কাস্টমস অধিদপ্তরের সফটওয়্যারে ত্রুটি থাকার সুযোগে বাংলাদেশি চারটি প্রতিষ্ঠান নমুনার নামে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার গার্মেন্ট পণ্য কয়েকটি দেশে প্রেরণ করে। সাবিহা সাকি ফ্যাশন, এশিয়া ট্রেডিং করপোরেশন, ইমু ট্রেডিং করপোরেশন ও ইলহাম করপোরেশন এসব পণ্য বিদেশে পাঠায়। কিন্তু পণ্যের বিপরীতে কোনো মুদ্রা দেশে আনা হয়নি। তারা অর্থপাচারের উদেশ্যেই এসব গার্মেন্ট পণ্য বিদেশে পাঠিয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এর সত্যতা মিলেছে। শিগগিরই এ ঘটনায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করবে বলে জানিয়েছে দুদক।
অভিযোগে জানা গেছে, ২০২৩ সালে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান সাবিহা সাকি ফ্যাশন, এশিয়া ট্রেডিং করপোরেশন, ইমু ট্রেডিং করপোরেশন এবং ইলহাম করপোরেশন ১৭৮০টি চালানের মাধ্যমে আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কাতার, যুক্তরাজ্য, সৌদি আরব, নাইজেরিয়াসহ কয়েকটি দেশে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার পোশাক রপ্তানি করে। কিন্তু এসব পোশাক পাঠানোর পর সে দেশ থেকে কোনো টাকা বাংলাদেশে আনেনি। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়ার পর এটি অধিকতর তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হয়। কমিশন অভিযোগটি পাওয়ার পরই অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ দুদকের সহকারী পরিচালক মো. সাহিদুর রহমান ও উপসহকারী পরিচালক মো. ফারুক হোসেনের সমন্বয়ে একটি অনুসন্ধান দল গঠন করে।
দুদকের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, বাংলাদেশি চারটি প্রতিষ্ঠান নমুনার নামে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানির একটি অভিযোগের অনুসন্ধান চলমান আছে। দুদকের অনুসন্ধান দল অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন দপ্তর থেকে অভিযোগ সংশ্লিষ্টর রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করেছে। যা পর্যালোচনা করা হয়েছে। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে চারটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নমুনা পাঠানোর নামে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার গার্মেন্ট পণ্য পাঠানোর সত্যতা পাওয়া গেছে। অনুসন্ধান দল তাদের প্রতিবেদন দাখিল করলে কমিশন তা যাচাই-বাছাই শেষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।
জানা গেছে, প্রথমে সাবিহা সাকি ফ্যাশনের জালিয়াতির ঘটনাটি ধরা পড়ে। এরপর আরও তিন প্রতিষ্ঠানের ঘটনা নজরে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনো এলসি ছিল না, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ইএক্সপি ব্যবহার করে ১৭৮০টি চালানের বিপরীতে ১৮ হাজার ২৬৫ টন পণ্য রপ্তানি করা হয়। যার ঘোষিত মূল্য ৩ কোটি ৭৮ লাখ ১৭ হাজার মার্কিন ডলার। যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে কোনো পণ্য রপ্তানি করতে হলে ক্রেতাকে স্যাম্পল বা নমুনা পাঠাতে হয়। নমুনা দেখে ক্রেতা সন্তুষ্ট হলেই আসে অর্ডার। বাংলাদেশি চারটি প্রতিষ্ঠান বিদেশে নমুনা পাঠানোর নামে ৪০০ কোটি টাকার পোশাক পাঠায়। কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যারের ত্রুটির সুযোগে এসব পণ্য পাঠানো হয়। বিষয়টি জানার পরই তদন্তে নামে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর।
এতে দেখা যায়, সাবিহা সাকি ফ্যাশন মোট ৮৬টি চালানের বিপরীতে ৯৯৭ টন পণ্য রপ্তানি করেছে। যার মধ্যে রয়েছে- মেন্স ট্রাউজার, টি-শার্ট, বেবি সেট, ব্যাগ, পোলো শার্ট, জ্যাকেট, প্যান্ট ও হুডি রপ্তানি। এর বিনিময় মূল্য ১৮ লাখ ৪৫ হাজার ৭২৭ মার্কিন ডলার বা ২১ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠানটির টি-শার্ট ও লেডিস ড্রেস রপ্তানির কথা ছিল। কিন্তু তারা বেবি ড্রেস, জিন্স প্যান্ট, লেগিন্স, শার্ট ও শালসহ ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য রপ্তানি করেছে। তাদের পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব ও নাইজেরিয়ায় পাঠানো হয়েছে।
এশিয়া ট্রেডিং করপোরেশন ১ হাজার ৩৮২টি চালানের মাধ্যমে ১৪ হাজার ৮৫ টন টি-শার্ট, টপস ও লেডিস ড্রেস রপ্তানি করেছে। যার বিনিময় মূল্য ২ কোটি ৫৮ লাখ ২৬ হাজার ৮৬৬ মার্কিন ডলার বা ২৮২ কোটি টাকা। ইমু ট্রেডিং করপোরেশন ২৭৩টি পণ্যের চালানে দুই হাজার ৫২৩ টন টি-শার্ট, ট্রাউজার ও টপস রপ্তানি করেছে, যার বিনিময় মূল্য ৬৫ লাখ চার হাজার ৯৩২ মার্কিন ডলার বা ৬২ কোটি টাকা। আর ইলহাম করপোরেশন ৩৯টি চালানে ৬৬০ টন টি-শার্ট, ট্যাংক টপ, লেডিস ড্রেস রপ্তানি করেছে। যার বিনিময় মূল্য ১৬ লাখ ৩৯ হাজার ৪৮৫ মার্কিন ডলার বা ১৭ কোটি টাকা।
কাস্টমস ও গোয়েন্দা অধিদপ্তরের প্রাথমিক তদন্তকালে দেখা যায়, চারটি প্রতিষ্ঠান বিল অব এক্সপোর্টে দিনের পর দিন ব্যবহার করেছে ভুয়া এলসি আর ইএক্সপি নম্বর। এছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে রপ্তানিকারক ছিলেন এক ব্যাংকের গ্রাহক, আর এলসি ও ইএক্সপি ছিল অন্য ব্যাংকের। অথবা রপ্তানিকারক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকেরই গ্রাহক। কিন্তু ব্যবহার করা হয়েছে অন্য গ্রাহকের এলসি আর ইএক্সপি নম্বর। বিল অব এক্সপোর্টের হার্ডকপি আর কাস্টমস সার্ভারের তথ্যেও মিলেছে বিরাট ফারাক। যার অন্যতম রপ্তানিকারকের নামের ভিন্নতা। গরমিল আছে ন্যাচার অব ট্রানজেকশন, সিপিসি কোড আর ইউডিতে।
জানা গেছে, বিদেশে পাচারকৃত সম্পদ বাংলাদেশে ফেরত আনার বিষয়ে গঠিত টাস্কফোর্স দশম সভা গত বছরের জুলাই মাসে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আবু মোহাম্মদ আমিন উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বিভিন্ন সংস্থার ১৭ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অংশ নেন। সভায় ১৩টি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যার মধ্যে একটি হলো রপ্তানির আড়ালে চারটি প্রতিষ্ঠানের ৪০০ কোটি টাকা পাচারের ঘটনায় যৌথ অনুসন্ধান করা। কাস্টমস গোয়েন্দা তদন্ত অধিদপ্তর এবং দুদক যৌথভাবে ঘটনাটি অনুসন্ধান করবে।
সভায় কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যারের বিভিন্ন ত্রুটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই ত্রুটির কারণে পণ্য রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচার হয়েছে বলে জানানো হয় এবং ত্রুটি নিরসনে সফটওয়্যার নিয়মিত আপডেট করার সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া অনিয়ম রোধে চট্টগ্রাম বন্দরের এক্সিট গেটে আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।