ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আবুল কাশেম ফজলুল হক একটি বিশেষ নাম। যে কজন বাঙালি রাজনীতিক অবিভক্ত ভারতের রাজনীতিকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছিলেন তিনি ছিলেন তাদের একজন।
তিনি ছিলেন কলকাতা করপোরেশনের প্রথম বাঙালি মুসলমান মেয়র, বাংলার প্রধানমন্ত্রী, পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার জাদুকরী ব্যক্তিত্ব ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তিনি কিংবদন্তি হয়ে আছেন। প্রবল সাহস, প্রবাদতুল্য দানশীলতা, তুলনারহিত স্মৃতিশক্তি, ঋজু দীর্ঘদেহ, ভরাট জলদ গম্ভীর কণ্ঠস্বর জনমনে তাকে স্থায়ী আসন দিয়েছিল। মৃত্যুর পরও তিনি বিস্মৃত হননি, বরং তাকে ঘিরে কাহিনিমালা ডানা মেলেছে, বিস্তৃত হয়েছে। তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে আশ্চর্য সব গল্পকাহিনি। এর কিছু সত্য কিছু সাধারণ মানুষ ভালোবেসে রচনা করেছে মনের মাধুরী মিশিয়ে। এসব কথ্য ইতিহাসের পাশাপাশি রচিত হয়েছে নানা বই বিশ্লেষণী ও জীবনী গ্রন্থ। তিনি হতে পারেন শিশু ও কিশোরদের জন্য অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। বিষয়টি বিবেচনা করেই লেখক জহুরুল আলম সিদ্দিকী রচনা করেছেন ফজলুল হকের ছোটদের উপযোগী জীবনী ‘ছোটদের আবুল কাশেম ফজলুল হক’। বইটিতে লেখক ফজলুল হকের জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা গল্প আকারে তুলে ধরেছেন। শুধু ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং ঘটনার চরিত্রদের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে তিনি ঘটনার বর্ণনা করেছেন। বইটির এই বৈশিষ্ট্যের কারণে এই কিংবদন্তির জীবনীটি হয়ে উঠেছে প্রাণবন্ত ও সহজপাঠ্য।
ফজলুল হকের অসাধারণ স্মৃতিশক্তির কথা শোনেননি এমন মানুষ বিরল এ দেশে। তার এই স্মৃতিশক্তি নিয়ে নানা ঘটনা প্রচলিত আছে। শোনা যায়, তিনি নাকি ছিলেন ফটোগ্রাফিক মেমরির অধিকারী। একবার যা পড়তেন বা দেখতেন বা শুনতেন তা কখনো ভুলতেন না। শোনা যায়, শিশু ফজলুল হক এক বই দুবার পড়তেন না। তাই ছেলেবেলায় যে বই পড়া হয়ে যেত তা নাকি ছিঁড়ে ফেলতেন। তেমনি একটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে এই বইয়ে। এখানে অবশ্য তিনি একবার পড়ার পরে বইটি ছিঁড়ে ফেলতেন তা বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছে, ছেলেকে পাতার পর পাতা উল্টাতে দেখে তার বাবা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে, কী করছে সে? তখন তিনি উত্তর দেন, তিনি পড়ছেন। কিন্তু পাতার পর পাতা উল্টে কি পড়া যায়? বাবা পরীক্ষা করার জন্য যখন বই থেকে পড়া ধরলেন, তখন শিশু ফজলুল হক সব প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর দেন। বাবা তার এই অসাধারণ স্মৃতিশক্তির পরিচয় পেয়ে খুবই অবাক হয়েছিলেন।
ফজলুল হক ছিলেন দীর্ঘদেহী। যেমন দৈর্ঘ্যে তেমনি প্রস্থে। তার দৈহিক শক্তি নিয়েও নানা গল্পগাঁথা প্রচলিত আছে। তার গায়ে ছিল প্রচ- শক্তি। এক কিলে নাকি নারিকেল ছিলতে পারতেন, মুখের ভেতর পুরে দিতেন আস্ত আম। বাজারের সবচেয়ে বড় কাঁঠাল শেষ করতে তার নাকি প্রয়োজন হতো না দ্বিতীয়জন।
শিশু বয়সেই তাকে আরবি, ফার্সি ও বাংলা ভাষা শেখানোর জন্য তিনজন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল। শিক্ষার্থী অবস্থাতেই তিনি চমৎকার ইংরেজি, উর্দু বলতে পারতেন। আবুল কাশেম ফজলুল হক বাগ্মী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছিলেন। ১৯৪০ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সভাপতিত্বে লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে জ¦ালাময়ী বক্তৃতায় প্রথম পাকিস্তান প্রস্তাব পেশ করেন। তার বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে পাঞ্জাববাসী তাকে ‘শের-ই-বঙ্গাল’ উপাধি দেয়। ‘শের-ই-বঙ্গাল’ অর্থ বাংলার বাঘ। সেই থেকে তিনি শেরেবাংলা নামে পরিচিত। তার এই শেরেবাংলা উপাধি নিয়েও মজার একটি কথা প্রচলিত আছে। তিনি প্রচ- দৈহিক শক্তির অধিকারী ছিলেন বলে অনেকে মনে করে তিনি বাঘ শিকারও করেছেন। বাঘ শিকারের কারণেই নাকি তার নাম হয়ে যায় ‘শেরে বাংলা’ বা বাংলার বাঘ। আদতে তা সত্য না। ফজলুল হক জীবনে আরও অনেক উপাধি পেয়েছেন। ১৯৫৯ সালে তৎকালীন পাকিস্তানি প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান তাকে ‘হিলাল-ই-পাকিস্তান’ উপাধিতে ভূষিত করেন। তবে জনমনে স্থায়িত্ব লাভ করেছে সাধারণ মানুষের দেওয়া শেরেবাংলা উপাধিটি। এই উপাধি তার নামের অংশ হয়ে গেছে।
শেরেবাংলা ছিলেন অসাধারণ মেধাবীও। তার এক সহপাঠী তাকে অপমান করে বলেছিল যে, ফজলুল হক গণিত ভয় পেয়েই নাকি গণিত বাদ দিয়ে ইংরেজি বিষয়ে এএ পরীক্ষা দিচ্ছেন। অপমানিত ফজলুল হক পরীক্ষার মাত্র ছয় মাস আগেই বিষয় বদলে এমএ পরীক্ষা দেন গণিত বিষয়ে এবং তিনি সে বিষয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন।
শেরেবাংলা ফজলুল হকের রাজনৈতিক জীবন নিয়ে এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব নয়। তবে আমাদের স্বাধীন দেশ লাভের পেছনে তার তাত্ত্বিক ও প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে। বইটি পড়লে তোমরা শুধু একজন কিংবদন্তি রাজনৈতিক ব্যক্তি সম্পর্কেই জানবে না বরং জানতে পারবে আমাদের দেশের ইতিহাস, কীভাবে আমরা স্বাধীনতা পেলাম সেটিও।
সুলতানা রাজিয়া