আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে শতকোটি টাকার ক্ষতি

শতকোটি টাকার ক্ষতিতে দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য। দেশের বাণিজ্যের গেটওয়ে বলে পরিচিত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৯৩ শতাংশ পণ্য আনা-নেওয়া করলেও গত দুদিন (শনি ও রবিবার) ধরে বন্ধ অপারেশনাল কার্যক্রম। আজ সোমবারও বন্ধ রাখার কর্মসূচি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতারা। চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটি বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালিত হয়ে আসছে। আর এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ থাকায় দেশের প্রায় শতকোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলে ব্যবসায়ী নেতাদের অভিমত।

ক্ষতির বিষয়টি বর্ণনা করতে গিয়ে বিশ্বের অন্যতম শিপিং লাইন এমএসসির হেড অব অপারেশনস আজমীর হোসাইন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের এমএসসি পোলো-২ নামের একটি জাহাজ জিসিবি বার্থে দাঁড়ানো রয়েছে। এ জাহাজ থেকে গত শনিবার পণ্য খালাস হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্যাং (শ্রমিক) না থাকায় কাজ করা যায়নি। আজও (রবিবার) শ্রমিকরা কাজ করছে না। আবার আগামীকাল (আজ) সোমবারও শ্রমিকরা কাজ না করার কর্মসূচি দিয়েছে। এক দিন বাড়তি থাকলে প্রতিটি জাহাজের ভাড়া বাবদ ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হয়। এর সঙ্গে জাহাজের তেল খরচ, নাবিকদের বেতন, জাহাজে থাকা কনটেইনারগুলোর বাড়তি মাশুল, ইয়ার্ড থেকে কনটেইনার ডেলিভারি না হলে ইয়ার্ডের স্টোর রেন্ট, আবার রপ্তানিমুখী যেসব কনটেইনার অফডকগুলোতে জমা রয়েছে, সেগুলোর ভাড়া সব মিলিয়ে বিশাল মিলিয়ন ডলারের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত করে ক্রাউন নেভিগেশন কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেডের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক সাহেদ ছরওয়ার বলেন, চলমান কর্মসূচির কারণে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি টাকার অঙ্কে বলে শেষ করা যাবে না। আমাদের একটি জাহাজ সিসিটি কনটেইনার টার্মিনাল থেকে গত শনিবার চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু চলমান এ কর্মসূচির কারণে ও কি গ্যান্ট্রিক্রেনের কারণে দুদিন বিলম্ব হলো। এতে আমাদের জাহাজের খরচ বাড়ার সঙ্গে এখানে থাকা আমদানি পণ্যগুলো যথাসময়ে আমদানিকারকের কাছে পৌঁছাবে না। এমনিভাবে অনেক ধরনের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে নিঃসন্দেহে।

এদিকে দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ হয়ে থাকে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সদস্যদের জন্য। এখন শ্রমিকদের শাটডাউন কর্মসূচির কারণে তাদের ক্ষতির বিষয়ে জানতে চাইলে বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট সেলিম রহমান বলেন, চলমান কর্মসূচি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অভ্যন্তরীণ ইস্যু হলেও এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিন্তু পোশাক মালিক সদস্যরা। আমাদের সদস্যদের আমদানিকৃত কাঁচামাল যথাসময়ে না পাওয়া এবং রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণ করতে না পারায় ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের সুনাম নষ্ট হচ্ছে। আমাদের প্রত্যাশা রইল বন্দর কর্তৃপক্ষ দ্রুত তাদের অভ্যন্তরীণ ইস্যুর সমাধান করে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখবে।

অন্যদিকে ২১টি বেসরকারি অফডক থেকে প্রতিদিন সাড়ে তিন হাজারের বেশি আমদানি এবং তিন হাজার রপ্তানি মিলিয়ে সাড়ে ছয় হাজার কনটেইনার বন্দরে আনা-নেওয়া করা হলেও ধর্মঘটের কারণে এখন তা মাত্র দেড় হাজারে নেমে এসেছে। এর ফলে বন্দরে যেমন কনটেইনারের জট সৃষ্টি হচ্ছে, তেমনি আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের স্তূপও জমছে অফডকগুলোতে। এ বিষয়ে অফডক মালিকদের সংগঠন বিকডার মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, প্রতিদিন সাড়ে ছয় হাজার আমদানি-রপ্তানিবাহী কনটেইনার পরিবাহিত হয় অফডকগুলোতে। কিন্তু গত দুদিন ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কম হয়েছে।

এদিকে দুবাইয়ের কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে চলমান কর্মবিরতি কর্মসূচি গতকালও অব্যাহত ছিল। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বন্দরের প্রশাসনিক ও অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধই ছিল। বন্দর ভবনে তেমন কোনো কাজের গতি দেখা যায়নি। বিভিন্ন কক্ষে কর্মরতরা উপস্থিত থাকলেও ফাইল ওয়ার্কের কাজ তেমন চোখে পড়েনি। আবার অনেক টেবিল ছিল ফাঁকা। নির্বাচনী দায়িত্বের কারণে অনেকে ট্রেনিংয়ে ছিলেন। এ কারণে টেবিল ফাঁকা ছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে চট্টগ্রাম বন্দরের কোনো ইয়ার্ডে কাজ হয়নি।

আরও ১২ জন নেতাকে ঢাকায় বদলি : চলমান আন্দোলন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়া জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চারজন নেতাকে গত শনিবার ঢাকার পানগাঁও টার্মিনালে বদলি করা হয়েছিল। গতকাল রবিবার প্রথম দফায় সাতজনকে ও দ্বিতীয় দফায় আরও পাঁচজনকে বদলি করা হয়েছে। যাদের বদলি করা হয়েছে তারা হলেনÑ পরিবহন বিভাগের উচ্চ বহিঃসহকারী মোহাম্মদ শফিউদ্দিন, আবদুুল্লাহ আল মামুন ও রাশিদুল ইসলাম; বিদ্যুৎ বিভাগের পেইন্টার হুমায়ুন কবির; যান্ত্রিক বিভাগের ড্রাইভার লিয়াকত আলী, আমিনুর রশিদ বুলবুল ও মানিক মিঝি; প্রশাসন বিভাগের উচ্চমান সহকারী শাকিল রায়হান; প্রকৌশল বিভাগের মেসন শামসু মিয়া; মাতারবাড়ী বন্দর প্রকল্পের স্টেনো টাইপিস্ট খন্দকার মাসুদুজ্জামান এবং যান্ত্রিক বিভাগের খালাসি মোহাম্মদ রাব্বানী। এসব বদলি করে আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের নেতা ও চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদ নেতা হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, আমাকেও বদলি করা হয়েছে কিন্তু আমি আজ (রবিবার) নির্বাচনের প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছি। এভাবে বিধিবহির্ভূতভাবে আমাদের বদলি করে আন্দোলন থেকে সরাতে পারবে না। আমরা এই এনসিটি টার্মিনালকে বিদেশিদের দেওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবই। যেভাবেই হোক আমরা এই বন্দরকে বিদেশিদের হাত থেকে রক্ষা করব।

এর আগে কর্মচারীদের বদলি বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক বলেন, রুটিন ওয়ার্ক হিসেবে তাদের নতুন কর্মস্থলে বদলি করা হয়েছে। এখন তারা বদলিকৃত স্থানে যোগদান করেছেন কি না, সেখান থেকে তথ্য নিয়ে আমরা চেক করে দেখব।

আজও কর্মবিরতির ঘোষণা : আন্দোলন কর্মসূচির নেতৃত্ব দেওয়া বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল নেতা ও চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদ নেতা ইব্রাহিম খোকন বলেন, আমাদের আন্দোলন শতভাগ সার্থক হয়েছে। যেহেতু প্রশাসন থেকে এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে এখনো কোনো আলোচনা করেনি, তাই আগামীকাল (আজ) সোমবারও সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কর্মবিরতি কার্যক্রম চলমান থাকবে। এ সময়ের মধ্যে বন্দরের জেটিতে যেমন কোনো কাজ হবে না, তেমনিভাবে প্রশাসনিক কাজও হবে না।

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমাদের কর্মীদের বদলি করা হচ্ছে। যতই ব্যবস্থা নেওয়া হোক না কেন, আমরা আমাদের আন্দোলন কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়াব না।

বন্দর কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে : এদিকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক বন্দর ভবনের সামনে সংবাদকর্মীদের বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। বিকেল ৪টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত সময়ে বাড়তি কাজ করে আমরা বন্দরের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তির বিষয়ে অগ্রগতি কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, এগুলোর সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বিষয়। আর চুক্তির বিষয়টি পিপিপি কর্তৃপক্ষ দেখছে। সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে যে নির্দেশনা আসবে, আমরা সেই অনুযায়ী কাজ করব।

৫৯ হাজার ধারণক্ষমতার চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে ৩২ হাজার ১০০ টিইইউএস কনটেইনার রয়েছে। আর পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে ৯৭টি। এ বন্দর দিয়েই দেশের ৯৩ শতাংশ পণ্য পরিবাহিত হয়ে থাকে। এ বন্দরের সবচেয়ে লাভজনক টার্মিনাল হলো এনসিটি কনটেইনার টার্মিনাল। ২০০৭ সালে ৫৭০ কোটি টাকা খরচ করে ১ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যরে এই নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের (এনসিটি) চারটি বার্থ নির্মাণ করা হয়েছিল। বন্দরের ১৮টি অত্যাধুনিক কি গ্যান্ট্রি ক্রেনের মধ্যে ১৪টিই স্থাপন করা হয়েছে এখানে। একযোগে চারটি জাহাজ ভেড়ার সক্ষমতাসম্পন্ন এ টার্মিনালে রয়েছে একাধিক রাবার টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেনও। চট্টগ্রাম বন্দরের মোট অপারেশনাল কার্যক্রমের প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ এ টার্মিনালে হয়ে থাকে। লাভজনক এই রেডিমেড টার্মিনালটি বিদেশিদের বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে আন্দোলনকারীদের আপত্তি। তাদের মতে, পতেঙ্গার লালদিয়ায় টার্মিনাল নির্মাণের জন্য বিশ^খ্যাত এপি মুলারের সঙ্গে সরকার ৪৫ বছরের চুক্তি করলেও আমাদের আপত্তি ছিল না। একইভাবে বে টার্মিনালের তিনটি টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দিলেও কোনো বিরোধিতা করা হয়নি। কিন্তু একটি চালু টার্মিনাল যেখানে বন্দরের নিজস্ব ইকুইপমেন্ট ও জনবল রয়েছে, সেই টার্মিনাল কেন বিদেশিদের পরিচালনার জন্য ইজারা দেওয়া হবে? এর আগে ইকুাইপমেন্ট ছাড়া সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়েকে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল দেওয়া হয়েছে পরিচালনার জন্য। এদিকে এনসিটি টার্মিনাল নিয়ে উচ্চ আদালত থেকে বিদেশি অপারেটরের সঙ্গে চুক্তির প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নে করা রিট খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। গত বৃহস্পতিবার বিচারপতি জাফর আহমেদের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেয়। রিটের বিষয়ে দেড় মাসেরও বেশি সময় আগে হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিভক্ত রায় দিয়েছিল। বৃহস্পতিবারের রায়ের মাধ্যমে হাইকোর্টে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে রিট ও রুল খারিজের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এতে বিদেশিদের (ডিপি ওয়ার্ল্ড) বরাদ্দ দিতে কোনো আইনগত সমস্যা নেই। আর এরপর থেকেই আন্দোলনের ঘোষণা দেয় বন্দরের জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল। এ টার্মিনালটি পরিচালনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে দুবাইয়ের ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার কথা।