সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের সময় পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও নাগরিকবান্ধব আচরণের মাধ্যমে দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীতে জাতীয় স্টেডিয়াম, গুলিস্তানে অবস্থিত সেনাক্যাম্প পরিদর্শন ও অসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি এ গুরুত্বারোপ করেন। এ ছাড়া, তিনি বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য মোতায়েনকৃত সেনাসদস্যদের কার্যক্রম সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করেন ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। আইএসপিআর সেনাপ্রধানের সফরের ছবি যুক্ত করে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এ কথা জানায়।
সফরকালে সেনাপ্রধান জাতীয় স্টেডিয়ামের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সভায় ঊর্ধ্বতন সামরিক, বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসন এবং বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে আসন্ন নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়।
সেনাসদরের ব্রিফিং : নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে সেনাবাহিনী অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করতে পারে, তবে তা হবে সম্পূর্ণভাবে নির্ধারিত ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ অনুসরণ করে। সরকার, নির্বাচন কমিশন, অসামরিক প্রশাসন এবং সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা যা করণীয়, তা করতে বদ্ধপরিকর। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে গিয়ে আইন অনুযায়ী যে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তার জন্য সশস্ত্র বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত আছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তানে রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ারের’ আওতায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কিত বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন সেনাসদরের সামরিক অপারেশনস পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন।
নির্বাচনী কেন্দ্রগুলোর অবস্থা বিবেচনায় যদি অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয়, সে ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর রুলস অব এনগেজমেন্টটা কী হবে? বিজিবি বলেছে, তারা কোনো অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করবে না। এ ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী কী করবে? এ বিষয়ে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, সেনাবাহিনীর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে এনগেজমেন্ট বলে দেওয়া আছে। আমরা আইনের আওতায় থেকে সেই রুলস অব এনগেজমেন্ট অনুসরণ করে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করে থাকি। যদি সত্যি সত্যি কোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের প্রয়োজন হয়, তাহলে রুলস অব এনগেজমেন্টে যে ক্রমান্বয়ে বলপ্রয়োগের মাত্রা বৃদ্ধির একটা প্রক্রিয়া আছে, তা অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভোটের দিন, আগে বা পরে মব হলে সেনাবাহিনীর কী ভূমিকা থাকবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইতিপূর্বে দেখেছি বেশ কয়েকটি হামলার ঘটনা ঘটেছে, মবের ইনসিডেন্ট দেখেছি। সরকার, নির্বাচন কমিশন, অসামরিক প্রশাসন এবং সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী একটি অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য যা যা করণীয়, তা করতে বদ্ধপরিকর। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন করতে গিয়ে যা করণীয়, আইন অনুযায়ী যে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনী সর্বদা প্রস্তুত আছে।
নির্বাচনে একটি বড় রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ (কার্যক্রম) হওয়ার কারণে বা কার্যক্রম না থাকায় নির্বাচন থেকে বাইরে আছে এবং এই দলের অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে আছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বা ভার্চুয়াল জগতে দেখা যাচ্ছে, দলটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক থ্রেট বা হুমকি দিচ্ছে ভোটকেন্দ্রে না যেতে এ বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিষয়গুলোতে আলোচনায় যাব না। যেকোনো ধরনের সহিংসতা বা নাশকতা প্রতিরোধে যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীও সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
নির্বাচন মাত্র এক সপ্তাহের কম সময় আছে, সেখানে এখনো মানুষের মধ্যে একটা সংশয় রয়ে গেছে আসলে নির্বাচন কীভাবে হবে এ বিষয়ে তিনি বলেন, সংশয় দূর করার জন্যই সেনাপ্রধান সব বিভাগে ব্যক্তিগতভাবে গেছেন এবং নির্বাচনসংশ্লিষ্ট অসামরিক প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যারা এ নির্বাচনের সঙ্গে নিয়োজিত থাকবেন তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। দুটি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি গেছেন। তার মধ্যে একটি হচ্ছে তাদের আস্থা দিতে যেকোনো সহায়তা দিতে সেনাবাহিনী প্রস্তুত। দ্বিতীয়টি হচ্ছে জনগণকে আস্থা দেওয়া এবং ওই বার্তাটা সুস্পষ্টভাবে দেওয়া সমন্বিতভাবে একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দেবে।
নির্বাচন কেন্দ্র করে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম সবসময় একটি সেনসিটিভ জায়গা। শুধুই বর্তমানে নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়, নির্বাচনের পূর্বাপর সময়েও সেখানে আমাদের সেনা মোতায়েন সার্বক্ষণিক থাকে। এগুলো আমাদের অ্যাসেসমেন্টের মধ্যে নিয়েছি। অন্য এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে সাধারণ মানুষ যেন নির্ভয়ে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে আসতে পারে, সেজন্য আমাদের নিয়মিত টহল জারি থাকবে। এবার উপজেলাভিত্তিক এবং ক্ষেত্রবিশেষে কেন্দ্রভিত্তিক ক্যাম্প স্থাপন করেছি, যেন বিপুলসংখ্যক প্যাট্রোল একসঙ্গে বাইরে থাকতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মনে আস্থার জায়গাটা হয়। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা বন্ধে সর্বাত্মক আমাদের প্রস্তুতি আছে আমাদের।
নির্বাচনকালে সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকা অবস্থায় ভোটের আস্থা যদি ক্ষুণœ হয় এবং নির্বাচন-পরবর্তী ফলাফল নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠে তবে সেনাবাহিনী মাঠে গণতান্ত্রিকভাবে নিরপেক্ষ ছিল, এটি কীভাবে প্রমাণ করবে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল বাহিনী এবং দেশমাতৃকার সেবায় নিয়োজিত। সেনাপ্রধান পরিষ্কারভাবে একটি কথা বলে দিয়েছেন, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করব। দেশের সাধারণ মানুষ যেন নির্বিঘেœ ও নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে এবং তার ভোটটা সে দিতে পারে, এটা নিশ্চিত করা হবে আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। আর দায়িত্ব পালনকালে আমরা যদি আমাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারি তাহলে আপনাদের (সাংবাদিক) মাধ্যমে জনগণ আমাদের নিরপেক্ষতার প্রমাণ আলাদা করে পেয়ে যাবে।
একটি রাজনৈতিক দলের দুজন শীর্ষ নেতার অ্যাকাউন্ট (সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট) হ্যাকের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব প্রয়োজনে আমরা যেন এ আক্রমণের শিকার না হই সে প্রস্তুতি নিয়েছি। এর বাইরে প্রত্যেকের যার যার জায়গা থেকে এ প্রস্তুতি তাকে নিতে হবে। আশ্বস্ত করতে পারি, সেনাবাহিনী তার যেসব আইটি সাইট আছে সেগুলো যেন হ্যাক না হয় সেই বিষয়ে যতটুকু প্রস্তুতি নেওয়ার সেই প্রস্তুতি নিয়েছি এবং নিচ্ছি। নির্বাচনের আগে এবং নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে আপনাদের নিজস্ব কোনো থ্রেট অ্যানালাইসিস রয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট অবশ্যই একটি সেনাবাহিনী তার কর্মপন্থায় প্রথম কাজ যেটা করে তা হচ্ছে থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট। আমরা অবশ্যই এটা একটা থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট করেছি এবং সে অনুযায়ী আমাদের মোতায়েন পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমরা নন-লিথাল ওয়েপন এবং রায়ট কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট দিয়ে আমাদের বাহিনীকে ইকুইপ করেছি। নির্বাচনকেন্দ্রিক কথা যদি বলি আমরা নির্বাচন সামনে রেখে আরও বেশ কিছু রায়ট কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট সেনাসদস্যদের জন্য নিয়ে এসেছি।