দেশের পুঁজিবাজারে বিদ্যমান অবস্থা সম্পর্কে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জানিয়েছেন পুঁজিবাজারের অংশীজনরা। গতকাল বুধবার রাজধানীর গুলশান বিএনপির চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাতে উপস্থিত হয়ে খাতসংশ্লিষ্টরা বিগত সময়ে শেয়ারবাজারে লুটপাট, অনিয়ম ও দুর্নীতি সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন। এ সময় দুই স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন, মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে পুঁজিবাজারের সমস্যাগুলো সম্পর্কে তারেক রহমানকে মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন এবং ভবিষ্যতে দেশ ও পুঁজিবাজারের স্বার্থে বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
বৈঠকে ডিএসইর চেয়ারম্যান মমিনুল ইসলাম, পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন ও রিচার্ড ডি রোজারিও, ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম, বিএমবিএ সেক্রেটারি সুমিত পোদ্দারসহ ডিএসই-সিএসই-ডিবিএ ও বিএমবিএর নেতারা অংশ নেন।
বৈঠক সম্পর্কে ডিবিএর সভাপতি সাইফুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পুঁজিবাজারের অংশীজনরা খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করেছি। বিদ্যমান সমস্যাগুলো কি সেসব বিষয়ে তিনি জানতে চেয়েছেন। আমরাও বিনিয়োগকারীও বাজারসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবহিত করেছি। আমার যেটা মনে হয়েছে, বিএনপি চেয়ারম্যান দীর্ঘদিনে দেশে না থাকলেও দেশের প্রতিটি খাত সম্পর্কে খোঁজখবর রেখেছেন। তারেক রহমান সব বিষয় মনোযোগ দিয়ে শোনেন এবং বিএনপি ক্ষমতায় এলে পুঁজিবাজারের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করার আশ্বাস দিয়েছেন।’
ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন জানান, বিএনপি চেয়ারম্যান তাদের প্রতিটি সমস্যার কথা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে শুনেছেন। তিনি তাদের আশ্বস্ত করেছেন, বিএনপি যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তবে শেয়ারবাজারের কাঠামোগত সংস্কার এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। মূলত দেশের আর্থিক খাতের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে শেয়ারবাজারকে আধুনিক ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোই ছিল এই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
ডিএসইর পরিচালক রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, ‘নেতাদের সঙ্গে তিনি (তারেক রহমান) অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আলাপ করেছেন। বিগত সময়ের অনিয়ম ও ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে তাকে জানানো হয়েছে। আমরা জানিয়েছি, সম্প্রতি একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকের বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজারের কারও সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সুযোগ রাখেনি। এসব ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি অন্য বিনিয়োগকারীদের চরম দুরবস্থার বিষয়েও অবহিত করেছি। এর সমাধানে আমরা বাজার-সংশ্লিষ্টদের এবং বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের মতামত দিয়েছি।’
তিনি আরও বলেছেন, জনগণ বিএনপিকে সরকার গঠনের সুযোগ দিলে তিনি সবার পরামর্শক্রমে কার্যকরী পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দেবেন।
জানা গেছে, দেশের আর্থিক খাতের বিশৃঙ্খলা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে পুঁজিবাজারে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাজার সংশ্লিষ্ট সবার প্রত্যাশা ছিল পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ায় সামনে আসে তালিকাভুক্ত কোম্পানির দেউলিয়ার চিত্র। ইতিমধ্যে একীভূত হয়েছে পাঁচটি শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক এবং বন্ধ হয়েছে নয়টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। বন্ধের তালিকায় রয়েছে বেশকিছু বীমা কোম্পানিও। ফলে গত বছর প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপেও গতি ফেরেনি শেয়ারবাজারে।
তবে প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনায় বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুঁজিবাজার উন্নয়নে বেশ কিছু পদক্ষেপ থাকলেও বছর জুড়ে আইপিও শূন্য ছিল শেয়ারবাজার। বছর শেষে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও এর কোনো প্রভাব শেয়ারবাজারে নেই। এমনকি নির্বাচনের পর বাজার পরিস্থিতি কেমন হবে তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছেন বিনিয়োগকারীরা।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, নির্বাচিত সরকার বিএসইসির সংস্কার উদ্যোগগুলো গুরুত্ব দিয়ে মৌলভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা তৈরিতে সময় উপযোগী পদক্ষেপ নেবে। যার মাধ্যমে শেয়ারবাজারের দীর্ঘমেয়াদি সংকট দূর হবে।
গত বছর পুঁজিবাজারে ধরাবাহিকভাবে সূচক, লেনদেন, মূলধন কমেছে। বন্ধ বা একীভূত হওয়া প্রতিষ্ঠানের শেয়ার শূণ্য হওয়ায় রাতারাতি পুঁজি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অসংখ্য সাধারণ বিনিয়োগকারী। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
বিনিয়োগকারীরা দাবি করেছেন দেশের শেয়ারবাজার পরিস্থিতি ভয়াবহ ও দুর্বিষহ। বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের নেতাবক্তব্যে সাজ্জাদুল হক বলেন, বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ২০১০ সালের ৬ ডিসেম্বর শেয়ারবাজারকে আইসিইউতে ঢুকিয়ে দিয়েছে। যা ওই সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত (২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট) ছিল। যার ধারাবাহিকতা ৫ই আগস্ট পরবর্তী বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও রয়েছে। এই সময়ে বিএসইসি সংস্কারের নামে শেয়ারবাজারের বিনিযোগকারীদের ‘অর্থনৈতিক গণহত্যার শিকারে’ পরিণত করেছে। যার সবচেয়ে বড় প্রতিফলন বর্তমান ভয়াবহ দূর্বিষহ বাজার পরিস্থিতি।