ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচারণার অষ্টম দিনে রাজশাহীতে নির্বাচনী সমাবেশ করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সমাবেশে তিনি বলেন, যারা ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল তারা চলে গেছে। আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন বানচালের জন্য ভেতরে ভেতরে আরেকটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। এখন জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। সবাই সতর্ক থাকলে ১৩ তারিখ থেকে শুরু হবে জনগণের দিন। সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যান পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন পরিল্পনার কথা জানান। পাশাপাশি কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের ঘোষণা দেন। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
এর আগে দুপুর সোয়া ১২টার দিকে তারেক রহমান রাজশাহীর হজরত শাহ মখদুম বিমানবন্দরে পৌঁছান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। বিমানবন্দর থেকে নিজস্ব বাসযোগে সরাসরি হজরত শাহ মখদুম (র.)-এর মাজার জিয়ারত করতে যান। সেখান থেকে বেলা দেড়টার দিকে তিনি রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠের জনসভাস্থলে গেলে উচ্ছ্বসিত নেতাকর্মীরা সেøাগান দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। রাজশাহী থেকে সড়ক পথে নওগাঁ যান বিএনপি চেয়ারম্যান। সেখানে এটিএম মাঠ, কাজির মোড়ে সমাবেশে বক্তব্য দেন। এরপর সরাসরি বগুড়া যান তিনি। বগুড়ায় রাতযাপন শেষে আজ শুক্রবার তারেক রহমান রংপুরে যাবেন। সেখানে পীরগঞ্জে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন। এরপর যোগ দেবেন রংপুর ঈদগাঁও মাঠে নির্বাচনী সমাবেশে। সেখান থেকে ফিরে বগুড়ায় রাতযাপন করবেন। শনিবার দুপুরে সিরাজগঞ্জে বিসিক শিল্প পার্কে সমাবেশে যোগ দেবেন। এরপর ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের দরুন চরজানা বাইপাস এলাকায় সমাবেশে যোগ দেবেন। এরপর ঢাকার ফিরবেন তারেক রহমান।
তারেক রহমান বলেন, ‘বিগত ১৬ বছর আমরা কয়েকটি তথাকথিত নির্বাচন দেখেছি। রাতের নির্বাচন দেখেছি, আমি-ডামি নির্বাচন দেখেছি, গায়েবি নির্বাচন দেখেছি। দেশের মানুষ ভোট দিতে পারেনি। তারা চলে গেছে, যারা ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু আরেকটি মহল ষড়যন্ত্র করছে। ভেতরে-ভেতরে ষড়যন্ত্র করছে কীভাবে এ নির্বাচন ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, কীভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়।’
অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান : ২৫ মিনিটের বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি। ঝগড়া-বিবাদের মধ্যে যেতে চাই না এবং এজন্যই আমি এখানে দাঁড়িয়ে কারও কোনো সমালোচনা করছি না। কিন্তু কোথাও যদি কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটে থাকে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আছে, তাদের বলব সঠিক সুষ্ঠু তদন্ত করুন। সেই তদন্তে যদি বিএনপির কোনো ভূমিকা থাকে, সঠিক তদন্ত করার জন্য আমরা সহযোগিতা করব, সাহায্য করব। কিন্তু অবশ্যই সঠিক তদন্ত হতে হবে। দেশের আইন অনুযায়ী বিচার হতে হবে।
পদ্ম ব্যারাজ নির্মাণের ঘোষণা তারেক রহমানের : বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষানগরী এ নগরীতে বহু শিক্ষিত, উচ্চশিক্ষিত মানুষ আছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে বহু মানুষ আজকে কর্মসংস্থানের অভাবে ঘরে বসে আছে। এখানে আইটি পার্ক করেছে কিন্তু কোনো কাজ হয় না। এখন এ বিষয়গুলো আমাদের নজর দিতে হবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বরেন্দ্র প্রকল্প চালু করার পরেই দেশে খাদ্যের দ্বিগুণ উৎপাদন করা হয়। এখন বন্ধ বরেন্দ্র প্রকল্প চালু করতে চাই সঠিকভাবে। পদ্মা নদীসহ এলাকার খালগুলোকে খনন করতে চাই। পদ্মা নদীকে আমরা খনন করতে চাই। আরেকটি কাজ করতে চাই যদি আপনাদের সমর্থন থাকে, ধানের শীষ সরকার গঠন করলে ইনশাআল্লাহ আমরা পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের কাজে হাত দিতে চাই।
রাজশাহীতে আম ও কৃষিপণ্য সংরক্ষণে হিমাগার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, কৃষকরা তাদের উৎপাদিত পণ্য হিমাগারে রাখতে পারে, আমাদের সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে। আমাদের চাঁপাই-রাজশাহীর আমবাগানের আমকে সংরক্ষণ করার জন্য কোনো হিমাগার নেই। আমরা পরিকল্পনা করেছি, আম সংরক্ষণে হিমাগার তৈরি করতে চাই। রাজশাহীসহ উত্তরাঞ্চল মূলত কৃষিনির্ভর। কৃষি পেশা-সংক্রান্ত যেসব ইন্ডাস্ট্রি করা সম্ভব সেগুলোর একটি তালিকা কমবেশি আমরা তৈরি করেছি। নির্বাচনের পর সরকার গঠনে সক্ষম হলে সরকার থেকে সবরকম সহায়তা দেওয়া হবে।
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা ঠিক ফ্যামিলি কার্ড যেরকম মায়েদের হাতে পৌঁছে দিতে চাই, কৃষক ভাইদের জন্য আমরা কৃষি কার্ড পৌঁছে দিতে চাই। যার মাধ্যমে তারা ব্যাংকের ঋণসহ সরকারের পক্ষ থেকে কীটনাশক ওষুধ বীজসহ সার এ সুবিধাগুলো সরাসরি আমরা দিতে চাই। এ ছাড়া আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষ বিজয়ী সরকার গঠন করলে আমরা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষি লোন সুদসহ মওকুফ করব।
গণতন্ত্র থাকলে জবাবদিহিমূলক শাসন আসবে : তারেক রহমান বলেন, দেশের মানুষকে আজকে একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গণতন্ত্রের দিকে আমরা দেশকে ধাবিত করতে পারলে আপনাদের সামনে আমি যে পরিকল্পনার কথাগুলো তুলে ধরলাম, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। গণতন্ত্রের ভিত্তিকে মজবুত করতে হবে। অতীতে আমরা দেখেছি, যারা ক্ষমতা দখল করে রেখেছিল জনগণের কাছে তাদের কোনো জবাবদিহি ছিল না এবং জনগণের কাছে যেহেতু তাদের কোনো জবাবদিহি ছিল না; দেশে দুর্নীতি, অনাচার, খুন, গুম হয়েছে।
বক্তব্যের শেষপর্যায়ে তারেক রহমান রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৩টি আসনের প্রার্থীকে ধানের শীষ তুলে দিয়ে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দেন। এ সময় তিনি নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের আপনারা দেখে রাখেন। ১৩ তারিখ থেকে তারা আপনাদের দেখবেন।
সমাবেশে বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও রাজশাহী-২ আসনের বিএনপিদলীয় প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনু, বিএনপি নেতা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, শফিকুল হক মিলন, মেজর জেনারেল (অব.) শরিফ উদ্দীন, হারুনুর রশীদসহ এমপি প্রার্থীরা। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশীদ। অন্ষ্ঠুান পরিচালনা করেন মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন। রাজশাহীর জনসভা শেষ করেই তারেক রহমান নওগাঁর উদ্দেশে রওনা হন।
নওগাঁ প্রতিনিধি জানিয়েছে, জেলার এটিএম মাঠ, কাজির মোড়ে অনুষ্ঠিত সমাবেশে তারেক রহমান বলেছেন, একটি দলের ভোট ডাকাতির ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি। তাই সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেন, একটি দলের ষড়যন্ত্র, ওই ষড়যন্ত্র কিন্তু এখনো শেষ হয়নি। একটা পক্ষ তো পালিয়ে গিয়েছে দেশ থেকে। কিন্তু আরেকটা পক্ষ আছে যারা এ দুপক্ষ আবার আগে থেকে একসঙ্গেই ছিল। এ দুপক্ষ কিন্তু তলে তলে একসঙ্গেই ছিল। গত ১৬ বছরেও আপনারা মাঠেঘাটে কোথাও ওদের পেয়েছেন, আন্দোলন সংগ্রামে তাদের পেয়েছেন? ওই ভেতরে ভেতরে কিন্তু তাদের সঙ্গেই ছিল তারা। এখন তারা আবার ষড়যন্ত্র শুরু করছে। এখন আপনাদের চোখ-কান খোলা রাখতে হবে যাতে ষড়যন্ত্র করে আপনাদের ভোট এদিক-ওদিক না করে।
তারেক রহমান বলেন, ব্যালেট বাক্স পাহারা দিতে হবে। ২০০৮ সালে কী হয়েছিল মনে আছে? ২০০৮ সালে কিন্তু ওই যে ম্যাজিক... এই আছে, এই নাই। একবার খালি বাক্স দেখায়, আবার ভরা বাক্স দেখাচ্ছে... মনে আছে তো। কাজেই এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে আপনাদের।
নওগাঁ ও জয়পুরের ভোটারদের সকালে অর্থাৎ, ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটের দিন তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে ভোটকেন্দ্রের সামনে গিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করে লাইনে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ভোটকেন্দ্র খুললে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়া শুরু করবেন।
নওগাঁ রেললাইন স্থাপন, কৃষিপণ্যের সংরক্ষণের জন্য হিমাগার শিল্প স্থাপনে উদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা প্রদানসহ বিভিন্ন দাবি পূরণ করতে ধানের শীষকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারম্যান।
নওগাঁ জেলা সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিকী নান্নুর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান রিপনের সঞ্চালনায় নওগাঁর ছয়টি আসনের প্রার্থী সামসুজ্জোহা, জাহেদুল ইসলাম ধলু, শেখ রেজাউল ইসলাম, একরামুল বারী টিপু, মোস্তাফিজুর রহমান এবং জয়পুরহাটের দুই প্রার্থী আব্দুল বারী ও মাসুদ রানা প্রধান বক্তব্য দেন। এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা শাহীন শওকত, এএইচএম ওবায়দুর রহমান চন্দন, এমএ মতিন, মাহবুবুর রহমান, স্বেচ্ছাসেবক দলের নাজমুল হাসানসহ জেলার অঙ্গসংগঠনের নেতারা বক্তব্য রাখেন। নওগাঁর নির্বাচনী সমাবেশ করে তারেক রহমানের গাড়িবহর সন্ধ্যা ৭টায় বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হয়।