একটি গুপ্ত দল নতুন জালেম হিসেবে আবির্র্ভূত হয়েছে : তারেক রহমান

জামায়াতে ইসলামীকে গুপ্ত সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘৫ আগস্ট পরবর্তী একটি গুপ্ত দল নতুন জালেম হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। তারা দেশের নারীদের ঘরবন্দি করতে চায়। তাদের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’

গতকাল বুধবার দুপুরে বরিশাল বেলস পার্কে মহানগর বিএনপি আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি এ কথা বলেন। সভায় ভুয়া ব্যালট পেপার ছাপানো ও সিল তৈরির যে সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে সে বিষয়ে জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনাদের সতর্ক থাকতে হবে যাতে করে ১২ তারিখে আপনার অধিকার অন্য কেউ হাইজ্যাক করে নিয়ে যেতে না পারে।’

আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের উত্তর থেকে দক্ষিণ, পূর্ব থেকে পশ্চিম সর্বত্র ছুটে বেড়াচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জেলায় জেলায় জনসভায় ৩১ দফার আলোকে দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। কর্মসংস্থান, বেকার ভাতা, ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ডসহ প্রাধান্য পাচ্ছেন নারী ও তরুণরা। সেই ধারাবাহিকতায় গতকাল তিনি বরিশালের পাশাপাশি ফরিদপুরে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায়ও বক্তব্য দেন। 

২০০৫ সালের পর গতকাল বেলা ১২টায় তারেক রহমান ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারে করে বরিশাল স্টেডিয়ামে নামেন। এরপর গাড়িবহর নিয়ে বেলস পার্কে পৌঁছান। দুপুর ১টা ৮মিনিটে বরিশালবাসীকে সালাম দিয়ে বক্তব্য শুরু করেন তিনি। বক্তব্যের শুরুতেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘মঞ্চের সামনে বসে থাকা এই মানুষগুলো তাদের স্বজনদের হারিয়েছে। তারা জীবন দিয়েছে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য। বিগত ১৬ বছরে কেড়ে নেওয়া অধিকার ফিরিয়ে আনতে গিয়ে এই মানুষগুলো হত্যার শিকার হয়েছে, গুমের শিকার হয়েছে।’

এ সময় তারেক রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘বাংলাদেশে নতুন জালেমের আবির্ভাব হয়েছে এবং তারা দেশের মা-বোনদের সম্পর্কে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ও কলঙ্কিত মন্তব্য করেছে। যেই ব্যক্তি বা যেই দল দেশের মা-বোনদের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা রাখে না, তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশ কখনো অগ্রগতি আশা করতে পারে না। অথচ বাংলাদেশে আবহমান কাল ধরে নারী-পুরুষ মাঠে কাজ করে। শুধু মাঠে নয়, বিভিন্ন কলকারখানায়ও পুরুষের পাশাপাশি মা-বোনেরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। আমাদের যে গার্মেন্টস শিল্প সারা বিশ্বে সুনাম কুড়াচ্ছে, সেই গার্মেন্টস শিল্পে মা-বোনেরা কাজ করছে।’

‘১২ তারিখ পর্যন্ত আপনারা জনগণের পা ধরবেন। তারপরে বাকি পরবর্তী পাঁচ বছর জনগণ আপনাদের পা ধরবে।’ কুমিল্লায় এক দলীয় সমাবেশে কর্মীদের উদ্দেশ্যে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মাদ তাহেরের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘চিন্তা করুন এই কথা থেকে প্রমাণিত হয়, কী তাদের মেন্টালিটি কোন পর্যায়ের মানুষ হলে তারা জনগণকে নিয়ে এ রকম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কথা বলতে পারে। এইসব লোক যদি নির্বাচিত হয়, এইসব লোক যদি দায়িত্ব পায় তাহলে আজই আমাদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে যে জনগণের ভাগ্যের কী অবস্থা হবে, দেশের মানুষের ভাগ্যের কি দুর্বিষহ অবস্থা হবে যাদের মনে এই কথা মনের কথাই বেরিয়ে এসেছে তাদের বাস্তবে।’

এ সময় গুপ্তদের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘যারা দেশের মানুষকে সম্মান করতে জানে না, যারা পরিকল্পনা করে রাখে যে, ১২ তারিখের পর থেকে তারা জনগণকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরাবে তাদের উচিত শিক্ষা আপনাদের দিতে হবে।’

১৩ কোটি ভোটারকে কেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘এখন এই বাংলাদেশ জনগণের বাংলাদেশ। আগামী ১২ তারিখ আপনাদের পছন্দমতো প্রতিনিধি নির্বাচন করুন, যারা জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে।’

ভুয়া ব্যালেট পেপার, সিল ছাপানোর খবর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘যারা নতুন জালেম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে তাদের লোকজন বিভিন্ন জায়গায় ভুয়া সিল তৈরি করছে বলে আমরা বিভিন্নভাবে শুনতে পাচ্ছি। তাদের পরিচিত যেসব প্রেস আছে সেখানে তারা ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে যেটি তারা ভোটের দিন পকেটে করে নিয়ে যাবে। শুধু তাই নয় আমরা এর মধ্যে বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, বিশেষ করে নিরীহ মা-বোন যারা আছেন তাদের কাছে গিয়ে তারা এনআইডি নাম্বার নিচ্ছে, তাদের কাছে গিয়ে তারা বিকাশ নাম্বার নিচ্ছে। এই গুপ্তের দল এই জালেমের দল বলে তারা নাকি সৎ মানুষের শাসন কায়েম করবে। প্রথমেই তো আপনারা অনৈতিক কাজ শুরু করছেন। অনৈতিক কাজ দিয়ে আপনারা মানুষের ভোটকে প্রভাবিত করতে চাচ্ছেন। যাদের ভোটের শুরুটাই অনৈতিক কাজ দিয়ে তারা কী করে সৎ মানুষের শাসন দিতে পারে।’

এ সময় কেউ যাতে ভোট হাইজ্যাক করতে না পারে সর্তক থাকার জন্য উপস্থিত জনতার প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘যাতে ১২ তারিখে আপনার অধিকার অন্য কেউ হাইজ্যাক করে নিয়ে যেতে না পারে সে জন্য সজাগ থাকতে হবে।’

বরিশালের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘১৯৯৩ সালে বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বরিশালকে বিভাগ ঘোষণার করেছিলেন। ১৯৭৮ সালে পল্লী বিদ্যুতের লাইন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান চালু করেছিলেন। কিন্তু আরও বহু কাজ করা বাকি। যেমন বরিশাল-ভোলা ব্রিজ, বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ উন্নত করা, ভোলায় মেডিকেল কলেজের কাজে আমাদের হাত দিতে হবে। নদীভাঙন সমস্যা মোকাবিলায় বিশাল এলাকাকে আমাদের বেড়িবাঁধ দিতে হবে।’

এ সময় বরিশালে মৎস্যচাষিদের জন্য হিমাগার নির্মাণসহ বিএনপির ঘোষিত ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি কার্ড, বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্যসেবা, খাল খনন প্রভৃতি কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তারেক রহমান।

বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুকের সভাপতিত্বে ও সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদারের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরওয়ার, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাড. জয়নুল আবেদিন, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বিজিপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন, ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, রাজিব আহসান, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন, নগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়া উদ্দিন সিকদার, জেলা দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব আবুল কালাম শাহিন প্রমুখ।

এদিকে ফরিদপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ফরিদপুরে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান নির্বাচনে জনগণের রায় পেলে ফরিদপুর বিভাগ বাস্তবায়নসহ এলাকার কৃষি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। কৃষিপ্রধান এলাকা ফরিদপুর নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ফরিদপুরবাসীর যদি সমস্যার সমাধান হয়, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে ফরিদপুরকে বিভাগ করা হবে। এছাড়া বৃহত্তর ফরিদপুর কৃষিপ্রধান এলাকা। পাটশিল্প এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান খাত। ক্ষমতায় গেলে এই পাট রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে বিএনপির।’

আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনার প্রয়োগে ফরিদপুরের উন্নয়নের পরিকল্পনা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘ফরিদপুর অঞ্চল ঘিরে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ করতে চাই। যেন শুষ্ক মৌসুমে পানি সমস্যার সমাধান হয়। জনগণের সমর্থন ছাড়া কোনো বড় কাজ সম্ভব নয়। জনগণের সমর্থন থাকলে যে কোনো বড় কাজ করতে সক্ষম হবে বিএনপি।’

স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘কৃষি এবং শিল্প উভয় খাত গড়ে তুলতে চাই, যেন স্থানীয় মানুষ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে আত্মসম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারেন।’

এর আগে নির্বাচনী জনসভায় তারেক রহমান উপস্থিত হয়ে বৃহত্তর ফরিদপুরের পাঁচটি জেলার ১৫ জন ধানের শীষের প্রার্থীকে উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেন, ‘উন্নয়নের যে রূপরেখা আমাদের রয়েছে তার অংশীদারী হতে হলে অবশ্যই ধানের শীষের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে হবে। তবে যে উন্নয়ন আশা করছেন তার প্রতিফলন ঘটবে।’

এর আগে তারেক রহমানের আগমনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের জেলা থেকে হাজারো নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঢল নামে নির্বাচনী সভায়। এ সময় মাঠ ও আশপাশের এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

ভাষণে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভাবনা তুলে ধরে ‘তারেক রহমান’ বলেন, ‘কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থানে সঠিক নীতি ও সুশাসন থাকলে এই অঞ্চল দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হতে পারে।’ তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরাই আগামীর বাংলাদেশ অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াও।’

সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোদাররেছ আলী ঈসা। বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ ইসলাম, ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুকুর রহমান মাসুক, ফরিদপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ সেলিমুজ্জামান সেলিম, রাজবাড়ী জেলার আলী নেওয়াজ মোহাম্মদ খৈয়াম, মাদারীপুর জেলার নুরুদ্দিন অপু, গোপালগঞ্জ জেলার এসএম জিলানীসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের ৫ জেলার ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থীরা এবং পাঁচ জেলার বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। 

বিশাল এ নির্বাচনী জনসভা পরিচালনা করেন জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এ কে এম কিবরিয়া স্বপন ও যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ জুলফিকার হোসেন জুয়েল।

সভা শেষে তারেক রহমান হেলিকপ্টারে করে ৫টা ১৫মিনিটে গুলশানের নিজ বাসভবনে পৌঁছান।