ইমেরিটাস অধ্যাপক
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ
অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকারিতা বা রেজিস্ট্যান্স স্বাস্থ্যব্যবস্থায় একটি অনাগত ঝুঁকি। এরপরও অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার হয়েই চলছে। একটা অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করলে অন্য অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় সেটিও কাজ করছে না। তখন অধিক কার্যকর এবং অনেক দামি অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে হচ্ছে। সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে যে ফল পাওয়া সম্ভব ছিল, দেখা যায় অধিক কার্যক্ষমতা সম্পন্ন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারেও সে ফল পাওয়া যাচ্ছে না। সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে যে রোগ শুরুতেই ভালো করা যেত, ভুল ব্যবহারের কারণে তা আর সম্ভব হচ্ছে না, নতুন ওষুধ দরকার হচ্ছে, কখনো কখনো তাতেও কাজ হচ্ছে না।
অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতার কারণ :
ওষুধ ব্যবহারের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের বেঁধে দেওয়া বিধিনিষেধ অনেক সময় মানি কম। সময়মতো ওষুধ খাওয়া, খাওয়ার আগে, না পরে এসব আমরা খেয়াল রাখি না। অ্যান্টিবায়োটিকের মাত্রার ক্ষেত্রে আমরা পুরোপুরি উদাসীন থাকি। সবচেয়ে ভয়াবহ হলো পূর্ণ মাত্রা কমপ্লিট না করে ওষুধ বন্ধ করে দেওয়া।
প্রায় সময়েই দেখা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া দরকার ৭ থেকে ১০ দিন। কয়েকটা অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে সুস্থতাবোধ করলে বা দুই-তিন দিন ওষুধ খেয়ে জ¦র ভালো হয়ে গেছে, অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার আর কী দরকার, এসব ভেবে নিজেরাই ওষুধ বন্ধ করে দেন। অন্যদিকে কয়েকদিন অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে রোগ ভালো না হলে ‘ওষুধ কার্যকর নয়’ ভেবে বন্ধ করে দিই এবং অন্য চিকিৎসকের কাছে নতুন ওষুধের প্রত্যাশায় যাই। এভাবে ওষুধের অপব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।
আমাদের দেশে ফার্মেসির বিক্রেতারা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করে। যে কেউ চাইলেই ইচ্ছেমতো অ্যান্টিবায়োটিক কিনতে পারে, ডোজ মানছে না, নিয়ম মানছে না, যেমন ইচ্ছা হলো খাচ্ছে, যখন ইচ্ছা বন্ধ করছে। এসব আরও ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।
যাদের চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনা কম, তারা উপযুক্ত মাত্রা এবং মেয়াদ সম্পর্কে না জেনেই রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছে, এটাও একটা খারাপ দিক।
আমাদের দেশে প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই ফার্মাসিস্ট হিসেবে কাজ করছে ওষুধের দোকানে। এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাক্তার না থাকায় এ ধরনের বিক্রেতারাই রোগীকে ব্যবস্থাপত্র এবং অ্যান্টিবায়োটিক দিচ্ছে। এক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগীর বয়স ও ওজন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয় না। এমনকি খাবার আগে-পরে বা কতদিন খেতে হবে তারও নির্দেশনা থাকে না বা রোগীকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা হয় না। ফলে রোগীর শারীরিক এবং আর্থিক উভয় দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে।
অনেক সময় রোগী ও তাদের লোকজনও চিকিৎসকদের প্রেসক্রিপশন গ্রহণ ও তা অনুযায়ী ওষুধ কেনার প্রয়োজন অনুভব করেন না। এছাড়া ওষুধপত্রের দাম, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং হাসপাতালের খরচ খুবই ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে, যা বহন করা অনেকের জন্য দুরূহ হয়ে উঠছে।
প্রতিরোধে করণীয় : আমাদের হাতে কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিকের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোয় সংক্রামক রোগ বেশি, অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজনও বেশি। তাই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধে অবশ্যই সচেতনতা দরকার এবং অ্যান্টিবায়োটিকের অকার্যকারিতা রোধে এখনই প্রয়োজনীয় সমন্বিত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
রোগীদের যা মেনে চলা উচিত
রোগীদের সচেতন হতে হবে, তারা যেন যখন তখন ফার্মেসি থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়া কোনো ওষুধ কিনে না খান। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ খেতে হবে এবং অবশ্যই উপযুক্ত মাত্রা এবং মেয়াদ অনুযায়ী। বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী মা এবং বয়স্কদের ব্যাপারে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
ডাক্তারের নির্দেশনা অনুযায়ী সঠিক মাত্রায় ওষুধ সেবন করতে হবে, যেমন কতটুকু ওষুধ, কতক্ষণ পরপর, কত দিন, খাবার আগে না পরে ইত্যাদি। কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তনের আগে ডাক্তারকে অবহিত করতে হবে, সুস্থবোধ করলেও কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। কোনো সমস্যা হলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
ডাক্তারের দায়িত্ব : অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার ক্ষেত্রে ডাক্তারের দায়িত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভুল বা অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক রোগীর ক্ষতি করতে পারে।
সঠিক রোগ নির্ণয় ও রোগের ধরন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক, ডোজ ও সময়কাল স্পষ্টভাবে প্রেসক্রিপশনে উল্লেখ করতে হবে। নেহায়েত প্রয়োজন বা জীবন রক্ষাকারী না হলে শক্তিশালী বা ব্রড স্পেকট্রাম অ্যান্টিবায়োটিক পরিহার করতে হবে।
অ্যান্টিবায়োটিক শুধু ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে দিতে হবে, ভাইরাল যেমন সর্দি, ফ্লু, ডেঙ্গু ইত্যাদি রোগে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া উচিত না।
রোগীকে রোগ ও ওষুধ সম্পর্কে মোটামুটি কমবেশি জানানো উচিত। ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে জানানো এবং কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলে, ওষুধ আপাতত বন্ধ করে দ্রুত ডাক্তারকে জানাতে হবে।
ওষুধ বিক্রেতার কর্তব্য : অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধে ওষুধ বিক্রেতাকে অবশ্যই কিছু দায়িত্ব পালন করতে হবে। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা উচিত। শুধু ব্যবসায়িক স্বার্থে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক এমনকি অন্য যেকোনো ওষুধ বিক্রি করাও উচিত নয়। সুন্দরভাবে প্যাকেটের ওপর প্রয়োজনীয় মাত্রা, কতবার, কীভাবে সেবন করতে হবে, খাওয়ার আগে বা পরে, তা রোগীকে বা রোগীর লোকজনকে বুঝিয়ে দিতে হবে। প্রেসক্রিপশনে অ্যান্টিবায়োটিক নির্দিষ্ট পরিমাণ লেখা থাকে, দ্বিতীয় বার একই প্রেসক্রিপশনে রোগী ওষুধ কিনতে চাইলে তা কোনোক্রমেই দেওয়া ঠিক হবে না।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব : অ্যান্টিবায়োটিক যেহেতু একটি অতি প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী, তাই যথাযথ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বও অনেক বেশি। ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রে নিয়ম মানা হচ্ছে কিনা, তা পর্যবেক্ষণ ও সার্বিক তত্ত্বাবধান করা উচিত। শিক্ষিত বা ট্রেনিংপ্রাপ্ত ফার্মাসিস্ট ছাড়া অন্য কেউ যেন ওষুধ বিক্রি না করে, তার যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অননুমোদিত ওষুধপত্র বিক্রি বন্ধ করা উচিত। আমাদের ভালোভাবে বেঁচে থাকতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন সুস্থভাবে সুস্বাস্থ্য নিয়ে গড়ে ওঠে, সে লক্ষ্যে অ্যান্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য ওষুধের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি অপব্যবহার, বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিকের রেজিস্ট্যান্স থেকে নিজেদের এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে এখনই পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, চিকিৎসার অভাবে মানুষের যেমন মৃত্যু হতে পারে, তেমনি অসংখ্য অ্যান্টিবায়োটিক থাকলেও যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে সবই অকার্যকর হওয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার এবং অকার্যকারিতা মোকাবিলার জন্য সম্মিলিত পদক্ষেপ ও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা না নিলে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবন সবকিছু বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর সঙ্গে জনসচেতনতা বাড়ানো খুবই জরুরি।