অস্থিরতা বাড়ছে আমদানি-রপ্তানির প্রধান গেটওয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে। আর এ অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালকে (এনসিটি) কেন্দ্র করে। এ টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য বিদেশিদের দেওয়ার বিষয়ে আদালতের রায়ের পরপরই উত্তাল হয়ে উঠেছে চট্টগ্রাম বন্দর। গত বৃহস্পতিবারের ঘোষণা অনুযায়ী আজ শনিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত হবে বন্ধ থাকবে অপারেশনাল কার্যক্রম। এদিকে কোনোভাবেই বন্দর অস্থিতিশীল করতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর তা মোকাবিলায় পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও রয়েছে বন্দর এলাকায়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘোষণা করা কর্মসূচি এখনো রয়েছে কি না, জানতে চাইলে গতকাল সন্ধ্যায় কথা হয় চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা ইব্রাহিম খোকনের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আগামীকাল (আজ শনিবার) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরের সব অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। আমাদের শ্রমিকরা কর্মস্থলে উপস্থিত হবে কিন্তু কোনো কাজ করবে না।
তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে রবিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বন্দরের সব প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে এবং এ সময়ের মধ্যে এনসিটি নিয়ে সরকারের যে আদেশ, তা প্রত্যাহার করা না হলে সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে।
কিন্তু শ্রমিক দলের এ কর্মসূচির জবাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। সেই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। যদি কেউ বন্দরের অভ্যন্তরে কিংবা বন্দরের কার্যক্রম অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উভয়পক্ষের এ অবস্থানের বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (বন্দর) মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর এলাকায় কোনো ধরনের মিছিল-মিটিং কিংবা অবস্থান কর্মসূচির মাধ্যমে জনভোগান্তি সৃষ্টি করা যাবে না। যদি কেউ এ ধরনের কার্যক্রম করার চেষ্টা করে তাহলে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’
বিএনপির কর্মসূচি বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিক দল নেতা ইব্রাহীম খোকন বলেন, ‘আমি যদি কাজে না যাই তাহলে বন্দর কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু এনসিটি বিদেশিদের বরাদ্দ দেওয়ার বিরুদ্ধে আমি আমার গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে কাজ না করে প্রতিবাদ জানাতেই পারি। এ ছাড়া বন্দরের ভেতরে আমরা কোনো মিছিল-মিটিং না করলেও বন্দরের বাইরের রাস্তায় অবশ্যই আমরা আমাদের কর্মসূচি পালন করতে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।’ এ কর্মসূচির সঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আলোকেই আমাদের এ কর্মসূচি।’
এদিকে অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ করা হলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে। এ বিষয়ে পোর্ট ইউজার্স ফোরামের সমন্বয়ক ও সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ব্যবসায়ী নেতা আমিরুল হক বলেন, ‘আমরা বন্দর ব্যবহারকারী। বন্দরের অভ্যন্তরের সমস্যা আমাদের জানার বিষয় নয়। আমরা নিরবচ্ছিন্ন সেবা চাই। যাতে পণ্যের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়।’
অস্থিরতার কারণ কী : চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল হলো এনসিটি কনটেইনার টার্মিনাল। ২০০৭ সালে ৫৭০ কোটি টাকা খরচ করে ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যরে এ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) চারটি বার্থ নির্মাণ করা হয়েছিল। বন্দরের ১৮টি অত্যাধুনিক কি গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টিই স্থাপন করা হয়েছে এখানে। একযোগে চারটি জাহাজ ভেড়ার সক্ষমতাসম্পন্ন এ টার্মিনালে রয়েছে একাধিক রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনও। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের জেনারেল কার্গো বার্থ, এনসিটি, সিসিটি ও পিসিটি এ চারটি টার্মিনাল রয়েছে। এর মধ্যে জিসিবি পরিচালনা করছে বার্থ অপারেটররা। সিসিটি পরিচালনা করে আসছে সাইফ পাওয়ারটেক ও এনসিটি চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড এবং পিসিটি পরিচালনা করছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে। উপাত্তে দেখা যায়, ২০২৪ সালে এনসিটি বন্দরের মোট কনটেইনারের মধ্যে ৪০ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৩৯ শতাংশ, ২০২২ সালে ৩৭ শতাংশ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে। লাভজনক এই রেডিমেড টার্মিনালটি বিদেশিদের বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে আন্দোলনকারীদের আপত্তি। তাদের মতে, পতেঙ্গার লালদিয়ায় টার্মিনাল নির্মাণের জন্য বিশ^খ্যাত এপি মুলারের সঙ্গে সরকার ৪৫ বছরের চুক্তি করলেও আমাদের আপত্তি ছিল না। একইভাবে বে টার্মিনালের তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দিলেও কোনো বিরোধিতা করা হয়নি। কিন্তু একটি চালু টার্মিনাল যেখানে বন্দরের নিজস্ব ইকুইপমেন্ট ও জনবল রয়েছে, সেই টার্মিনাল কেন বিদেশিদের পরিচালনার জন্য ইজারা দেওয়া হবে? এর আগে ইকুইপমেন্ট ছাড়া সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়েকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল দেওয়া হয়েছে পরিচালনার জন্য।
আদালতের নির্দেশনা কী : এদিকে এনসিটি টার্মিনাল নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে করা রিট খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। গত বৃহস্পতিবার বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। রিটের বিষয়ে দেড় মাসেরও বেশি সময় আগে হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভক্ত রায় দিয়েছিল। বৃহস্পতিবারের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে, রিট ও রুল খারিজের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এতে বিদেশিদের (ডিপি ওয়ার্ল্ড) বরাদ্দ দিতে কোনো আইনগত সমস্যা নেই।
২০০৭ সালে নির্মিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালটি নির্মাণের পর থেকেই পরিচালনা করে আসছিল দেশীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক। গত বছর ৬ জুলাই তাদের চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে ছয় মাসের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডকে। কিন্তু নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুবাই সরকারের পক্ষে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের সমঝোতা স্মারক হয়। টার্মিনাল পরিচালনা করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনের সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করেন। রুলে দেশি অপারেটরদের অনুমতি না দিয়ে পিপিপি আইন ও সংশ্লিষ্ট নীতিমালা লঙ্ঘন করে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিদেশি কোম্পানির চুক্তির চলমান প্রক্রিয়া কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চায় হাইকোর্ট। গত বৃহস্পতিবার সেই রিট খারিজ করে দেওয়া হয়। এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে, এনসিটি পরিচালনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার কথা।