ট্রাম্প প্রশাসনের প্রভাবে তৈরি হওয়া বৈশি^ক টালমাটাল পরিস্থিতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের প্রথম পছন্দ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সুদহার কমানোর আভাস; তিনে মিলে সোনার পোয়াবারো অবস্থা। প্রতিদিনই মূল্যবান এ ধাতুটি হয়ে উঠছে আরও বেশি দামি, ভোক্তার ক্ষেত্রে তা খরুচে। কারণ দেশে দেশে প্রতিদিনই সোনার দামে তৈরি হচ্ছে রেকর্ড। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে এ বছরের শেষভাগে বৈশ্বিক বাজারে আউন্সপ্রতি সোনার দাম ৪ হাজার ৯০০ ইউএস ডলারে ওঠার যে প্রক্ষেপণ ছিল, ইতিমধ্যেই তা খুব কাছে চলে এসেছে। এই রেকর্ড ছাড়ানো এখন শুধু মুহূর্তের অপেক্ষা।
বাংলাদেশের বাজারে এখন সোনা কেনাবেচা হচ্ছে রেকর্ড দামে। বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন গতকাল বুধবার ভালো মানের প্রতি ভরি (২২ ক্যারেট) সোনার দাম ২ লাখ ৪৪ হাজার ১২৮ থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ৫২ হাজার ৪৬৭ টাকা নির্ধারণ করেছে, যা ঠিক এক দিন আগেই বাড়িয়ে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৮ টাকা করা হয়। একইভাবে এক দিনের ব্যবধানে দাম বাড়িয়ে ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম ২ লাখ ৪০ হাজার ৯৭৮ এবং ১৮ ক্যারেটের প্রতি ভরি সোনার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ৬ হাজার ৫৭০ টাকায়। এ নিয়ে পরপর তিন দিন সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বাজুস।
বৈশি^ক সোনার দাম বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এ বছরের শেষভাগে সোনার দর আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৯০০ ডলার ছাড়াবে। এর মধ্যে গোল্ডম্যান স্যাকসের এক প্রক্ষেপণে বলা হয়েছিল, ২০২৬ সালের শেষভাগে সোনার দাম এই পর্যায়ে যাবে। কিন্তু বৈশি^ক চরম অস্থিরতার মধ্যে ইতিমধ্যেই সোনার দাম এই রেকর্ড ভাঙার অপেক্ষায় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা কিটকোর তথ্য অনুযায়ী, গতকাল বাংলাদেশ সময় রাত ৮টা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম দাম ছিল আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৮৫০ মার্কিন ডলার, যা গত বছরের ডিসেম্বরেও ছিল ৪ হাজার ৫০০ ডলারের মধ্যে। অর্থাৎ নতুন রেকর্ড গড়া এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
স্থানীয় বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের শঙ্কা, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তার, ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড দখলকে কেন্দ্র করে ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টানাপড়েন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশি^ক অস্থিরতা এখন চরমে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের অবস্থা খানিকটা দুর্বল। এই পরিস্থিতিতে গোল্ডম্যান স্যাকস ও মর্গান স্ট্যানলির মতো বড় ব্রোকারেজ হাউজগুলোর ধারণা, চলতি বছরের জুন ও সেপ্টেম্বর মাসে নীতি সুদহার ২৫ ভিত্তি পয়েন্ট হারে কমতে পারে। সুদহার কমে গেলে এবং ভূরাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়লে যেসব সম্পদের ওপর সুদ নেই, সেসব সম্পদের চাহিদা বাড়ে। সে কারণে সোনার দাম আবার বাড়তে শুরু করেছে। কারণ বিনিয়োগকারীরা বন্ডের ওপর থেকে বিনিয়োগ কমিয়ে ফেলছে। বিশে^র কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখন নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সোনার ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে এবং চলতি বছরে ব্যাপকহারে সোনা কিনবে বলে প্রক্ষেপণ রয়েছে।
বাজুসের স্ট্যান্ডিং কমিটি অন প্রাইসিং অ্যান্ড প্রাইস মনিটরিং কমিটির চেয়ারম্যান ডা. দেওয়ান আমিনুল ইসলাম শাহীন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসনের কারণে তৈরি হওয়া বৈশি^ক অনিশ্চয়তার মধ্যে সোনার বাজারও অনিশ্চিত। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সুদহার কমানোর ঘোষণায় বিনিয়োগকারীরা বন্ডের বিনিয়োগ তুলে নিচ্ছেন। অন্যদিকে ব্যাপকহারে বিনিয়োগ করছেন সোনায়। কারণ যত বেশি অনিশ্চয়তা তৈরি হবে, সোনার ক্ষেত্রে তত বেশি বিনিয়োগ বাড়বে। এর মধ্যে চায়না ব্যাপকহারে এসব দামি ধাতুতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। এ অবস্থা কোথায় গিয়ে থামবে তা বলার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। বৈশি^ক সংকট না কমা পর্যন্ত আসলে কোনো প্রক্ষেপণই খুব একটা কাজে দিচ্ছে না।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার চাহিদা এত বেশি যে, ইতিমধ্যেই পিওর গোল্ডের পরিমাণ রয়েছে তার ১৫০-২০০ গুণ পর্যন্ত। অর্থাৎ এখন অনেকটা আগাম কেনাবেচাতেই বেড়ে চলেছে দাম।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে দেশে এখন আলংকারিক গহনার বিক্রিতে ধস নেমেছে। কারণ ১০-২০ হাজার টাকায় এখন আর বলার মতো কোন গহনা কেনার পরিস্থিতি নেই। সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোয় মানুষ এখন স্বর্ণ উপহার দেওয়ার পরিবর্তে নগদ অর্থ দেওয়ায় বেশি মনোযোগী। কারণ মানুষের সীমিত স্বার্থে এখন আর সোনা কেনার পরিস্থিতি নেই।
গোল্ডম্যান স্যাকসের গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত ২০২৬ সালের এক পূর্বাভাসে বলা হয়, ‘আগামী বছর পুরো কমোডিটি খাতের মধ্যে সোনা হবে সবচেয়ে ভালো বিনিয়োগ। যদি বেসরকারি বিনিয়োগকারীরাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মতো বৈচিত্র্যকরণে যোগ দেয়, তাহলে এ বছরের শেষ নাগাদ প্রতি আউন্স সোনার দাম ৪ হাজার ৯০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।’ যদিও সোনার দাম বছরের শুরুতেই এই পর্যায়ে চলে এসেছে। এখন শুধু নতুন রেকর্ড গড়ার জন্য অপেক্ষা।
গোল্ডম্যান স্যাকসের গবেষণায় বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র-চীন এআই ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা সোনায় বিনিয়োগের কারণগুলোর মধ্যে বড় একটি। কারণ ২০২৫ সালে কমোডিটি সূচকগুলোর মধ্যে শক্তিশালী রিটার্ন এসেছে মূল্যবান ধাতু থেকে, যা সুদহার বা বন্ডের লাভকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, চলতি বছর যদি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার আরও কমায়, তাহলে সোনায় বিনিয়োগ এমনিতেই বেড়ে যাবে।
এর পেছনে তুলে ধরা হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বাড়তি চাহিদার কথা। গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা কেনা একটি শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। প্রতি মাসে গড়ে ৭০ টন করে সোনা কিনবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো। যেখানে বিদায়ী বছরে গড়ে ৬৬ টন করে সোনা কেনা হয়েছে, যা ২০২২ সালের মাসিক গড় ১৭ টনের চেয়ে প্রায় ৪ গুণ বেশি।
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়, প্রথমত, ২০২২ সালে রাশিয়ার রিজার্ভ জব্দ করা উদীয়মান বাজারগুলোর রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে একটি বড় পরিবর্তন এনেছে। দ্বিতীয়ত, চীনের মতো উদীয়মান দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সোনা রিজার্ভের অংশ এখনো বৈশ্বিক সহকর্মীদের তুলনায় কম, বিশেষ করে ইউয়ানকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চীনের উচ্চাকাক্সক্ষার প্রেক্ষাপটে। অর্থাৎ চীন আরও বেশি সোনা কিনতে আগ্রহী। তৃতীয়ত, জরিপগুলো দেখাচ্ছে যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে সোনার প্রতি আগ্রহ এখন রেকর্ড উচ্চতায়।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সোনার দামের পূর্বাভাসে ঊর্ধ্বমুখী ঝুঁকি রয়েছে, যদি এই বৈচিত্র্যকরণ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ছাড়িয়ে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও আরও বিস্তৃত হয়। এই প্রবণতা ইতিমধ্যেই বিনিয়োগকারী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্বর্ণের জন্য প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে এবং বহু-বছরের শেয়ারবাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।