আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পুণ্যভূমি সিলেট থেকে আজ বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রচারণার অংশ হিসেবে সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে প্রথম নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখবেন। গতকাল বুধবার রাতে ঢাকা থেকে বিমানযোগে সিলেট পৌঁছান তিনি। বিমানবন্দর থেকে সরাসরি তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজারে যান জিয়ারত করতে। তার সঙ্গে আছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা।
বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর থেকে দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সবকটি নির্বাচনী প্রচারাভিযান সিলেট থেকেই শুরু করেছেন। এবারও সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করে তাদের ছেলে তারেক রহমান সিলেটে মাজার জিয়ারতের মাধ্যমেই নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করলেন।
এদিকে প্রায় দুই দশক পর বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে তারেক রহমানের সিলেট সফর ঘিরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা। তার এ সফর স্মরণীয় ও সর্ববৃহৎ জনসমাবেশে রূপ দিতে তারা অবিরাম কাজ করছেন। দলের প্রার্থীরা যার যার নির্বাচনী এলাকা থেকে বিপুল লোকসমাগম নিয়ে হাজির হবেন সিলেটের জনসভাস্থলে। নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে জনসমুদ্রে রূপ নেবে গোটা সিলেট। সর্বশেষ ২০০৫ সালে তারেক রহমান জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে বিএনপির ইউনিয়ন প্রতিনিধি সম্মেলনে যোগ দিতে সিলেট গিয়েছিলেন।
গতকাল সকালে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কমিটির মুখপাত্র ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার সিলেট থেকে শুরু করতে যাচ্ছে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রচারের প্রথম দিনেই সাত জেলায় সমাবেশে যোগ দেবেন। জেলাগুলো হলো সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জ। এর আগে গতকাল রাতেই বিমানে সিলেট যাবেন তারেক রহমান। সেখানে পৌঁছে রাতেই তিনি হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন।
তারেক রহমান যেসব জেলায় সমাবেশে করবেন তা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সমাবেশের পর তারেক রহমান মৌলভীবাজারের সদর উপজেলার শেরপুরের আইনপুর খেলা মাঠে, হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার প্রস্তাবিত উপজেলা মাঠে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কুট্টাপাড়া খেলার মাঠে, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব স্টেডিয়ামে, নরসিংদীর পৌর এলাকাসংলগ্ন এলাকায়, নারায়ণগঞ্জ জেলার আড়াইহাজার উপজেলার রূপগঞ্জের গাউছিয়ায় সমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। সমাবেশ শেষে গভীর রাতে গুলশানের বাসায় ফিরবেন তারেক রহমান।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ১৬ বছরের দীর্ঘ আন্দোলনে এবং গণঅভ্যুত্থানে বিএনপি ও প্রতিটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের ছিল অনবদ্য ও অভূতপূর্ব ভূমিকা। তাদের প্রতি ভালোবাসা থেকে বিএনপি চেয়ারম্যান সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তার প্রতিটি সফরে বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের ত্যাগী শীর্ষ নেতাদের পর্যায়ক্রমে সফরসঙ্গী হিসেবে নিয়ে যাবেন এবং দেশের জন্য তাদের যে সংগ্রাম তাকে মূল্যায়িত করবেন।’
মাহদী আমিন বলেন, ‘নির্বাচনী প্রচারণার শুরুতে বুধবার রাত ১২টা ১ মিনিটে অর্থাৎ ২২ জানুয়ারি প্রথম প্রহরে ঢাকার লেক শোর হোটেলে থিম সং উদ্বোধন করবেন কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব রুহুল কবির রিজভী। উপস্থিত থাকবেন নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ইসমাইল জবিহউল্লাহসহ কমিটির সদস্য ও বিএনপির নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের দলের নেতাকর্মীদের আহ্বান জানাব, আগামীকাল (আজ) থেকে যে প্রচারণা শুরু হবে সেখানে ইতিবাচক রাজনীতিকে ধারণ করে। সাধারণ মানুষের কাছে ছুটে যাই, আমাদের পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরি এবং যেসব অপপ্রচার হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে সঠিক অবস্থা নিই। যারা এভাবে আইডি সংগ্রহ করছেন, বিকাশ নাম্বার সংগ্রহ করছেন, এই নীতিবাচক রাজনীতির কৌশল থেকে যেন বেরিয়ে আসেন। আমরা তাদের সেই আহ্বান জানাব।’
এক প্রশ্নের জবাবে দলের মুখপাত্র বলেন, “আমাদের সংসদ সদস্য প্রার্থী যারা রয়েছেন তারা যখন ঢাকায় এসেছিলেন আমরা তাদের সবাইকে বলেছি, নির্বাচনী প্রচারণায় গণভোটে আমরা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে অবস্থান নেব।”
সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জকরিয়া, জুবায়ের বাবু, মোস্তাকুর রহমান, মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবীর খান উপস্থিত ছিলেন।
তারেক রহমানের অগ্রবর্তী টিম সিলেটে : বিএনপি নেতারা জানিয়েছেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলনে দলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের অংশ হিসেবে তারেক রহমানের সফরে পর্যায়ক্রমে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সফরসঙ্গী করা হবে। এর অংশ হিসেবে সিলেট সফরে তার সঙ্গে থাকছেন আবদুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, মামুন হাসান, আবদুল মোনায়েম মুন্না, কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ, ইয়াসিন ফেরদৌস মুরাদ ও রাকিবুল ইসলাম রাকিবসহ একাধিক তরুণ নেতা। বিএনপি চেয়ারম্যানের সমাবেশ সামনে রেখে ইতিমধ্যে অগ্রগতি টিম সিলেটে পৌঁছেছে।
দুই দশক পর সিলেটে তারেক রহমান : সিলেট ব্যুরো জানিয়েছে, তারেক রহমানের সিলেট সফর ঘিরে সিলেট অঞ্চলের বিএনপি এখন উজ্জীবিত। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জসহ গোটা বিভাগের জেলা, উপজেলায় নেতাকর্মীরা উৎসাহ-উদ্দীপনায় তারেক রহমানের অপেক্ষায়। প্রায় দুই দশক পর তিনি সিলেট আসছেন এজন্য তার এ সফরকে স্মরণীয় ও সর্ববৃহৎ জনসমাবেশে রূপ দিতে তারা অবিরাম কাজ করছেন। দলের প্রার্থীরা যার যার নির্বাচনী এলাকা থেকে বিপুল লোকসমাগম নিয়ে হাজির হবেন সিলেটের জনসভাস্থলে। শীর্ষ নেতারা বলছেন, তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষে জনসমুদ্রে রূপ নেবে গোটা সিলেট। তার জনসভায় লাখ লাখ মানুষ সমবেত হবেন বলে তারা আশা করছেন।
যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সিলেট-৩ আসনে দলের প্রার্থী এমএ মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনগণের রায়ে তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হলে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবেন। আর সেই জনরায় চাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সিলেট থেকেই শুরু হচ্ছে এটা আমাদের সৌভাগ্য।’
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও আপসহীন দেশনেত্রী সদ্যপ্রয়াত খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরি তারেক রহমানের দিকে দেশবাসী চেয়ে আছে। তিনি সিলেটে এসে কী বার্তা দেন তা শুনতে সারা দেশের মানুষ উদগ্রীব। সবার আগে দেশ এ সেøাগানে তারেক রহমান যে নির্বাচনী প্রচারে নেমেছেন আশা করি দেশের মানুষ তা সাদরে গ্রহণ করবে এবং ধানের শীষকে বিজয়ী করবে।’ সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবং আসন্ন নির্বাচনে সিলেট-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘তারেক রহমান সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করছেন এটা আমাদের সৌভাগ্যের বিষয়।’
যাবেন শ্বশুরবাড়ি : তারেক রহমান সিলেটের জামাই। তার শ্বশুরবাড়ি সিলেটের দক্ষিণ সুরমার সিলামের বিরাইমপুর গ্রামে। তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমানের পৈতৃক বাড়ি। তার আগমন ঘিরে শ্বশুরালয়ে চলছে উৎসবের আমেজ। পুরো বাড়িটি সাজানো হয়েছে মেয়ের জামাইকে বরণ করে নেওয়ার জন্য। দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক সোহেল ইবেন রাজা বলেন, তারেক রহমান একদিকে আমাদের দলের নেতা। সেই সঙ্গে তিনি আমাদের দুলাভাই। তার আগমনে বর্ণিল হয়ে উঠেছে সিলাম এলাকা।
১৯ বছর পর মৌলভীবাজারে : মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ১৯ বছর পর আজ মৌলভীবাজারে আসছেন তারেক রহমান। দুপুর ১টায় সদর উপজেলার শেরপুর ইউনিয়নের আইনপুর মাঠে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দেবেন তিনি। মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম বলেন, ‘শেরপুরের আইনপুর মাঠে জনসভার আয়োজন করা হয়েছে। আমরা লক্ষাধিক মানুষের সমাবেশ আশা করছি। এটি আমাদের জন্য একটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচি।’
এদিকে সমাবেশকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মৌলভীবাজার সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল খয়ের জানান, সমাবেশ ঘিরে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। মাঠে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশ মোতায়েন থাকবে।
তারেক রহমানের সমাবেশ ঘিরে হবিগঞ্জে ব্যাপক উদ্দীপনা : হবিগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, বিএনপির দলীয় নেতাকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়াও হবিগঞ্জে সাধারণ মানুষের চোখ এখন শায়েস্তাগঞ্জ থানার দক্ষিণে একটি মাঠের দিকে। কারণ, এখানে আজ বিকেলে তারেক রহমান প্রস্তাবিত শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স মাঠে এক জনসভায় বক্তৃতা করবেন। হবিগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী ও সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক জি কে গউছ জানিয়েছেন, তারেক রহমানের আগমন ঘিরে আমাদের নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দ উদ্দীপনার শেষ নেই।
হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শিখা রানী দাস জানিয়েছেন, তারেক রহমানের সমাবেশ শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় ও মহাসড়কে যান চলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে প্রায় সাড়ে চারশ পুলিশ দায়িত্ব পালন করবে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলা সদরের কুট্টাপাড়া খেলার মাঠে জনসভা করবেন তারেক রহমান। এ জনসভা ঘিরে এলাকায় উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। জেলা বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারম্যানের এটি এ জেলায় প্রথম জনসভা। এর আগে তিনি দলের যুগ্ম মহাসচিব থাকাকালে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সরাইলে পথসভা করেছেন। জনসভায় তিনি জেলার ছয়টি নির্বাচনী এলাকার বিএনপি ও জোটের প্রার্থীকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কথা রয়েছে।
ভৈরব প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ভৈরবের স্টেডিয়াম মাঠে বিএনপি আয়োজিত জনসভায় তারেক রহমান বক্তব্য দেবেন। জনসভা সফল করতে ভৈরবে জেলার ১৩টি উপজেলার সব স্তরের নেতারা সমাবেশকে সফল করতে এক প্রস্তুতি সভা করেন। এতে কিশোরগঞ্জ জেলার ছয় আসনের বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরাও উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি মো. শরীফুল আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে, দলীয় চেয়ারম্যান নিরাপত্তা টিম (সিএসএফ) নির্দেশ মোতাবেক জনসভাটি জনসমুদ্রে সফল করতে আমাদের দল থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে আমরা দিনরাত কাজ করছি। জনসভায় কয়েক লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিত নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
* প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন সিলেট ব্যুরো, ভৈরব (কিশোরগঞ্জ), ব্রাহ্মণবাড়িয়া, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ প্রতিনিধি