শুধু অসৎ নেতৃত্বের কারণে দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এ দেশ সবুজ ছায়ায় ঘেরা, উর্বর একটি দেশ। এ দেশে প্রচুর সম্পদ আছে। তবুও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না, কেন? শুধু অসৎ নেতৃত্বের কারণেই এ দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না।’
গতকাল শনিবার সিলেট, হবিগঞ্জ ও কুলাউড়ায় পৃথক তিনটি জনসভায় বক্তৃতাকালে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াত আমির বলেন, প্রবাসে কাজ করতে গিয়ে কেউ মারা গেলে তার লাশ দেশে আনাসহ পরিবারের দায়িত্ব সরকার নেবে। দেশে চুরি ও চাঁদাবাজি বন্ধ হলে এ দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা সম্ভব হবে। সমাবেশগুলোতে তিনি ‘হ্যাঁ’ প্রতীকের পক্ষে ভোট চান। এ ছাড়া দাঁড়িপাল্লাকে ন্যায়বিচারের প্রতীক উল্লেখ করে ইনসাফ কায়েমের জন্য ১১ দলের যেখানে যে প্রতীক আছে, সেটাতেই ভোট চান। তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রার্থীদের হাতে দল ও জোটের প্রতীক তুলে দেন।
জামায়াত আমির বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে কমপক্ষে ২৮ লাখ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে। এ টাকাগুলো কার? এ টাকা ১৮ কোটি মানুষের। রাস্তায় যিনি ভিক্ষা করেন, এ টাকার অংশ তারও আছে। আজকের জন্ম নেওয়া শিশুরও অংশ আছে। রাষ্ট্রের আয়ের তিনটি খাত ট্যাক্স, বিদেশি অনুদান ও বিদেশি সাহায্য। এ তিনটি মিলে রাষ্ট্রের তহবিল গঠিত হয়। এ তিনটিতে সব মানুষ অংশীদার। তারা জনগণের টাকা চুরি করে বড়লোক হয়েছে। পরিবারসহ টাকা বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যারা নির্বাচিত হবেন, তারা প্রতিবছর একবার আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে বাধ্য হবেন। শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধি নয়, তাদের পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের আয়-ব্যয়ের হিসাবও দিতে হবে।
জামায়াত আমির বলেন, রাজধানীর কিছু জায়গায় ভিক্ষুকরা ভিক্ষা করতে বসে চাঁদা দিতে বাধ্য হয়। রাজনীতি আমাদের পেশা নয়। যারা রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নিয়েছে, তারা দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি করে। এরা আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত রক্ষা করতে দেয় না। আল্লাহতায়ালা যদি আমাদের দেশ পরিচালনার সুযোগ দেন, তাহলে চাঁদাবাজদের হাত বন্ধ করে দেব।
তিনি বলেন, কিছু রাজনৈতিক বন্ধু আছেন যারা মা-বোনদের কাপড় খুলে ফেলতে চান। তাদের কি মা-বোন নেই? যদি আপনারা নিজেদের মা-বোনকে সম্মান করতে শিখে থাকেন, তাহলে এ দেশের ৯ কোটি মা-বোনকে সম্মান করতে পারবেন। দয়া করে এ অপকর্ম থেকে বিরত থাকুন। যদি বিরত না থাকেন, ভয়ভীতি দেখান, গায়ে হাত তোলেন, কাপড় ধরে টান দেন তাহলে আমরা বলে দিচ্ছি, অনেক সহ্য করেছি। প্রয়োজনে জীবন দেব, কিন্তু আর কাউকে মায়েদের ইজ্জত কেড়ে নিতে দেব না, ইনশাআল্লাহ।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, কেউ এ ধরনের আচরণ করলে আপনারা সবাই মিলে প্রতিহত করবেন এবং পুলিশের হাতে দেবেন। কেউ আপনাদের বিরুদ্ধে মামলা করলে আমার বিরুদ্ধে আগে মামলা করতে বলবেন।
হবিগঞ্জ নিউ ফিল্ড মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় ডা. শফিক বলেন, এখনো মায়েরা ঘরের মধ্যে নিরাপদ নন। ঘর থেকে বের হলেও এবং কর্মস্থলেও নিরাপদ নন। এখনো প্রিয় দেশে চাঁদাবাজ ও মামলাবাজদের ভয়ে নিরীহ মানুষ অস্থির। দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে। মানুষ কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিল? আমি বিশ্বাস করি, এখানে রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানরা আছেন। আমিও এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। আমার ভাই যিনি জীবন দিয়েছেন আমি বিশ্বাস করি, এমন বাংলাদেশের চিত্র দেখলে তিনি হয়তো মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতেন না। জীবন বাজি রেখে যারা আমাদের ঋণী করে গেছেন, তাদের প্রতি এ দেশ, এ জাতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব কী সম্মান দেখিয়েছে?
তিনি বলেন, শহীদদের স্বপ্ন ছিল ন্যায় ও সাম্যের বাংলাদেশ গড়া। মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে। সন্তানরা সুশিক্ষা পাবে। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা স্বাস্থ্যসেবার অধিকার ভোগ করবে। সমাজে নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। কিন্তু আসলে কিছুই হয়নি। এর জন্য দায়ী কারা? যারা দফায় দফায় দেশ পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে, ভালো কিছু করলে তাদের জন্য এবং অপকর্ম করলে তাদের জন্যই দায়ী।
তিনি আরও বলেন, আমরা ন্যায়বিচার কায়েম করতে চাই। সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে যে আইনে শাস্তি হয়, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরাও অপরাধ করলে সেই একই আইনে বিচার হবে। আইন সবার জন্য সমান হবে। বিচার টাকার বিনিময়ে বিক্রি হবে না, ইনশাআল্লাহ।
জামায়াত আমির বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু কাগজের সার্টিফিকেট তৈরি করবে না, দক্ষ জনবল তৈরির কারখানা হবে। যারা দেশ গড়ার কারিগর হবে, সেই শিক্ষা দেব। আমরা যুবকদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দেব না। যুবকরা বেকার ভাতা চায় না। তারা চায় হাতের মর্যাদা, মর্যাদার কাজ।
তিনি বলেন, গ্রামে কৃষিভিত্তিক কলকারখানা চালু করব। সেখানে শিক্ষিত যুবকরা মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে গ্রামের চেহারা পাল্টে দেবে। সবাই মিলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এ বাংলাদেশ গড়ব, ইনশাআল্লাহ।
তিনি আরও বলেন, চা-বাগানের শ্রমিক ভাই-বোনেরা অমানবিক জীবনযাপন করেন। তাদের সন্তানরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। যুগ যুগ ধরে একই পেশায় আটকে আছেন। আমরা চা-বাগানে আধুনিকতা ও প্রযুক্তি আনব, জীবনমান পরিবর্তন করব, ইনশাআল্লাহ। তাদের একটি সন্তানও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে না। এ দেশে বংশানুক্রমে রাজার ছেলে রাজা হয় এ ধারা পাল্টে দিতে চাই। সাধারণ শ্রমিকের মেধাবী সন্তান যদি হয়, তাহলে মেধার বিকাশ ঘটিয়ে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী হবে। আমি জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, চাই বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের বিজয়।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, হবিগঞ্জ জেলার ৪টি আসন একটিতে দাঁড়িপাল্লা, দুটিতে দেয়াল ঘড়ি, একটিতে রিকশা। আপনাদের কাছে ৪টি আসনের সহযোগিতা চাই। ৪টি আসন ইনসাফ ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের হাতে তুলে দিন। আমাদের একবার পরীক্ষা করে দেখুন। সুযোগ দিলে আমরা আপনাদের পাহারাদার হব সম্পদ ও ইজ্জতের পাহারাদার। দেশের মালিক নয়, সেবক হব। জেলা আমির মখলিছুর রহমানের সভাপতিত্বে সমাবেশে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা সিরাজুল ইসলাম, মাওলানা আব্দুল বাসিত আজাদ, কাজী মহসিন আহমেদ, ড. আহমদ আব্দুল কাদের প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া নবীন চন্দ্র স্কুল মাঠে মৌলভীবাজার জেলা জামায়াত আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সিলেট এয়ারপোর্টকে পূর্ণমানের আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, সিলেট পূর্ণমানের আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট না হওয়ায় শুধু লন্ডন থেকে বিমান ওঠানামা করে। মাঝেমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে দু-একটি বিমান সিলেট হয়ে ঢাকা যায়। অথচ আমাদের বিপুল সংখ্যক মানুষ ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আছেন।
তিনি বলেন, সিলেটিরা মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রেখেছে। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে সিলেটে পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট হবে। যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার থেকে ফ্লাইট সিলেটে আসবে।
জামায়াত আমির বলেন, আমরা পাহাড়ি, সমতল, নিম্নাঞ্চল এবং সব জাতি-বর্ণ-শ্রেণির মানুষ নিয়ে শান্তি ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ গড়তে চাই। যেখানে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। এক শ্রেণি সম্পদের পাহাড় গড়বে, আরেক শ্রেণি ভুখা থাকবে এটা হতে দেব না।
চা-শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমি চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজারে জন্মগ্রহণ করেছি। চা-শ্রমিকদের ভুলে গেলে নিজেকেই ভুলে যাব। তাদের জন্য স্বাস্থ্য ও সুশিক্ষা নিশ্চিত করব।
ডা. শফিক বলেন, শুধু হাদি নয়, আবরার-ফাহাদ, আবু সাঈদ ও হাদিসহ তাদের সহযোদ্ধারা জীবন দিয়ে জাতিকে উপহার দিয়েছেন। আমরা তাদের হত্যাকারীদের বিচার করব। এ বাংলার মাটিতেই বিচার হবে, ইনশাআল্লাহ। ন্যায়বিচার হবে যেনতেন বিচার নয়। বিচারের নামে অবিচার করা হবে না।
কুলাউড়া নবীন চন্দ্র স্কুল মাঠে আয়োজিত জনসভায় জামায়াতের মৌলভীবাজার জেলা সেক্রেটারি মো. ইয়ামির আলীর পরিচালনায় এবং মৌলভীবাজার জেলা আমির ও মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মো. সাহেদ আলীর সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুর রহমান, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা, মৌলভীবাজার-১ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম প্রমুখ।
গতকাল শনিবার বিকেলে সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সেক্রেটারি জয়নাল আবেদীনের পরিচালনায় সভায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার জামায়াত ও ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন জামায়াত আমির। সভায় প্রার্থী, তাদের অনুসারী ও বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। মাদ্রাসা মাঠ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। বিশাল এ জনসভায় জামায়াত আমির ১৮ মিনিটের বক্তব্যে বলেন, সিলেট খনিজ সম্পদে ভরপুর। অথচ উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত, ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছে না সিলেটবাসী। গ্যাস-বিদ্যুৎ থেকে অনেকে বঞ্চিত। দায়িত্ব পেলে এ বঞ্চনার অবসান ঘটাব। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি বন্ধ হবে। অফিস-আদালতে ঘুষ নেওয়ার সাহস বা সুযোগ থাকবে না।
ডা. শফিক বলেন, গত ৫৪ বছর ধরে দেশে জুলুমের রাজনীতি চলছে। সবচেয়ে বেশি জুলুমের শিকার জামায়াতে ইসলামী। তবে দল হিসেবে কোনো জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেব না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরপরই বলে দিয়েছিলাম। নেতাকর্মীরা কথা রেখেছেন। দল হিসেবে প্রতিশোধ নিইনি, মামলা বাণিজ্য করিনি। কিন্তু অনেকে মামলা বাণিজ্য করেছে।
উপস্থিত জনতার প্রতি আকুতি জানিয়ে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমি এই সিলেটের সন্তান। আজ জামায়াতের আমির হিসেবে নয়, আপনাদের একজন হিসেবে দাঁড়িয়েছি। আমাদের একবার সুযোগ দিন। আমরা দেশের মালিক হব না, আপনাদের চৌকিদার হিসেবে কাজ করব। যার যা মর্যাদা, তা নিশ্চিত করব।’