ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ‘আমাদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ সুষ্ঠুভাবে ভোটগ্রহণ। আগামী এক সপ্তাহ খুবই ক্রুশিয়াল (গুরুত্বপূর্ণ)। ভোট উৎসবমুখর হবে। নারীরা আনন্দের সঙ্গে ভোট দেবেন। মানুষ পুরো পরিবার নিয়ে একসঙ্গে ভোট উৎসবে যোগ দেবেন। আমি আশা করি, এই ভোট ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’
গতকাল শনিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। পরে যমুনার বাইরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানান তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সারা দেশে উৎসাহ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে নির্বাচনের প্রচারণা চলছে। কেউ কারও বিরুদ্ধে কটু কথা বলছেন না। কোনো অভদ্র আচরণও হচ্ছে না। আমাদের অভদ্র কথাও হচ্ছে না। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য এটি খুবই ইতিবাচক পরিবর্তন। এখন পর্যন্ত প্রস্তুতি পর্ব খুব ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আমরা সন্তুষ্ট, উই আর ভেরি হ্যাপি। আমাদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে টু মেক ইট পারফেক্ট। ভোটটা যাতে পারফেক্ট হয়, সেটা হচ্ছে আমাদের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।’
প্রেস সচিব বলেন, পুলিশকে বডিওর্ন ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। সারা দেশে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্র, তার মধ্যে ২৫ হাজার ৭০০ বডিওর্ন ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। এই বডি ক্যামেরা কীভাবে কাজ করছে, মিটিংয়ে প্রথমেই রেন্ডমলি পাঁচটা জায়গায় প্রধান উপদেষ্টা যারা বডি ক্যামেরা ক্যারি করছিলেন, তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।’
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ চালু হয়েছে। এটি শুধু দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সিকিউরিটি অফিসার ব্যবহার করবেন। কোনো কেন্দ্রের ভেতরে বা বাইরে যদি গোলযোগ হয়, অ্যাপের মাধ্যমে দ্রুত সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বাহিনী, রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশনের কাছে বার্তা পৌঁছে যাবে, তখন দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। অ্যাপটি দুর্গাপূজার সময়ও পরীক্ষিত ও কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
নির্বাচনে প্রায় ৯ লাখের কাছাকাছি নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে বলে জানান প্রেস সচিব। এর মধ্যে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার। ইতিমধ্যে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর ১ লাখ ৮ হাজার ৮৮৫ জন সদস্য মোতায়েন সম্পন্ন হয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন সদস্য ১ হাজার ২১০টি প্লাটুন মোতায়েন করা হয়েছে। কোস্ট গার্ড ১০টি জেলার ১৭টি আসনের ২০টি উপজেলায় ৬৯টি ইউনিয়নে দায়িত্ব পালন করছে।
পুলিশের ১ লাখ ৫৭ হাজার সদস্য ১১ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে মোতায়েন হবে। আনসারের ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৬ জন সদস্য মোতায়েন গতকাল থেকেই শুরু হয়ে গেছে। বাকি সদস্য আজকের মধ্যে মোতায়েন সম্পন্ন হবে বলে বৈঠকে জানান আনসার প্রধান। র্যাবের মোতায়েনও সময়মতো শুরু হবে এবং তারা ইতিমধ্যে প্রস্তুতিমূলক কাজ সম্পন্ন করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২৯৯টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে। শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে সেখানে ভোট স্থগিত রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ২ হাজার ২৯ জন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৪ জন। নারী প্রার্থী ৮৩ জন। ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন। ভোটকেন্দ্র ৪২ হাজার ৭৯টি।
প্রেস সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত ভোটারদের জন্য পাঠানো ৪ লাখ ২২ হাজার ৯৬০টি পোস্টাল ব্যালট বাংলাদেশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৭০ হাজার ৩৮টি ব্যালট গ্রহণ করা হয়েছে। বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকছেন প্রায় ৪০০ এবং দেশি পর্যবেক্ষক প্রায় ৫০০ জন। বিদেশি সাংবাদিকের সংখ্যা আনুমানিক ১২০ জন।
বৈঠকে জানানো হয়, নির্বাচন-সংক্রান্ত অভিযোগ, তথ্য বা সহায়তার জন্য ‘নির্বাচন বন্ধু ভোটার’ হটলাইন চালু করা হয়েছে। এই নম্বরে ফোন করে ভোটাররা অভিযোগ জানাতে বা প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারবেন এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘পাশা’ নামে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার উপ-প্রেস সচিব মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, বৈঠকে নির্বাচন কমিশনের সচিব বিষয়টি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, সংবাদমাধ্যমে দেখা গেছে ‘পাশা’ নামে একটি এনজিও দাবি করেছে যে তারা ১০ হাজার নির্বাচনী পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেবে। বিষয়টি জানার পর নির্বাচন কমিশন তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়। যাচাই-বাছাই করে তাদের সক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার জন্য আপাতত তাদের পর্যবেক্ষক কার্ড বিতরণ স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ওই এনজিওটির কোনো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে।