বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘রাজনৈতিক নেতৃত্বে যদি সততা ও সদিচ্ছা থাকে, তাহলে একটা সমাজ পাল্টাতে সময় লাগে না। কিন্তু যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বে অসৎ হয় এবং সদিচ্ছার অভাব হয়, এই সমাজের দুর্গতি দিনের পর দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। সদিচ্ছার অভাবেই আমাদের দুই স্বাধীনতার পরেও জনগণের আকাক্সক্ষা পূরণ হয়নি।’
গতকাল শুক্রবার বিকেলে নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জেলা জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।
জামায়াত আমির এদিন ফরিদপুর, বরিশাল, পিরোজপুর, পটুয়াখালী ও ঝালকাঠিতে নির্বাচনী সমাবেশ করেন। এসব সমাবেশে নিজেদের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি ভোটের মাঠের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলেরও সমালোচনা করেন।
নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের সমাবেশে জামায়াত আমির বলেন, ‘সবার জন্য নিরাপদ ও গর্বের বাংলাদেশ গড়তে চাই। আমরা শুধু জামায়াত বা দাঁড়িপাল্লার বিজয় নয়, ১৮ কোটি মানুষের বিজয় দেখতে চাই। রাজনীতিকে যারা ব্যবসার পণ্য করে তারা কখনো দেশকে গড়ে তুলতে পারবে না। আর পুরনো রাজনীতিতে ফিরে যেতে চাই না। পরিবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে পাল্টে দিতে চাই। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই।’
তিনি বলেন, “এই বাংলাদেশ এখন স্বস্তির নিঃশ্বাস চায় আর পুরনো রাজনীতিতে ফিরে যেতে চায় না। এ পুরনো রাজনীতি বাংলাদেশকে এগোতে দেয়নি। পায়ে জিঞ্জির দিয়ে আটকে রেখেছে। সামনে দৌড়ানোর সুযোগ দেয়নি। আমরা সেই বাংলাদেশকে আল্লাহর ওপর ভরসা করে পাল্টে দিতে চাই। আমরা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সরকার গড়তে চাই না, আমরা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বিজয়ও চাই না, আমরা ১৮ কোটি মানুষের বিজয় চাই। আপনারা ইনসাফের প্রতীক দাঁড়িপাল্লার পক্ষে থাকবেন। ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এবং জামায়াতের ইসলামীসহ ১১-দলীয় প্রার্থীদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবেন। দাঁড়িপাল্লার বিজয়ে মর্যাদার সঙ্গে বোনেরা-মায়েরা ঘরে, চলাচলে, কর্মস্থলে, সব জায়গায় নিরাপদ থাকবেন। অন্যায়কারী যিনি হোন না কেন, তাকে আইনের আওতায় শাস্তি পেতে হবে।”
নড়াইলের উন্নয়নে তিনি ন্যায্য দাবি-দাওয়ার প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করেন। বক্তব্য শেষে জামায়াতের আমির নড়াইল-১ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা মো. ওবায়দুল্লাহ কায়সার ও নড়াইল-২ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী জেলা জামায়াতের আমির মো. আতাউর রহমান বাচ্চুর হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন। এ সময় জেলা নেতারা প্রধান অতিথিকে একটি দাঁড়িপাল্লা উপহার দেন।
এদিকে জামায়াতের জনসভা উপলক্ষে সকাল থেকেই জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীরা নড়াইল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আসতে শুরু করেন। নেতাকর্মীরা শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করেন সমাবেশস্থলেই। বিকেল সাড়ে ৩টায় জামায়াত আমিরের জনসভায় উপস্থিত হওয়ার কথা থাকলেও বরিশাল এলাকায় একাধিক জনসভা করে ফিরতে কিছুটা বিলম্ব হয়। নেতাকর্মীরা আসরের নামাজও মাঠে আদায় করেন। এর কিছুক্ষণ পর জামায়াত আমির হেলিকপ্টারযোগে নড়াইলের বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্টেডিয়ামে অবতরণ করেন।
ফরিদপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল রাত সাড়ে ৮টায় ফরিদপুরের ঐতিহাসিক রাজেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে জেলা জামায়াতের আয়োজনে বিশাল এক নির্বাচনী জনসভায় জামায়াত আমির প্রধান অতিথির বক্তৃতা দেন। সেখানে ডা. শফিকুর বলেন, আমাদের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে গোটা দেশকে শিল্পাঞ্চলে পরিণত করা। যারা টাকা লুট করে নিয়ে গেছে, তাদের টাকা পেটের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে বের করে আনা হবে। সেই টাকা আনার পর কোনো নেতা-নেত্রীর পকেটে যাবে না। সেই টাকা দিয়ে আমরা উন্নয়নের কাজ করব।’
তিনি বলেন, ‘ইনসাফের ভিত্তিতে কাজ করা হবে। আমি ফরিদপুরবাসীকে কথা দিয়ে যেতে চাই, যদি আপনারা আমাদের ক্ষমতায় আসার সুযোগ দেন, তাহলে আমরা আপনাদের জন্য সবসময় কাজ করব। আপনাদের যেসব সমস্যা রয়েছে, তা সমাধানের চেষ্টা করব। তিনি বলেন, যারা আমাদের কষ্ট দেয়, তাদের আমরা মাফ করে দিয়েছি। আমাদের ওপর যারা অতীতে জুলুম করেছে, তাদের ওপর আমরা কোনো প্রতিশোধ নেব না। আমাদের নেতাদের বিরুদ্ধে যারা মিথ্যা মামলা দিয়েছে, যারা মিথ্যা মামলা দিয়ে নেতাকর্মীদের হয়রানি করেছে, তাদের প্রতি আমরা একটি ঢিলও ছুড়িনি। আমরা আল্লাহর দরবারে বিচার দিয়ে রেখেছি। আমরা স্পষ্ট করে বলছি, কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করলে তাদের কাউকে ছাড়া হবে না। যারা আমাদের এক হাজার কর্মীকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দিয়েছে, তাদের আমরা ক্ষমা করে দিয়েছি।’
এ সময় জামায়াত আমির ১১ দলের জোট প্রার্থীদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা আমাদের প্রার্থীদের ভোট দেন, আমাদের প্রার্থীরা আপনাদের পাশে থাকবে। এ দেশে আর কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেওয়া হবে না। আমরা কোনো দলীয় রাজনীতি করতে চাই না। আমি জামায়াতকে ক্ষমতায় চাই না। আমি চাই ১৮ কোটি মানুষকে ক্ষমতায় দেখতে চাই। আমাদের যারা গুপ্ত-সুপ্ত বলে তাদের কথার কোনো জবাব আমরা দিতে চাই না। যারা এসব কথা বলে তাদের মাপ করে দিয়েছি। কারণ আমরা বস্তাপচা রাজনীতি করতে চাই না।’ ডা. শফিকুর রহমান এ সময় ফরিদপুরের চারটি সংসদীয় আসনের দলীয় ও জোটপ্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন।
জনসভায় ফরিদপুর জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা বদরউদ্দিনের সভাপতিত্বে এ সময় জেলা নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সন্ধ্যায় ফরিদপুরের বোয়ালমারী স্টেডিয়ামে বিশাল সমাবেশে বক্তৃতা করেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করার আহ্বান জানান।
বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার পাতারহাট আর সি কলেজ মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনায় একক নেতৃত্ব কার্যকর হয়নি। শেখ মুজিবুর রহমান তার সব যোগ্যতা দিয়ে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু একা একজন মানুষের পক্ষে একটি রাষ্ট্র চালানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন ছিল দক্ষ, দায়িত্বশীল ও নৈতিক সহযোগীদের। সেই সহযোগিতা না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি নিজেও আক্ষেপ প্রকাশ করে গেছেন।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৪৭ সালে এই ভূখণ্ড পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পরবর্তী ২৩ বছর পূর্ব পাকিস্তান অখণ্ড পাকিস্তানের অংশ ছিল। কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যকার চরম বৈষম্য ও রাজনৈতিক বঞ্চনার বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে। সেই নির্বাচনের রায় অনুযায়ী স্বাভাবিক ক্ষমতা হস্তান্তর না হওয়ায় একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। যার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।