শিল্প ও বাণিজ্যিক আমদানি নিবন্ধন সনদ (আইআরসি) জারির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাতের চেম্বার বা অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ থাকা ছিল বাধ্যতামূলক। তবে বাধ্যবাধকতার গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি প্রত্যাহার করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এর ফলে ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঝুঁকি তৈরি করবে বলে মনে করছেন রপ্তানি খাতের শিল্প উদ্যোক্তারা। ব্যবসায়ী নেতারা মনে করেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তটি বাস্তবসম্মত নয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
জানা গেছে, গত বছর ৩০ ডিসেম্বর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আইআইটি-১ শাখা থেকে ব্যবসা সহজীকরণের লক্ষে আইআরসি জারির ক্ষেত্রে চেম্বার বা অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সনদ দাখিলের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করা হয়েছে। বিষয়টি জানাজানির পর বাণিজ্য সংগঠনের নেতারা মন্ত্রণালয়কে প্রতিবাদ জানিয়ে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) এ সংক্রান্ত একটি পত্র দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। যেখানে বলা হয়েছে, ব্যবসা পরিচালনা সহজীকরণের নামে গৃহীত সিদ্ধান্তটি বাস্তবসম্মত নয়, বরং ঝুঁকিপূর্ণ।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া বিকেএমইএর চিঠিতে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তে কারখানার নিয়মতান্ত্রিকতা ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে। এমনকি এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে মানি লন্ডারিং (অর্থ পাচার) ও ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি বাড়বে, শ্রম অসন্তোষ দেখা দিলে তা নিয়ন্ত্রণে অচলাবস্থা দেখা দেবে।
পত্রে বিকেএমইএর দাবির ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত বিশ্ববাজারে টিকে আছে তার কঠোর কমপ্লায়েন্স ব্যবস্থার কারণে। বিকেএমইএ তার সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম আইন প্রতিপাললন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং পরিবেশগত মানদ- নিয়মিত তদারকি করে। যদি আইআরসি প্রাপ্তির জন্য সদস্যপদ বাধ্যতামূলক না থাকে, তাহলে ওইসব ব্যবসায়ী বা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স প্রতিষ্ঠান বা কারখানায় দুর্ঘটনা বা শ্রম অসন্তোষ ঘটলে তার দায়ভার সমগ্র শিল্পের ওপর বর্তাবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবে।
বিকেএমইএ মনে করে, এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে মানি লন্ডারিং ও ভুঁইফোড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যে ঝুঁকি তৈরি করবে। চেম্বার বা অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যপদ সনদ মূলত একটি প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক পরিচয়ের বৈধতা হিসেবে কাজ করে। এই ফিলটারটি (বিশুদ্ধকরণ) তুলে নেওয়া হলে ভুঁইফোড় ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের আমদানি-রপ্তানি লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে ওভার-ইনভয়েসিং বা আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের (আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে পণ্য বা সেবার প্রকৃত মূল্য গোপন করে ভুয়া চালান তৈরি করা) মাধ্যমে মানি লন্ডারিং, ঋণ জালিয়াতি এবং শুল্ক ফাঁকির ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি হবে। যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
সংগঠনটির চিঠিতে উল্লেখ আছে, তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিক অসন্তোষ বা যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তিতে বিকেএমইএর সালিশি সেল এবং শ্রম সেল সরকারের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। কোনো কারখানা মালিক যদি সংগঠনের সদস্য না হন, তবে তার কারখানায় কোনো শ্রম জটিলতা সৃষ্টি হলে সংগঠন সেখানে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। ফলে শিল্প এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটার সম্ভানা রয়েছে।
বিকেএমইএ মনে করে, বাণিজ্য সংগঠন আইন ২০২২ এর মূল লক্ষ্যই হলো ব্যবসায়ীদের একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর অধীনে আনা। তার লক্ষ্যে প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানই ব্যবসার ধরন অনুযায়ী সে সব অঞ্চলের চেম্বার অথবা অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য হতে হবে, একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব কাগজ থাকতে হবে।
ব্যবসার সহজীকরণের নামে শিল্পে অরাজকতা সৃষ্টি না করে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই শ্রেয়। দেশের রপ্তানি খাতের বৃহত্তর স্বার্থে এবং সুষ্ঠু ব্যবসায়িক পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল ঘোষণা এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক আইআরসি জারি এবং নবায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চেম্বার বা অ্যাসোসিয়েশনের হালনাগাদ সদস্য সনদ দাখিল বাধ্যতামূলক বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাক রপ্তানি খাতের এ সংগঠনটি।