জনসমাবেশ ঘিরে নিরাপত্তায় নজর

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা, জনসমাবেশ, মিছিল-মিটিং শুরু হয়েছে। নানা শঙ্কা ও অভিযোগের মধ্যেই নির্বাচনী যুদ্ধে মাঠে নেমেছেন প্রায় দুই হাজার প্রার্থী। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়া শুরু করেছেন তারা। মিছিল-মিটিং, প্রচার-প্রচারণা নিয়ে তাদের ব্যস্ততা বাড়ছে। সেই সঙ্গে প্রার্থীদের নিরাপত্তা ও নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মাঠে রয়েছেন। ভোটের মাঠের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখা আশ্বস্ত করেছে নির্বাচন কমিশনও। এর মধ্যেও গতকাল বৃহস্পতিবার প্রচার-প্রচারণার প্রথম দিনেই নানা অভিযোগ, সংঘর্ষ ও মারামারির ঘটনাও ঘটেছে।

পুলিশ, র‌্যাব ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা বলছে, ভোটের মাঠের পরিবেশ স্থিতিশীল রাখতে প্রস্তুত আছেন তারা। এমনকি যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতাও রয়েছে। হুমকি হতে পারে এমন প্রার্থীদের ওপর নজর রাখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, এটি রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা। নির্বাচন ঘিরে সুষ্ঠু পরিবেশ ও প্রার্থীদের এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া জনগণকে ভোটকেন্দ্রে নেওয়ার জন্য সব ধরনের নিরাপত্তা বজায় রাখতে হবে।

এবারের ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ভিন্নতা রয়েছে। নির্বাচন মানে একটি ভোট হলেও এবার সংসদ নির্বাচনে দিতে হবে দুটি ভোট। একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট, অন্যটি দেশ সংস্কারের হ্যাঁ-না ভোট। গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে হচ্ছে এই নির্বাচন। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ঘিরে জনমনে নানা প্রশ্ন থাকলেও সবাই উৎসাহ প্রকাশ করেছেন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা নিয়ে। তবে এই উৎসাহের মধ্যে আতঙ্কও রয়েছে। এবারের নির্বাচন উপলক্ষে পুলিশের প্রায় দেড় লাখ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। যারা এবার নির্বাচনের মাঠে দায়িত্ব পালন করবেন। নির্বাচনকেন্দ্রিক আলাদা করে তাদের প্রশিক্ষণ থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নির্বাচনী মাঠে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন বলেও আশা করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা দেখা যাচ্ছে না। তবে প্রায় প্রতিটি আসনে বিরোধী প্রার্থীর পাশাপাশি দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। এতে নিজেদের মধ্যেই সংঘর্ষ ও খুন-খারাপির ঘটনা ঘটতে পারে।

এবারের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত পুলিশের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার রোধে জোরালো অভিযান চালানোর পাশাপাশি কারাগার থেকে বের হওয়া সন্ত্রাসীদেরও নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ এবং বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ভোটের ক্ষেত্রে হুমকি হতে পারেন এমন ব্যক্তিদের ওপর নজর রাখতে এবং ক্ষেত্রবিশেষে তাদের আইনের আওতায় আনতে সব জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও মহানগর পুলিশ কমিশনারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রচার-প্রচারণায় নিরাপত্তার বিষয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম গণমাধ্যমকে জানান, প্রচারণা চলাকালে পুলিশের ব্যস্ততা স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। সংঘাত ও সংঘর্ষ যেন না ঘটে, সে ব্যাপারে এখন আরও বেশি সতর্ক পুলিশ। নজরদারি ও পুলিশের কার্যক্রম আরও বেশি দৃশ্যমান রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, ডিজিটাল অপরাধ দমন এবং জামিনে মুক্ত শীর্ষ অপরাধীদের আবার নজরদারিতে আনা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এ ছাড়া এখনই সমন্বিত অভিযান না চালানো হলে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা, রাজনৈতিক সন্ত্রাস এবং অপরাধী চক্রের প্রভাব বিস্তার আরও বাড়তে পারে। এতে শুধু নির্বাচন নয়, সামগ্রিক সামাজিক স্থিতিশীলতা ও নাগরিক নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়বে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচন ঘিরে পুলিশসহ প্রায় ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পুলিশের প্রায় দেড় লাখ সদস্য এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৫ লাখ ৫৫ হাজার ৯৫৮ সদস্য মোতায়েন থাকবেন। এ ছাড়া বিজিবির ৩৭ হাজার ৪৫৩, সশস্ত্র বাহিনীর প্রায় ১ লাখ, র‌্যাবের প্রায় ৮ হাজার, নৌবাহিনীর ৫ হাজার, কোস্ট গার্ডের ৩ হাজার ৫০০ এবং ফায়ার সার্ভিসের ১৩ হাজার সদস্য নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া নজরদারিতে থাকছে ড্রোন। এ বিষয়ে ইতিমধ্যে পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনী কাজ শুরু করেছে।

নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক সহিংসতা প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন এলেই রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়ে অতীত অভিজ্ঞতায় তা দেখা গেছে। তবে এবার যেন এমন কিছু না ঘটে, সেজন্য পুলিশসহ অন্য বাহিনীগুলো খুবই সতর্ক। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ এখন সর্বোচ্চ সচেষ্ট।

র‌্যাব জানায়, নির্বাচন ঘিরে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবেন র‌্যাব সদস্যরা। যেকোনো অপতথ্যের ব্যাপারে সতর্ক করতে র‌্যাবের সাইবার টিম কাজ করছে। নির্বাচনী মাঠে কীভাবে র‌্যাব সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন, সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জে ধানের শীষের মিছিলে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষ : নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার প্রথম দিনেই গতকাল মুন্সীগঞ্জ-২ আসনের টঙ্গীবাড়ি থানাধীন ধানের শীষ প্রতীকের মিছিলকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হয়। জানা গেছে, দীঘিরপাড় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শামীম মোল্লা ও সাধারণ সম্পাদক মনোয়ার খানের লোকজনের মধ্যে হামলা ও সংঘর্ষ হয়।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দীঘিরপাড় ইউনিয়ন বিএনপি সভাপতি শামীম মোল্লা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার লোকজন ধানের নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে মিছিল নিয়ে গেলে হামলা করা হয়। এতে সংঘর্ষ বাধে। কেউ গুরুতর আহত হয়নি। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে।’

টঙ্গীবাড়ি থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুল হক ডাবলু বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরের ভবানীগঞ্জে জামায়াত-বিএনপির সংঘর্ষে চারজন আহত হয়েছেন।

নির্বাচনী যুদ্ধ চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে : অপরাধজগৎ এখন প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি, ডিজিটাল ওয়ালেট, এনক্রিপশন এবং আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ফলে অস্ত্র ও মাদক চোরাচালান শনাক্ত করা কঠিন হচ্ছে। স্থানীয় অপরাধী চক্রগুলো এখন আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করছে, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এর প্রভাব পড়তে পারে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনেও। ইতিমধ্যে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত, বিএনপিসহ বিভিন্ন দলের নির্বাচনী গান, নেগেটিভ-পজিটিভ প্রতারণা শুরু হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি লঙ্ঘন করেও করা হচ্ছে ভিডিও, যা জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করছে।

তবে ইসির নির্বাচনী প্রচারণার বিধানে দেখা যায়, এবার প্রথমবারের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট কিংবা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কেউ প্রচার চালাতে পারবেন। তবে শর্ত হলো প্রচারণা শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইলসহ শনাক্তকরণ তথ্য রিটার্নিং অফিসারের কাছে জমা দিতে হবে। অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না।

নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীদের মানতে হবে যেসব বিধি : প্রচারের সময় কী করা যাবে, আর কী করা যাবে না সে বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে নির্বাচনী আচরণবিধিতে। প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণায় সমান অধিকার পাবেন। সভার ২৪ ঘণ্টা আগে প্রশাসনকে জানাতে হবে। যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। যেকোনো গোলযোগের ক্ষেত্রে পুলিশের শরণাপন্ন হতে হবে, কোনো ধরনের নিজে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পাবে না। এক প্রার্থী অন্য প্রার্থীদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বা মানহানিকর বক্তব্য দিতে পারবে না।