দুদিন স্থগিত থাকার পর আবার কর্মবিরতি কর্মসূচির ডাক দিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে গত সপ্তাহে বুধবার পর্যন্ত খন্ডকালীন ও লাগাতার কর্মবিরতি পালন করেছিল সংগঠনটি। এতে বন্দরের কনটেইনার পরিবহনসহ সার্বিক কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ে। এ নিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানিকারক এবং বাণিজ্য সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বন্দরের দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নতা দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি বাড়ানোর পাশাপাশি বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের সরবরাহ ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
সবশেষ গতকাল শনিবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্নতা দেশের রপ্তানি খাতের ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। চট্টগ্রাম বন্দরের চলমান অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন করে স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে হাজার হাজার কনটেইনার আটকে আছে এবং রপ্তানির নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে পড়ছে।
ইউরোচ্যামের সদস্য প্রতিষ্ঠান ও বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহকারী ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ, রপ্তানি সময়সূচি ভেঙে পড়ায় পণ্য সরবরাহে বিলম্ব হচ্ছে এবং অতিরিক্ত পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যয় বাড়ছে। বর্তমানে বন্দরের টার্মিনাল, বেসরকারি ডিপো ও জাহাজে আটকে রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার কনটেইনার, যেগুলো রপ্তানির অপেক্ষায় রয়েছে। এতে আনুমানিক ৬৬ কোটি মার্কিন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের রপ্তানি পণ্য আটকে আছে।
সংগঠনটি বলছে, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পরিচালনা করে এবং রপ্তানি নির্ভর শিল্পগুলোর প্রধান প্রবেশদ্বার। স্বাভাবিক সময়ে এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫শ রপ্তানি কনটেইনার পরিবহন হয়। তবে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে কাজ বন্ধ থাকায় কনটেইনার চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ বলেছে, নিরবচ্ছিন্ন, পূর্বানুমানযোগ্য ও দক্ষ বন্দর কার্যক্রম রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ভূমিকা রাখে। বিদেশি চাহিদার সঙ্গে যুক্ত লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষিত রাখতে এবং ইউরোপ ও বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের একটি নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে সুনাম বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইউরোচ্যামের আশঙ্কা, দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে এমন সময়ে যখন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি ও সময়মতো সরবরাহের বিষয়ে আরও সংবেদনশীল।
এ পরিস্থিতিতে ইউরোচ্যাম বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরের পূর্ণাঙ্গ ও স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত নিশ্চিত করার। জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে চলমান বিরোধগুলো গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা এবং দক্ষতা, নির্ভরযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতাশীলতা বাড়াতে বন্দর আধুনিকায়ন কার্যক্রম জোরদার করা।
ইউরোচ্যামের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৮ লাখ ৩১ হাজারের বেশি রপ্তানি কনটেইনার পরিবহন হয়েছে। যার মোট মূল্য ছিল ৪২ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে বস্ত্র ও তৈরি পোশাক খাত থেকে। যা দেশটিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারকে পরিণত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি সম্প্রতি ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।
এদিকে বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ না দেওয়ার সুস্পষ্ট সরকারি ঘোষণাসহ চার দাবিতে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য চট্টগ্রামে ধর্মঘট ডেকেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। গতকাল শনিবার সংবাদ সম্মেলন করে আজ সকাল ৮টা থেকে পুনরায় ধর্মঘট শুরুর ঘোষণা দেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন। যেসব দাবিতে ঘর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়, তার মধ্যে রয়েছে বন্দরের বর্তমান চেয়ারম্যান এসএম মনিরুজ্জামানকে পদ থেকে প্রত্যাহার করা। বিগত আন্দোলনে যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত, পদাবনতিসহ নানাবিধ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা বাতিল করা এবং আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ না করা।
এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে এর আগে গত শনিবার থেকে সোমবার আট ঘণ্টা করে এবং মঙ্গলবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত টানা কর্মবিরতি পালন করেছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। এ সময় বন্দর থেকে আমদানি পণ্য চালান ডেলিভারি, কনটেইনার হ্যান্ডলিং এমনকি বন্দর জেটিতে জাহাজ আনা-নেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠকের পর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের আশ্বাসে দুদিনের জন্য অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিলেন শ্রমিক নেতারা।