কাঁটা ৫১২ অস্ত্র কারবারি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আমেজ এখন সারা দেশেই। প্রার্থীরা নানা কৌশলে ভোট চেয়ে আবেদন জানাচ্ছেন ভোটারদের কাছে। প্রার্থীরা একে অপরকে আঘাত-পাল্টা আঘাত করছেন; ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন প্রত্যেকেই। আবার তাদের সমর্থকরাও সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন। ইতিমধ্যে সারা দেশে অর্ধশত সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

প্রার্থীদের আঘাত-পাল্টা আঘাত এবং তাদের সমর্থকদের সংঘর্ষে জড়ানোর কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার উপক্রম হয়েছে। বাড়তি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে। অস্ত্র কারবারিদের নতুন তালিকা তৈরি করেছে পুলিশের দুটি ইউনিট। তালিকাটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। অস্ত্র কারবারিদের বিষয়ে গত সপ্তাহে পুলিশ সদর দপ্তরে বিশেষ বৈঠকও হয়েছে।

পুলিশের একটি সূত্র জানিয়েছে, তালিকায় বলা হয়েছে ঢাকাসহ সারা দেশে ৫১২ অস্ত্র কারবারি গ্রুপ সক্রিয় আছে। নির্বাচনে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে ওইসব অস্ত্র কারবারিরা, তাদের নিয়ে পুলিশে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আছে। তাদের দ্রুত আইনের আওতায় নিতে পুলিশের সব ইউনিটপ্রধানকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

নির্দেশনা পেয়ে জেলার পুলিশ সুপাররা থানার ওসি ও গোয়েন্দাদের দিয়ে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে। পুলিশও বলছে, সীমান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়

থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রও ওইসব কারবারিদের কাছে রয়েছে। বেহাত হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে পুলিশ। তারা সংসদ নির্বাচনেও হুমকি তৈরি করতে পারে। এসব আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে খুনখারাবি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক কারবার, ডাকাতি, ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব প্রভৃতি বিরোধে ও অপরাধে ব্যবহার করা হচ্ছে। নির্বাচনের সময় যত ঘনিয়ে আসছে উত্তাপ ও উদ্বেগ ততই বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের বাসা থেকে লাইসেন্স করা অস্ত্র-গুলি লুট হয়েছে। এসব অস্ত্রের হাতবদলও হয়েছে।

পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানা কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ অন্য অপরাধীদের ধরার চেষ্টা চলছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা কাজ করছি। অস্ত্র কারবারিদের নতুন তালিকা ধরে অভিযান চলছে। তাদের বিষয়ে পুলিশের ইউনিটগুলোয় বিশেষ নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে।’

পুলিশ সদর দপ্তরে বৈঠকে উপস্থিত থাকা পুলিশের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার শঙ্কা আছে। বিশেষ করে অস্ত্র কারবারিদের নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে বৈঠকে বিশদ আলোচনা হয়েছে। যারা অস্থিতিশীলতা তৈরি করার চেষ্টা করছে তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ইউনিটপ্রধান, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে বিশেষ বার্তাও পাঠানো হয়েছে। গুলি, ডাকাতি, ছিনতাই, খুন, দস্যুতা, পাশবিক নির্যাতন, চাঁদাবাজি, নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা, মাদকদ্রব্য কেনাবেচা, চোরাচালান, চুরি প্রভৃতি অপরাধ বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে তল্লাশি চৌকি বাড়ানো, অপরাধপ্রবণ এলাকায় টহলসংখ্যা বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অতিরিক্ত প্যাট্রল ডিউটি বাড়ানোর বিষয়ে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট প্রধান, উপ-পুলিশ কমিশনার, সেনাবাহিনীর মাঠে নিয়োজিত ব্রিগেডপ্রধান ও অন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে সমন্বয় করে অস্ত্র কারবারিদের ধরতে বলা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘থানা থেকে যেসব অস্ত্র লুট হয়েছে সেগুলো নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি। আমরা নিশ্চিত হয়েছি, অস্ত্রগুলো ওইসব কারবারিদের কাছেই আছে। গণঅভ্যুত্থান চলাকালে পুলিশের থানা, ফাঁড়ি থেকে বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদ লুট হয়েছে। তন্মধ্যে থানার ১ হাজার ৩৩৫টি ও কারাগারের ২৭টি অস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৪টি গোলাবারুদ উদ্ধার হয়নি এখনো। এসব আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে সরকার পুরস্কারও ঘোষণা করেছে। তারপরও অস্ত্র উদ্ধার করতে হিমশিম খাচ্ছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো।’

পুলিশসূত্র জানায়, কারবারিদের নিয়ন্ত্রণে আন্ডারওয়ার্ল্ডের অবৈধ অস্ত্রের বাজার। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। পাড়া-মহল্লায় অবাধে কেনাবেচা হচ্ছে ওইসব অস্ত্র। অস্ত্রবাজরা টার্গেট করছে রাজনৈতিক নেতাকর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষকে। তালিকার পর তালিকা করেও ওইসব কারবারিদের ধরতে হিমশিম খাচ্ছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা। রাজনৈতিক ক্যাডার থেকে শুরু করে উঠতি অপরাধীরা প্রকাশ্যেই অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে। রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা, টেন্ডারবাজি থেকে শুরু করে খুন, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের কাজে ব্যবহত হচ্ছে অত্যাধুনিক অবৈধ অস্ত্র। নজরদারি না থাকায় দেশের বিভিন্ন সীমান্ত পথে হরহামেশা ঢুকছে আগ্নেয়াস্ত্র। অপরাধীরা স্পেন ও জার্মানির তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে। ওইসব অস্ত্র ওজনে হালকা, গুলি করার সময় শব্দ ও ঝাঁকুনি কম হয় এবং সহজেই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। এ ধরনের পিস্তল সন্ত্রাসীদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে প্রায়ই।

গোয়েন্দাসূত্র জানিয়েছে, রাজনৈতিক ক্যাডার ও অপরাধীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে ছোট আকারের অস্ত্র। বহন ও ব্যবহার নিরাপদ বলেই তারা ক্ষুদ্রাস্ত্র ব্যবহারে বেশি আগ্রহী। ৭৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে পাঁচ লাখ টাকায় মিলছে অত্যাধুনিক অস্ত্র। উদ্ধার হওয়া ছোট অবৈধ অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে উগনি কোম্পানির রিভলবার, মাউজার পিস্তল, ইউএস তাউরাস পিস্তল, ইতালির প্রেটো বেরোটা পিস্তল, জার্মানির রুবি পিস্তল, ইউএস রিভলবার, আমেরিকার তৈরি নাইন এমএম পিস্তল ও মেগনাম কোম্পানির থ্রি-টু বোরের রিভলবার। যুক্তরাষ্ট্র, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান, ব্রাজিল, বুলগেরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, পাকিস্তান, চীন, ইসরায়েল, জার্মানি ও রাশিয়ার তৈরি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে ভারত ও মিয়ানমার হয়ে বঙ্গোপসাগর পাড়ি দেয়। চাইনিজ রাইফেল, পিস্তল, রিভলবার, স্টেনগান, মেশিনগান, সাব-মেশিনগান, কালাশনিকভ সিরিজের একে-৪৬, একে-৪৭, একে-৫৪, একে-৫৬, একে-৭৪ ও এম-১৬-এর মতো ভয়ংকর অস্ত্রও আসছে বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে অস্ত্র কারবারিদের নামও উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা চোরাকারবারিরা বেশি ব্যবহার করছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, সন্দ্বীপ, সীতাকুণ্ড, রাঙ্গুনিয়া, বান্দরবান, রাঙ্গামাটির সাজেক, খাগড়াছড়ির রামগড়, ফেনী, নোয়াখালী, চাঁদপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, কুষ্টিয়া, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, মোংলা, উখিয়া, রামু, টেকনাফ, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, রাউজান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, হিলি ও সিলেটের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র আসছে। একেকটি একে-৪৭ রাইফেল ৪ লাখ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা, আমেরিকার তৈরি পিস্তল দেড় লাখ থেকে দুই লাখ টাকা, নাইন এমএম পিস্তল ম্যাগজিনসহ দেড় লাখ থেকে ২ লাখ টাকা, থ্রিটু বোরের রিভলবার ২ লাখ টাকা, উগনি কোম্পানির রিভলবার ২ লাখ টাকা, মাউজার পিস্তল দুই লাখ টাকা, ইউএস তাউরাস পিস্তল আড়াই লাখ টাকা, ইতালির প্রেটো বেরোটা পিস্তল সাড়ে তিন লাখ টাকা, জার্মানির রুবি পিস্তল আড়াই লাখ টাকা, ইউএস রিভলবার দেড় লাখ টাকা, চায়নিজ রাইফেল দেড় লাখ টাকা থেকে দুই লাখ টাকা, পাইপগান (ভারতে তৈরি) ৬০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা, গুলি প্রতি রাউন্ড দুইশ টাকা, দেশি অস্ত্রের মধ্যে টুটু বোরের পিস্তল ৩০ হাজার ও রিভলবার ৪৫ হাজার টাকায় কেনাবেচা হচ্ছে। তাছাড়া ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকার মধ্যে পিস্তল ও রিভলবার ভাড়ায় পাওয়া যায়। অপারেশন শেষ হলে এসব অস্ত্র আবার ফেরত দেওয়া হয়।