নিউমুরিং টার্মিনাল ঘিরে নতুন শঙ্কা

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে করা রিট খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। এ রায়ের পর বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক ও কার্যকর টার্মিনাল নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ বাতিল না করলে আগামীকাল শনিবার থেকে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রাখার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। একই সঙ্গে রবিবারও সব প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যেও যদি চুক্তির প্রক্রিয়া বাতিল না করা হয়, তাহলে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বন্দরে অস্থিরতা শুরু হয়েছে।

এনসিটি নিয়ে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির বৈধতা প্রশ্নে রুলের ওপর শুনানি শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। রিটের বিষয়ে দেড় মাসেরও বেশি সময় আগে হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভক্ত রায় দিয়েছিল। গতকালের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে রিট ও রুল খারিজের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

এদিকে রায়ের পর গতকাল দুপুরে বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে কর্মসূচি ঘোষণার পরপরই চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের করিডরে বিক্ষোভ মিছিল করে। এ সময় তারা চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দপ্তরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের (এনসিটি পরিচালনার জন্য বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার কথা) বিরুদ্ধে এবং বন্দর কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানসহ অনেকের বিরুদ্ধে সেøাগান দেয়। বন্দর ভবন প্রদক্ষিণ শেষে কারপার্কিং জায়গায় বিক্ষোভ সমাবেশ করে শ্রমিক দল।

বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমরা অবিলম্বে এই আদেশের বাতিল চাই। যদি বাতিল না করা হয়, তাহলে আগামীকাল শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের সব অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, যদি এই কর্মসূচি পালনে কেউ বাধাগ্রস্ত করে, তাহলে তাকে ডিপি ওয়ার্ল্ডের এজেন্ট হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং প্রতিহত করা হবে।

এ সময় কর্মসূচি প্রসঙ্গে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের অন্য নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, ‘আগামী রবিবারও সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। রবিবারের মধ্যে যদি সরকার তার অবস্থান থেকে সরে না আসে, তাহলে সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের কর্মসূচি দেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যেখানে আর মাত্র ১৩ দিন পর একটি নির্বাচিত সরকার আসতে যাচ্ছে। সেখানে এই অন্তর্বর্তী সরকার দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল কেন বিদেশিদের হাতে তুলে দিচ্ছে?

এনসিটির গুরুত্ব উল্লেখ করে ইব্রাহিম খোকন বলেন, এনসিটির পাশেই রয়েছে নৌবাহিনীর সাবমেরিন ঘাঁটি। এ ছাড়া পদ্মা, মেঘনা, যমুনা অয়েলের পাশাপাশি ইস্টার্ন রিফাইনারি। দেশের গুরুত্বপূর্ণ সব স্থাপনার পাশে অবস্থিত এই টার্মিনালটি কেন বিদেশিদের দেওয়া হচ্ছে? এটি অন্তর্বর্তী সরকারের কাজ নয়।

এদিকে এনসিটি নিয়ে বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। গতকাল সকাল থেকেই বন্দর ভবন ও বন্দর ভবনের প্রবেশপথে বাড়তি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিয়োজিত ছিল। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও দায়িত্বরতদের কেউ কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

গত বছরের ৪ ডিসেম্বর বিচারপতি ফাতেমা নজীব ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভক্ত রায় দেয়। রায়ে বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক ফাতেমা নজীব নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে চুক্তি-সম্পর্কিত প্রক্রিয়া অবৈধ ঘোষণা করেন।

অন্যদিকে কনিষ্ঠ বিচারক জ্যেষ্ঠ বিচারকের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে রুল খারিজ করে রায় দেন। বিভক্ত রায় হওয়ায় বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয়। প্রধান বিচারপতি মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টের একক বেঞ্চে পাঠান। এরই ধারাবাহিকতায় শুনানি শেষে গতকাল এ রায় হয়।

আদালতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও সৈয়দ মামুন মাহবুব শুনানি করেন। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক। বন্দর কর্র্তৃপক্ষের পক্ষে ছিলেন মো. হেলাল উদ্দিন চৌধুরী।

অ্যাডভোকেট মামুন মাহবুব বলেন, হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে তারা আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে গিয়েছিলেন। আদালত বলেছে, নিয়মিত আপিল করলে তারা শুনবেন। আগামী সপ্তাহেই হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত আপিল করা হবে।

চট্টগ্রাম বন্দরে ২০০৭ সালে নিউমুরিং টার্মিনালটি নির্মিত হয়। বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কনটেইনারের বেশির ভাগ এই টার্মিনাল দিয়ে পরিবহন হয়। এটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান ‘সাইফ পাওয়ারটেক’ পরিচালনা করে আসছিল। চলতি বছরের ৬ জুলাই তাদের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়। এরপর এটি পরিচালনার দায়িত্ব পায় নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনায় ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুবাই সরকারের পক্ষে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্র্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক হয়। টার্মিনাল পরিচালনা করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করেন। রুলে দেশি অপারেটরদের অনুমতি না দিয়ে পিপিপি আইন ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা লঙ্ঘন করে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে বিদেশি কোম্পানির চুক্তির চলমান প্রক্রিয়া কেন অবৈধ হবে না তা জানতে চায় হাইকোর্ট।

গত ২০ নভেম্বর হাইকোর্ট এ মামলার শুনানি না হওয়া পর্যন্ত বন্দর পরিচালনায় বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি-সম্পর্কিত প্রক্রিয়া চালানো যাবে না বলে মৌখিক আদেশ দেয়।