২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিন রাজধানীর চানখাঁরপুলে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করে পুলিশ। মানবতাবিরোধী অপরাধের সেই মামলায় মৃত্যুদন্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ডাদেশ হয়েছে পুলিশের আটজনের। এর মধ্যে পুলিশের তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে মৃত্যুদ-ের রায় দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, রমনা অঞ্চলের সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ আলম মো. আখতারুল ইসলাম।
একই মামলায় রমনা অঞ্চলের সাবেক সহকারী কমিশনার (এসি) মোহাম্মদ ইমরুলকে ছয় বছর, শাহবাগ থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক আরশাদ হোসেনকে চার বছর এবং সাবেক তিন পুলিশ কনস্টেবল মো. সুজন, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলামকে তিন বছর করে কারাদ- দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। গতকাল সোমবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের
নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেয়। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে কারাগারে থাকা আরশাদ, সুজন, ইমন ও নাসিরুলকে রায়ের সময় আদালতে হাজির করা হয়। হাবিবসহ মৃত্যুদ-প্রাপ্ত তিনজন ও সাজাপ্রাপ্ত আরও দুই আসামি এখনো পলাতক। সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান অনুযায়ী আসামিদের পলাতক দেখিয়ে মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
এর মাধ্যমে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলন দমনে সংঘটিত ব্যাপক হত্যাকান্ডসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় দ্বিতীয় কোনো মামলার রায় হলো। গত বছরের ১৭ নভেম্বর প্রথম রায়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদন্ড দেয় একই ট্রাইব্যুনাল। একই মামলায় রাজসাক্ষী (অ্যাপ্রুভার) হওয়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনকে পাঁচ বছর কারাদন্ড দেয় এই আদালত।
গতকাল চানখাঁরপুল হত্যাকা-ের মামলার রায়ের পুরো কার্যক্রম বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। মামলায় সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি শেষে গত ২০ জানুয়ারি রায় হওয়ার ধার্য দিন ছিল। তবে, ওইদিন রায় প্রস্তুত না হওয়ায় ২৬ জানুয়ারি (গতকাল) রায়ের দিন ধার্য করে ট্রাইব্যুনাল। হাবিবসহ পুলিশের তিন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সর্বোচ্চ সাজায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও প্রতিক্রিয়ায় প্রসিকিউশন বলছে, যাদের লঘু সাজা হয়েছে সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে প্রসিকিউশনপক্ষে আপিল করা হবে।
গণঅভ্যুত্থানকালে ৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় ছয় ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তারা হলেন শহীদ শাহরিয়ার খান আনাস, শহীদ শেখ মাহদি হাসান জুনায়েদ, শহীদ মোহাম্মদ ইয়াকুব, শহীদ মো. রাকিব হাওলাদার, শহীদ মো. ইসমামুল হক ও শহীদ মানিক মিয়া।
তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকিউশনে জমা দেয় ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। পরে ২৫ মে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে তা ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন। ওইদিন আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগে বলা হয়, চানখাঁরপুল এলাকায় আসামিরা নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে ছয়জনকে গুলি করে হত্যা করে। প্রতিবেদনে একটি অডিও কল রেকর্ড রয়েছে, যেখানে হাবিবুর রহমান পুলিশ কমান্ড সেন্টার থেকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে দমাতে চায়নিজ রাইফেল দিয়ে সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশ দেন।
লঘু সাজার বিরুদ্ধে আপিল করবে প্রসিকিউশন : চানখাঁরপুলে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধে কম সাজাপ্রাপ্তদের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের কথা জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। রায়ের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে, এতে আমরা সন্তুষ্ট। তবে এই মামলায় অন্য যে আসামিদের কম সাজা দেওয়া হয়েছে তার বিরুদ্ধে আমরা সুপ্রিম কোর্টে আপিল করব।’
এ সময় চিফ প্রসিকিউটর এক প্রশ্নে বলেন, সরকার কোনো অন্যায় আদেশ পালন করতে বললে রাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী তা মানতে বাধ্য নয়। তিনি বলেন, ‘এই বার্তাটা (বিচারে সাজা) হচ্ছে সবার জন্য। সরকারের কোনো অন্যায় আদেশ পালন করতে রাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বাধ্য নয়। প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আইন অনুযায়ী আচরণ করতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যদি বেআইনি কাজ করতে নির্দেশ দেয়, আপনি বাধ্য নন যে আপনি সেটা করবেন। কারণ আপনার প্রত্যেকটা কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে আদালতের কাঠগড়ায়।’
ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া শহীদ পরিবারের : চানখাঁরপুল হত্যাকা-ে পুলিশের তিন ঊর্ধ্বতনের মৃত্যুদ-ের রায়ে সন্তুষ্ট হলেও অন্য আসামিদের লঘু সাজায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যরা। চানখাঁরপুলে শহীদ পরিবারের কয়েকজন গতকাল রায় শুনতে আসেন। এ সময় কয়েকজন বলেন, এত অল্প সাজা দিয়ে শহীদ পরিবারের প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে। শহীদ আনাসের মা সানজিদা খান এ মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। রায়ের পর তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমি আমার সন্তান হারিয়েছি। সন্তানের যে খুনি, তার ভিডিও ফুটেজ সব প্রমাণ দেওয়ার পরেও যদি তিন বছরের সাজা দেওয়া হয়, তা কি আসলেই যৌক্তিক কোনো রায় হয়েছে বলে মনে করেন?’ আনাসের বাবা সাহরিয়ার খান পলাশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, ‘এটা কি কোনো সাজা হলো?’
গত বছরের ১৪ জুলাই পুলিশের আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ওই বছরের ১১ আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম, সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ ২৬ জন সাক্ষী এ মামলায় সাক্ষ্য দেন। প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন শহীদ আনাসের বাবা সাহরিয়ার খান পলাশ। আসামিপক্ষে তিনজন সাক্ষী সাফাই সাক্ষ্য দেন।