দ্বিতীয়বারের মতো ফেনীতে জনসভায় বক্তৃতা করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন তারেক রহমান।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাতে ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত জনসভাটি ছড়িয়ে পড়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায়। লক্ষ জনতার উদ্দেশে তিনি সমস্যা, সম্ভাবনা, আশা-প্রত্যাশার কথা যেমন তুলে ধরেন, তেমনি আয়োজন নিয়ে বিরক্তিও প্রকাশ করেন। চরম বিশৃঙ্খলায় বিরক্ত হলেও সাবলীল ভাষা ও স্বাভাবিক মেজাজে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। তবে বক্তৃতা সংক্ষেপ করেন।
ধস্তাধস্তি ও চেয়ার ছোড়াছুড়ির কারণে আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও জুলাই যোদ্ধা ও শহীদদের পরিবারের বার্তা শোনা সম্ভব হয়নি। তাদের সঙ্গে কয়েক সেকেন্ড কথা বলেই অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন তারেক রহমান। এ ঘটনায় ১৫ সাংবাদিকসহ অন্তত ৪৫ জন আহত হয়েছেন।
জনসভা মঞ্চের মতো বাইরের পরিস্থিতি নিয়েও বারবার বিরক্তি প্রকাশ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে বক্তৃতার মাঝেই বিরক্ত হয়ে চেয়ারে বসে পড়ার মাধ্যমে। একপর্যায়ে তিনি সবাইকে শান্ত হয়ে বসার অনুরোধ জানান এবং তা না হলে বক্তব্য শেষ করার ঘোষণা দেন।
এ সময় তিনি বলেন, “এখানে কিন্তু আমার নানার বাড়ি, কথা না শুনলে বক্তব্য বন্ধ করে দেব।” এ কথা বলেই বক্তৃতা বন্ধ করে দিয়ে ক্ষণিকের জন্য একা চেয়ারে বসে পড়েন তিনি। পরে আবার উঠে মাইক হাতে বক্তব্য দিলেও তার চেহারায় রাগ ও অভিমানের ছাপ স্পষ্ট ছিল। একই অবস্থা দেখা যায় মঞ্চের পাশে নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষমাণ বিগত ১৬ বছর ধরে গুম ও খুনের শিকার এবং ২০২৪ সালের এক দফা আন্দোলনে নিহতদের পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়।
তিনি বক্তৃতা শেষ করে এসব মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে সেখানে নেতাকর্মীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে তারা ভেতরে ঢুকে পড়েন। বিজিবি, পুলিশ ও সিএসএফ সদস্যরা তখন তারেক রহমানকে নিরাপদে গাড়িতে তুলে দেন।
এর আগে তারেক রহমান যখন বক্তৃতা করছিলেন, তখন একদল নেতাকর্মী পুরো নিরাপত্তা বেষ্টনী উপড়ে ফেলে মঞ্চের দিকে ছুটে যান। একপর্যায়ে কয়েকজন মঞ্চেও উঠে পড়েন। জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি সাইদুর রহমান জুয়েল একজনকে গলা চেপে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেন। এ ছাড়া মঞ্চে থাকা অন্য নেতারাও পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যস্ত ছিলেন।
এদিকে জনসভা মঞ্চ ও নিরাপত্তা বেষ্টনী নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি তিন জেলার নেতাকর্মীরাও ক্ষুব্ধ হন। হুড়োহুড়ি ও সামনে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় সভার শুরুতেই পুরো শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। তারেক রহমান মঞ্চে ওঠার পর সামনের সারিতে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি হয়। বক্তৃতার ক্ষেত্রেও প্রোটোকল মানা হয়নি। দলের ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, জয়নাল আবেদিন, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানিসহ একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার পর বক্তব্য দেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু।
এ নিয়ে নেতাদের পাশাপাশি তাদের কর্মী-সমর্থকরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসব কারণে অনুষ্ঠান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ফেনী জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন আলালও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। সাউন্ড সিস্টেম নিয়েও ছিল অভিযোগের শেষ নেই। অনেকের মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ চুরি হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এদিকে মঞ্চসহ পুরো সভার ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের চুক্তি দেওয়া হয়েছিল জেলা আওয়ামী লীগের পলাতক সাধারণ সম্পাদক নিজাম উদ্দিন হাজারীর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সোহেলকে। এ কারণে অনেকে মনে করছেন, জনসভা নিয়ে এক ধরনের নাশকতার চেষ্টা করা হয়েছিল। অন্যদিকে, ১৫ সাংবাদিকসহ অন্তত ৪৫ জন আহত হলেও বিএনপির কোনো নেতা তাদের খোঁজ নেননি। তবে আহত নেতাকর্মীদের মধ্যে পাঁচজনকে মঞ্চের অদূরে একটি মসজিদের ভেতরে শুইয়ে রাখতে দেখা গেছে।
এ ছাড়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামীর ফেনী জেলা সভাপতি শায়খুল হাদিস হাফেজ মাওলানা মুফতি তাহের সাইদকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হলেও তিনি মঞ্চে উঠতে পারেননি।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন ফেনী টেলিভিশন জার্নালিস্ট ক্লাবের সভাপতি আতিয়ার সজল। তিনি বলেন, পেশাগত কাজে বাধা দেওয়া ও হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আলাল উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত আবেগের কারণে কর্মীরা নেতাকে কাছ থেকে দেখার জন্য মঞ্চের দিকে ছুটে যান। বক্তব্যের ক্ষেত্রে প্রোটোকল না মানা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বড় শোডাউনের কারণে তা ভেঙে গেছে।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার বলেন, বড় জনসভা হওয়ায় কিছুটা নিয়ন্ত্রণহীনতা ছিল। তবে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা দুঃখজনক।
এ বিষয়ে রফিকুল আলম মজনুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে একাধিকবার ফোন করেও তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। একপর্যায়ে অন্য সংবাদকর্মীর নম্বর থেকে কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।