণভোট।
তিনি বলেন, একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’তে রায়ের কোনো বিকল্প নেই।
এদিকে গতকাল রবিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের এই অবস্থান কোনোভাবেই প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার পরিপন্থী নয়; বরং এটি ‘সরকারের দায়িত্ব ও ম্যান্ডেটের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলছে, ‘বাংলাদেশের এই সংকটময় সময়ে নীরবতা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়; বরং তা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাবই ফুটিয়ে তোলে।’
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার কেবল দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনা বা একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের উদ্দেশ্যে গঠিত হয়নি। দীর্ঘদিনের অপশাসন, শাসনতান্ত্রিক সংকট, জনঅনাস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই এই সরকার গঠিত হয়েছে। এই সরকারের মূল দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের ভাষ্য, গত আঠারো মাসে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমেই বর্তমান সংস্কার প্যাকেজ তৈরি হয়েছে। ফলে এই সংস্কারের প্রশ্নে সরকারের অবস্থান ‘না’ নেওয়ার প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, যে অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে গঠিত, গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের মুহূর্তে সেই সংস্কার থেকে সেই সরকার নিজেকে দূরে রাখবে এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়।
এতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক রীতিতে সরকারপ্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের বিষয়ে নীরব থাকার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরাই গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের স্বাভাবিক ভূমিকা।
বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, গণতান্ত্রিক বৈধতার মূল প্রশ্ন হলো নেতারা অবস্থান নিলেন কি না, তা নয়; বরং ভোটাররা সেই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করতে স্বাধীন কি না, বিরোধী পক্ষ প্রকাশ্যে প্রচারণা চালাতে পারছে কি না, পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য কি না।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসব শর্ত বজায় রয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়। এতে বলা হয়, গণভোটের বৈধতা নেতাদের নীরবতার ওপর নির্ভর করে না; এটি নির্ভর করে ভোটারদের স্বাধীনভাবে পক্ষে বা বিপক্ষে মত দেওয়ার সুযোগের ওপর।
প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর বলছে, বিশ্বের বহু দেশে সরকারপ্রধানরা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় পরিবর্তনসংক্রান্ত গণভোটে প্রকাশ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। এসব ঘটনাকে গণতান্ত্রিক রীতির ব্যত্যয় হিসেবে নয়, বরং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের প্রকাশ হিসেবে দেখা হয়েছে।
সরকারপ্রধানের দপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান যৌক্তিক ও সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের রয়েছে সংস্কারমূলক ম্যান্ডেট, প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনের জরুরি প্রয়োজনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, ভোটারদের প্রতি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির নীতিতে বিশ্বাসী। এছাড়া শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের জনগণেরই। এটাই গণতন্ত্রের নিশ্চয়তা। নেতৃত্ব সেই সিদ্ধান্ত কেড়ে নেয় না; বরং তা স্পষ্ট ও অর্থবহ করতে সহায়তা করে।
এদিকে শনিবার রাজধানীর বিয়াম ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিভাগীয় প্রশাসনের এক মতবিনিময় সভায় প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’র প্রচারণায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের সামনে কোনো আইনগত বাধা নেই।
তিনি বলেন, এবারের গণভোট কোনো দলকে ক্ষমতায় বসানো কিংবা কোনো দলকে ক্ষমতায় যেতে বাধা দেওয়ার এজেন্ডা নয়; এটি রক্তের অক্ষরে লেখা জুলাই জাতীয় সনদভিত্তিক রাষ্ট্র সংস্কারের এজেন্ডা, যা বাংলাদেশের সব মানুষের। এই গণভোট হলো জনগণের সম্মতি নেওয়ার একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে নির্ধারণ হবে আগামীর বাংলাদেশ কোন পথে চলবে।