থাইরয়েড চিকিৎসাযোগ্য রোগ

ডা. শাহজাদা সেলিম

সহযোগী অধ্যাপক, হরমোন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ

এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

জানুয়ারি থাইরয়েড সচেতনতা মাস। পালনের মূল লক্ষ্য হলো জনসাধারণের মধ্যে থাইরয়েড স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্ক্রিনিং উৎসাহিত করা এবং রোগীদের সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা। বিশেষত গর্ভবতী, পরিবারে থাইরয়েড রোগের ইতিহাস আছে এমন ব্যক্তি এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষদের নিয়মিত পরীক্ষা করা উচিত।  বাংলাদেশে থাইরয়েড রোগ উল্লেখযোগ্য স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে। আমাদের দেশে প্রায় ৩০ থেকে ৫০ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন ধরনের থাইরয়েড সমস্যায় আক্রান্ত, যার মধ্যে অধিকাংশই জানেন না যে, তাদের এই রোগ আছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নারীদের মধ্যে থাইরয়েড সমস্যার হার পুরুষদের তুলনায় পাঁচ থেকে আট গুণ বেশি। প্রজনন বয়সী নারী, গর্ভবতী এবং মেনোপজ পরবর্তী নারীরা বিশেষভাবে ঝুঁকিতে থাকেন।

রোগের ধরন ও লক্ষণ

থাইরয়েড সমস্যা প্রধানত কয়েক ধরনের হয়ে থাকে। হাইপোথাইরয়েডিজম হলো সবচেয়ে সাধারণ সমস্যা, যেখানে

থাইরয়েড গ্রন্থি পর্যাপ্ত হরমোন তৈরি করতে পারে না। এ অবস্থায় রোগী দীর্ঘস্থায়ী অবসাদ, ওজন বৃদ্ধি, শীত বেশি অনুভব করা, চুল পড়া, ত্বক শুষ্ক হওয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, বিষণœতা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস এবং মাসিক চক্রের অনিয়মে ভোগেন। অন্যদিকে হাইপারথাইরয়েডিজমে থাইরয়েড অতিরিক্ত হরমোন তৈরি করে। এর ফলে দ্রুত ও অস্বাভাবিক ওজন হ্রাস, হৃদস্পন্দন বৃদ্ধি বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, অতিরিক্ত ঘাম, হাত কাঁপা, উদ্বেগ ও অস্থিরতা, ঘুমের সমস্যা এবং চোখ ফুলে যাওয়া দেখা দেয়। গলগ- বা গয়টার হলো থাইরয়েড গ্রন্থির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি যা গলায় ফোলাভাব সৃষ্টি করে। এ ছাড়া থাইরয়েড নডিউল এবং থাইরয়েড ক্যানসারও গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা।

রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা

থাইরয়েড রোগ নির্ণয় খুবই সহজ এবং সাশ্রয়ী। একটি সাধারণ রক্ত পরীক্ষা যেমন TSH (Thyroid Stimulating Hormone), T3 এবং T4 পরীক্ষার মাধ্যমে থাইরয়েডের কার্যকারিতা জানা যায়। প্রয়োজনে আল্ট্রাসনোগ্রাফি, থাইরয়েড স্ক্যান বা FNAC করা হতে পারে। থাইরয়েড রোগ সম্পূর্ণ চিকিৎসাযোগ্য এবং নিয়ন্ত্রণযোগ্য। হাইপোথাইরয়েডিজমের জন্য থাইরক্সিন হরমোন প্রতিস্থাপন থেরাপি কার্যকর। নিয়মিত ওষুধ সেবনে রোগী সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। হাইপারথাইরয়েডিজমের জন্য অ্যান্টি-থাইরয়েড ওষুধ, রেডিওঅ্যাক্টিভ আয়োডিন থেরাপি বা প্রয়োজনে সার্জারি করা হয়।

গর্ভাবস্থায় থাইরয়েড স্বাস্থ্য

অনিয়ন্ত্রিত থাইরয়েড সমস্যা গর্ভপাত, প্রিম্যাচিউর ডেলিভারি, শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে সমস্যা এবং জন্মগত ত্রুটির কারণ হতে পারে। তাই গর্ভধারণের পূর্বে এবং গর্ভাবস্থায় নিয়মিত থাইরয়েড পরীক্ষা করা অত্যাবশ্যক।

প্রতিরোধ ও জীবনযাপন

থাইরয়েড সমস্যা সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও কিছু পদক্ষেপ ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। আয়োডিনযুক্ত লবণ ব্যবহার করুন, পুষ্টিকর খাবার বিশেষত সামুদ্রিক মাছ, দুগ্ধজাত খাবার এবং সবুজ শাকসবজি খান। সেলেনিয়াম ও জিংকসমৃদ্ধ খাবার থাইরয়েড স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম থাইরয়েড কার্যক্রম সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।

থাইরয়েড রোগ নীরব ঘাতক হলেও সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা ও সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে একে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।