বিতর্কিত ফাইনালে আফ্রিকান ফুটবলের দূত হয়ে উঠলেন সাদিও মানে

গোল করে নয়, বরং নেতৃত্ব, ধৈর্য ও দায়বদ্ধতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আবারও সেনেগালের নায়ক হয়ে উঠলেন সাদিও মানে। বিতর্ক, বিশৃঙ্খলা ও নাটকীয়তায় ভরা আফ্রিকা কাপ অব নেশনসের ফাইনালে স্বাগতিক মরক্কোর বিপক্ষে সেনেগালের ঐতিহাসিক জয়ে সবচেয়ে বড় অবদান ছিল এই অভিজ্ঞ তারকার।

রবিবারের ফাইনালে শেষ মুহূর্তে বিতর্কিত পেনাল্টি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সেনেগালের খেলোয়াড়রা মাঠ ছাড়লে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। দলের কোচ পাপে থিয়াও খেলোয়াড়দের ড্রেসিংরুমে ফেরার নির্দেশ দেন। এমন মুহূর্তে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন সাদিও মানে।

ড্রেসিংরুমে ঢুকে গোলরক্ষক এদুয়ার মেন্ডিকে সঙ্গে নিয়ে সতীর্থদের আবার মাঠে ফেরান। প্রায় ১৬ মিনিট বন্ধ থাকার পর খেলা পুনরায় শুরু হয়। সেই সময় মরক্কোর তারকা ব্রাহিম দিয়াজ প্যানেনকা শটে নেওয়া পেনাল্টি সহজেই ধরে ফেলেন মেন্ডি, যা ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

গোলশূন্য অবস্থায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ৯৪তম মিনিটে মিডফিল্ডার পাপে গেয়ির দুর্দান্ত শটে গোল করে সেনেগালকে এনে দেন দ্বিতীয় আফ্রিকা কাপ শিরোপা। নাটকীয় এই জয়ে আবারও মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে ‘তেরাঙ্গা লায়ন্স’রা।

sadio mane and hakimi duel

ম্যাচ শেষে মানে বলেন, ‘ফুটবল পুরো পৃথিবীর খেলা। এই খেলাকে ভালো ভাবমূর্তি দেওয়া আমাদের দায়িত্ব। রেফারি পেনাল্টি দিলে খেলা বন্ধ করে মাঠ ছেড়ে দেওয়া সবচেয়ে খারাপ দৃষ্টান্ত হতো—বিশেষ করে আফ্রিকান ফুটবলের জন্য। আমি হারতে রাজি, কিন্তু এমন কিছু হতে দিতে পারি না।’

পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে সতীর্থদের কাছ থেকে অধিনায়কত্বের বাহুবন্ধনী পান মানে—যা তার প্রতি দলের শ্রদ্ধা ও আস্থার প্রতীক।

সাবেক নাইজেরিয়ান তারকা ড্যানিয়েল আমোকাচি বলেন, ‘দলকে মাঠে ফেরাতে মানে যে ভূমিকা রেখেছে, তা অসাধারণ। সে শুধু একজন বড় খেলোয়াড় নয়, সে আফ্রিকান ফুটবলের সত্যিকারের দূত।’

সাবেক মরক্কো আন্তর্জাতিক হাসান কাশলুলও বলেন, ‘মানের হস্তক্ষেপ না হলে আফ্রিকান ফুটবলই হেরে যেত। সে দেখিয়েছে সে কত বড় মানুষ।’

দক্ষিণ-পশ্চিম সেনেগালের ছোট্ট গ্রাম বাম্বালিতে লাল মাটির মাঠে ফুটবল শুরু মানের। ১৩ বছর বয়সে ২০০৫ সালের লিভারপুলের ঐতিহাসিক চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ের ম্যাচ দেখা থেকেই তার স্বপ্নের শুরু। সেই মানেই পরে জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, প্রিমিয়ার লিগ এবং এখন দুটি আফ্রিকা কাপ। ২০২১ সালের ফাইনালে মিস করা পেনাল্টির পর শুটআউটে জয়সূচক গোল করে জাতীয় নায়ক হন তিনি। সেই সাফল্যের স্মরণে নিজ এলাকার কাছে একটি স্টেডিয়ামও তার নামে করা হয়।

৩৩ বছর বয়সী মানে আগেই জানিয়েছেন, এটাই তার শেষ আফ্রিকা কাপ। তবে সতীর্থ পাপে গেয়িসহ অনেকেই চান ২০২৭ সালের টুর্নামেন্টেও তাকে জাতীয় দলে দেখতে। গেয়ি বলেন, ‘সে সেনেগালের কিংবদন্তি। আমরা তাকে আরও কিছু বছর আমাদের সঙ্গে রাখতে চাই।'

ক্যারিয়ারের সাফল্যের পাশাপাশি মানবিক কাজেও অনন্য মানে। নিজ গ্রামে হাসপাতাল ও স্কুল নির্মাণে সহায়তা, মসজিদ নির্মাণ, করোনাকালে সাহায্য—সবকিছুতেই তিনি নীরবে পাশে থেকেছেন। ইংল্যান্ডে খেলার সময় মসজিদের টয়লেট পরিষ্কার করেও আলোচনায় এসেছিলেন, তবে প্রচারের জন্য নয়, নীরব সেবার মানসিকতা থেকেই।

সেনেগালের ডিফেন্ডার মুসা নিয়াখাতে বলেন, ‘সাদিও মানে আফ্রিকান ফুটবলের জন্য যা প্রতিনিধিত্ব করে, তা কয়েকটি বাক্যে বোঝানো অসম্ভব।’