দ্বীপ জেলা ভোলা থেকে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) আকারে গ্যাস আনার পরিবর্তে সেখানে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হলে ১০ বছরে ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এর পক্ষে যুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ভোলা থেকে এলএনজি পরিবহন করতে যে ব্যয় হবে তাতে দুই বছরের খরচ দিয়েই ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব। গতকাল মঙ্গলবার ভোলার প্রস্তাবিত এলএনজির দাম নির্ধারণে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নিজস্ব কার্যালয়ে গণশুনানির আয়োজন করে। সেখানে এমন প্রস্তাব তুলে ধরেন পিডিবির অতিরিক্ত পরিচালক (অর্থ পরিদপ্তর) সৈয়দ জুলফিকার আলী। তিনি বলেন, এক ঘনমিটার গ্যাস দিয়ে চার থেকে পাঁচ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সেই বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে ঢাকায় আনতে খরচ পড়বে ১.২৪ টাকা। এতে কোনো রকম বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই।
ভোলায় তিনটি গ্যাস ক্ষেত্রের ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে, যেগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বাইরেও বিপুল পরিমাণ গ্যাসের সম্ভাবনা রয়েছে সেখানে। কিন্তু সড়ক পথে দেশের অন্যান্য অংশের কোনো সংযোগ না থাকায় ওই গ্যাস ভোলা জেলার বাইরে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তিনটি গ্যাস ক্ষেত্রের মধ্যে বর্তমানে শুধু শাহবাজপুর গ্যাস ক্ষেত্র থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। গ্যাস ক্ষেত্রটির দৈনিক উৎপাদন ক্ষমতা ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্থানীয় পর্যায়ে গ্যাসের প্রকৃত ব্যবহার ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। উদ্বৃত্ত ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস এলএনজিতে রূপান্তর করে দেশের অন্যান্য স্থানে সরবরাহের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম নির্ধারণেই বিইআরসি ওই শুনানির আয়োজন করে।
শুনানিতে পিডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, ভোলা থেকে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার প্রস্তাবে প্রতি ঘনমিটারের পরিবহন খরচ প্রস্তাব করা হয়েছে ২৯.৯০ টাকা। প্রস্তাবিত ৩০ মিলিয়ন এলএনজি পরিবহনে বছরে খরচ হবে ৯৩০ কোটি টাকা। ১০ বছরের চুক্তির বিপরীতে ৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। রাষ্ট্রের এই টাকা অপচয় না করে ভোলায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হোক। দুই বছরের পরিবহন খরচ হলেই বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়ে যাবে। বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন রয়েছে, যে কারণে পরিবহনে কোনো খরচ যোগ হচ্ছে না।
রাজধানী ও তার আশপাশের এলাকার গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে সৈয়দ জুলফিকার আলী বলেন, ‘২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস প্রয়োজন হবে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট। ঢাকা এলাকায় আমাদের সেই পরিমাণ গ্যাস কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে ঢাকা এলাকায় সংকট দূর হবে, আবার আমাদের বিদ্যুতের সংকটও দূর হবে।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পিডিবির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি অনেক দিন ধরেই গ্যাসের নিশ্চয়তার জন্য ঘুরছে। গ্যাসের সংযোগ পেতে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের সচিব বরাবর আবেদন দিয়ে রেখেছে।
গণশুনানিতে অংশ নিয়ে একাধিক আলোচক ভোলা থেকে বিপুল পরিবহন খরচ দিয়ে এলএনজি আনার বিপক্ষে মতামত তুলে ধরেন।
বিইআরসি কারিগরি কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, এলএনজি আকারে আনার বিষয়টি যেহেতু নতুন, তাই হিসাব করে সুনির্দিষ্ট খরচ বের করা কঠিন। তবে এটার দাম সর্বোচ্চ ২৯.৯০ টাকা করা যেতে পারে। এলএনজি আনার জন্য দরপত্র আহ্বান করার পর যে প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হবে, তাদের বিইআরসি লাইসেন্স নিতে হবে, তারপর গণশুনানি করে দর চূড়ান্ত করা যেতে পারে।
গণশুনানিতে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বলা হয়, ভোলা থেকে এখন সিএনজি আকারে গ্যাস আনা হচ্ছে। সেই গ্যাসের পরিবহন খরচ নির্বাহী আদেশে ২৯.৯০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গ্যাসের দামসহ ভোক্তাকে দিতে হচ্ছে ৪৭.৫০ টাকা। আগের সরকারের নির্বাহী আদেশে নির্ধারিত গ্যাসের দামের সমান এলএনজির দামও নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
শুনানি শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘আমরা সবার মতামত শুনেছি, নোটও করেছি। আরও কারও কোনো রকম মতামত থাকলে ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে লিখিত মতামত দিতে পারবেন। তারপর সবকিছু যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’
এলএনজির আকারে না এনে পাইপলাইনে করে আনা-সংক্রান্ত বক্তব্যের জবাবে জালাল আহমেদ বলেন, ‘পাইপলাইন লাগবেই, এটা পর্যবেক্ষণে উল্লেখ থাকবে। ভোলা-বরিশাল পাইপলাইনের প্রাক-সমীক্ষা শেষ হয়েছে। আমি মনে করি, ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন আগে করা যেতে পারে। কারণ এখন সময় খুবই গুরত্বপূর্ণ।’
শুনানিতে পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, বাপেক্স, জিটিসিএল, আরপিজিসিএলসহ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা অংশ নেন।
ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস আনতে পাইপলাইন স্থাপনের বিষয়ে কয়েক দশক ধরেই আলোচনা চলে আসছে। ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইনের পরিকল্পনা থাকলেও রুট পরিবর্তন করে ভোলা-বরিশাল-ঢাকা করা হয়েছে। ভোলা-বরিশাল পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে। বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।