ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় মুখরিত ভোটের মাঠ। নিজের পক্ষে ভোট চাওয়ার পাশাপাশি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগও করছেন প্রার্থীরা। জড়াচ্ছেন বাকযুদ্ধেও। কখনো কখনো সেটা রূপ নিচ্ছে সংঘাতে। গত মঙ্গলবার রাত থেকে গতকাল বুধবার বিকেল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে এমন সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে গতকাল বিকেলে শেরপুর-৩ আসনের ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে সংঘর্ষে জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা নিহত হয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে বসার আসন নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার জেরে বিএনপি ও জামায়াতের কর্মীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম গুরুতর আহত হন। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মৃত্যু হয় তার। ওই ঘটনায় আরও ২৯ জন আহত হয়েছেন।
শেরপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী নুরুজ্জামান (বাদল) ফেসবুকে এক পোস্টে লেখেন, ‘ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে বিএনপি সমর্থকদের বর্বরোচিত হামলায় আমাদের শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হয়েছেন। এ হামলায় আমাদের ১৫ জনের বেশি নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’ তিনি আরও লেখেন, পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিএনপি ও তাদের সমর্থকরা এ হামলা করেছে। আমরা প্রশাসনের কাছে এর সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে মাওলানা রেজাউল করিমের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এ ছাড়া এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ক্ষোভ ও তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ করছে ইসলামী ছাত্রশিবির।
শেরপুর উপজেলা প্রশাসন সূত্র ও স্থানীয়রা জানান, পূর্বঘোষিত ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠের আয়োজন করা হয়। সে অনুযায়ী সকাল থেকেই বিভিন্ন দলের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী অনুষ্ঠানস্থলে হাজির হন। এরপর অনুষ্ঠানের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আশরাফুল আলম রাসেল আসেন। এ সময় তিনিসহ প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা মঞ্চে বসেন। কিন্তু স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজন কর্মী-সমর্থক সামনের সারির চেয়ারে বসতে না পেরে হট্টগোল শুরু করেন। এরপর কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। এ সময় মঞ্চের সামনে রাখা কয়েকশ চেয়ার ভাঙচুর করা হয়। এতে উভয়পক্ষের অন্তত ৩০ জন আহত হন। অনুষ্ঠানস্থলে থাকা কয়েকটি মোটরসাইকেলও ভাঙচুর করা হয়। আশপাশের লোকজন আহতদের উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করেন। খবর পেয়ে পুলিশ, সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী মাহমুদুল হক রুবেল বলেন, ‘উগ্রবাদী, জঙ্গি জামাতিরা পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করছে। তারা দেশকে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে চাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঝিনাইগাতীর ইশতেহার অনুষ্ঠান শুরুর প্রাক্কালে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে হামলা চালিয়েছে। এতে আমাদের দলের অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। বর্তমানে তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছেন।’
ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা আশরাফুল আলম রাসেল সাংবাদিকদের বলেন, ‘সব প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নিয়ে আমরা ইশতেহার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম। কিন্তু সেখানে বসাকে কেন্দ্র করে একটু ঝামেলা হয়েছে। পরিস্থিতি আমরা নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছিলাম।’
ওই সংঘর্ষে নেতাকর্মী আহত হওয়ার হওয়ার প্রতিবাদে রাতে শেরপুর শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে জেলা জামায়াতে ইসলামী। এরপর মাওলানা রেজাউল করিমের মৃত্যুর খবর পৌঁছালে রাতে শেরপুর শহরে বিক্ষোভ করে দলটি। মিছিলের পর সংক্ষিপ্ত সমাবেশে এ ঘটনার জন্য বিএনপিকে দায়ী করা হয়। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান।
এদিকে গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে আহত হয়েছেন সাতজন। নগরের ডবলমুরিং, খুলশী ও হালিশহর নিয়ে গঠিত ওই আসনের বিএনপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমান ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী শামসুজ্জামান হেলালীর কর্মী-সমর্থকের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। নগরের আমবাগান এলাকায় এ ঘটনায় ‘আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের’ একটি কার্যালয়ও ভাঙচুর করা হয়। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হামলায় তাদের সাতজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের কার্যালয় ভাঙচুরের পাশাপাশি সেখানে অবস্থানরত নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ এনেছে।
পুলিশ জানায়, রাত ১০টার দিকে শামসুজ্জামান হেলালীর পক্ষে গণসংযোগ শেষ করে জামায়াতে ইসলামীর কর্মী-সমর্থকরা দলবদ্ধভাবে ফিরছিলেন। আমবাগান এলাকায় রেললাইনের পাশে ‘আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদ’ কার্যালয়ের সামনে পৌঁছার পর তারা সেøাগান দিতে শুরু করেন। এ সময় ওই কার্যালয়ের ভেতরে বিএনপিকর্মীরা অবস্থান করছিলেন। তারা কার্যালয়ের বাইরে এসে পাল্টা সেøাগান দিতে শুরু করেন। উভয়পক্ষে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং একপর্যায়ে পরস্পরের প্রতি ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে।
খুলশী থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আরাফাত রহমান কোকো স্মৃতি সংসদের অফিসের সামনে দুই দলের লোকজনের পাল্টাপাল্টি সেøাগান থেকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আমাদের পুলিশ টিম আগে থেকেই সেখানে ছিল। তারা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। পরে অভিযোগ পেয়েছি, অফিসটা ভাঙচুর হয়েছে। কিন্তু পুলিশের উপস্থিতির সময় এটা হয়নি।’
এ ছাড়া গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী নাহিদুজ্জামান নিশাদের সমর্থকদের চারটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এ সময় তার দুই কর্মী আহত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার রাতে সাঘাটা উপজেলার কচুয়া বাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রার্থী নাহিদুজ্জামান নিশাদ জানান, মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে তার কর্মী কচুয়া এলাকার বাসিন্দা নুরুজ্জামান সরদারের বাড়িতে প্রবেশ করে তিনটি মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়। একই রাতে প্রচারণা শেষে বাড়ি ফেরার পথে একই উপজেলার ভন্নতের বাজার এলাকায় তার আরেক কর্মী আবু শাহীসহ কয়েকজনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে আবু শাহীসহ দুজন আহত হন। পরে শাহীর ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। খবর পেয়ে স্থানীয়রা তাদের সাঘাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভর্তি করে।
নাহিদুজ্জামান নিশাদ অভিযোগ করে জানান, প্রচারণা শুরুর দিন থেকেই তাদের প্রচারে বাধা দিচ্ছেন বিএনপিদলীয় প্রার্থী ফারুক আলম সরকারের কর্মী-সমর্থকরা। এ পর্যন্ত তিন দিনের হামলায় তার কর্মী-সমর্থকদের ১৪টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আহত করা হয়েছে বেশ কয়েকজন কর্মীকে। প্রশাসনকে বারবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার কিংবা সহযোগিতা মিলছে না।
এসব বিষয় সাঘাটা থানার ওসি মাহাবুব আলম জানান, পুড়ে যাওয়া মোটরসাইকেলগুলো জব্দ করা হয়েছে। আগের হামলার ঘটনায় একজনকে আটক করা হয়েছে। মঙ্গলবার রাতের হামলার ঘটনার তদন্ত চলছে।
তবে বিএনপি প্রার্থী ফারুক আলম হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, ভাঙচুরের বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। শুনেছি স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।