ঢাকায় টার্গেটেড আসনে ফল পাল্টে দেওয়া হতে পারে

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ৮ দিন বাকি। শেষ সময়ে এসে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৮ আসনে দলটির প্রার্থী মির্জা আব্বাস বিষয়টি প্রথমে সামনে এনেছিলেন। জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, ‘একটি দল ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ষড়যন্ত্র করছে। এর সঙ্গে সরকারের একটি অংশও জড়িত। এতে ঢাকার টার্গেটেড আসনের ফলও পাল্টে যেতে পারে।’ এ বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার পরামর্শ দেন তিনি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নির্বাচনের সময় হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিএনপির স্থায়ী স্থায়ী কমিটির এই সদস্য। দেশ রূপান্তরকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।

ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কার বিষয়ে জানতে চাইলে মির্জা আব্বাস বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে নানা ধরনের ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ইতিমধ্যে পোস্টাল ব্যালট নিয়ে ষড়যন্ত্র হয়েছে। বিএনপির প্রতীক এমন জায়গায় রেখেছে, যা সহজে দৃশ্যমান ছিল না। নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, ফল ঘোষণায় দেরি হবে। এতে এর আগে ষড়যন্ত্রের যে আভাস দিয়েছি, তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। কেন্দ্রে ভোট গুনতে এবং ফল ঘোষণা করতে দেরি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কী মনে করে ইসি ফল ঘোষণায় দেরির কথা জানিয়েছেন, তা বোধগম্য নয়।

কী ধরনের ষড়যন্ত্র হতে পারে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, বোরকা পরে ভুয়া ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে পাঠাতে পারে একটি দল। ভোটের দিন পোলিং এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখানো হতে পারে। জাল ভোট দেওয়া হতে পারে। কারণ একটি দলের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের লোকজন প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে থাকবেন ভোটকেন্দ্রে। ভোটগ্রহণ শেষে ভোট গণনার ফল কেন্দ্রে ঘোষণা করতে নাও পারে। তিনি বলেন, কিছু আসনের প্রার্থী পাস করাতে ভোটার মাইগ্রেট করানো হয়েছে। ইতিমধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী আসন ঢাকা-১৭-তে একটি দলের প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছেন ঢাকায় বিএনপিকে ছাড় দেওয়া হবে না। ঢাকার টার্গেটেড কিছু আসনে ভোট জালিয়াতি করে ফল পাল্টে দেওয়া হতে পারে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এর আগে এমনটা হয়েছে। এ কারণে আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছেন। তাহাজ্জুদ নামাজ শেষে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ফজরের নামাজ পড়ে লাইনে দাঁড়াতে বলেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি বলেছেন, ভোট দেওয়ার পর ফল নিয়ে ঘরে ফিরতে হবে। নিশ্চয়ই তার কাছে নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্রের তথ্য রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির খবর আমরা পাচ্ছি। এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। সরকারকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি অনুরোধ থাকবে, তারা যেন এ বিষয়ে যথেষ্ট নজর দেন। প্রশাসনের বিষয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে যারা প্রশাসনে ছিলেন, তারা এখনো রয়ে গেছেন। সরকারের ভেতরে ও বাইরের একটা অংশ পক্ষপাতিত্ব করছে। এদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। সরকারের প্রতিও অনুরোধ থাকবে, এদের কর্মকা- যেন মনিটরিং করা হয়।’

গত ২৫ জানুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নির্বাচনের সময় ১০টি জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, এই নির্দেশনা পালন করতে হবে ১০ থেকে ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। হাসপাতালগুলো প্রস্তুত থাকারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, এর আগে কোনো সংসদ নির্বাচনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এমন নির্দেশনা দিয়েছে বলে মনে পড়ছে না। তারা কী কারণে এমনটা বলেছে, সরকারের উচিত দৃষ্টি দেওয়া। তাদের কাছে কোনো তথ্য থাকলে তদন্ত করা প্রয়োজন।

বিএনপির এই প্রার্থী অভিযোগ করে বলেন, ‘ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী প্রয়াত শরিফ ওসমান হাদিকে গুলির ঘটনায় একটি অংশ আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছিল। এতে একটি রাজনৈতিক দল ইন্ধন দিয়েছে। এখন তারাই এমন একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, যিনি সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমার নাম নেন।’

নির্বাচনী মাঠে নতুনদের স্বাগত জানিয়ে মির্জা আব্বাস বলেন, ‘আশা করব, তারা আইন মেনে কাউকে ব্যক্তি আঘাত করে যাতে কথা না বলে। মানুষ সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে, আল্লাহর নাম নেয়। আমার এখানে এমন একজন প্রার্থী আছেন যিনি প্রথমেই আমার নাম নেন। অতীতে আমি এর চেয়ে অনেক শক্ত ও কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে নির্বাচন করেছি। কিন্তু আমরা একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার করিনি। আমি বিশ্বাস করি, জনগণ সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। নির্বাচন কেন্দ্র করে যে উচ্ছ্বাস ও আবেগ সৃষ্টি হয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি তার প্রতিফলন ঘটবে।’

সারা দেশে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এসব আসনে দল সমর্থিত প্রার্থীরা ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই সংকট মোকাবিলায় বিএনপি কী করবে, জানতে চাইলে মির্জা আব্বাস বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থীরা থাকলে কিছু ঝামেলা থাকবে, যা ইতিমধ্যে দেখা গেছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা এ বিষয়ে কাজ করছেন।

ভোটে বিজয়ী হলে বিএনপি তরুদের জন্য কী করবে জানতে চাইলে মির্জা আব্বাস বলেন, তরুণ ভোটাররা দীর্ঘদিন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। এবার তারা সুযোগ পাবে। নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হলে বেকার সমস্যার সমাধান এবং যুবকদের উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরির জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে। তরুণদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি যুবসমাজকে খেলাধুলার দিকে নিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হবে।