জেতার লড়াই আর হারার অপেক্ষা

আপনি কি নির্বাচনে জিতবেন? জনগণ ভোট দিলে অবশ্যই জিতব। তখন প্রশ্ন আসে, জনগণ আপনাকে কেন ভোট দেবে? তখন প্রার্থী তার পরিকল্পনা হাজির করেন, তার অতীত দিনের কাজের ফিরিস্তি দেন, এবং তিনি জনগণের কথা সবসময় ভেবেছেন এবং ভবিষ্যতেও ভাববেন এই সংকল্প ঘোষণা করেন। এগুলো হচ্ছে নির্বাচনের সময় প্রকাশ্য তৎপরতা। কিন্তু ইতিহাস বলে এইটুকুতেই নির্বাচন হয় না, এই ঘোষণা বা তৎপরতাই যথেষ্ট নয়। প্রকাশ্য ঘোষণা ও তৎপরতার বাইরে গোপন ক্রিয়া নির্বাচনে প্রধান ভূমিকা রাখে। এর মধ্যে প্রতিপক্ষের চরিত্র হনন, ভোটারদের দুর্বলতার সুযোগ নেওয়া, কেন্দ্রে কারসাজি করা এবং শক্তি প্রয়োগ করা অন্যতম। আর এক্ষেত্রে টাকা এবং ধর্ম হয়ে পড়ে প্রধান হাতিয়ার। নির্বাচন কমিশন যে ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে হাতেগোনা কয়েকজন প্রার্থী ছাড়া বাকিরা তার তোয়াক্কাই করে না, যে আচরণবিধি ঘোষিত হয়েছে তা লঙ্ঘিত হয় প্রতিদিন। কমিশন দেখে কিন্তু সহ্য করে যায়। এরপর আছে দলীয় প্রার্থীদের ক্ষেত্রে তাদের দলের ইশতেহার ঘোষণা। ইশতেহারে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে রূপকল্প হাজির করা হয়। এই দেশের একটা অতীত ছিল, সেই অতীতের পথ বেয়ে কীভাবে দেশটা বর্তমানে এলো, কেন মানুষের প্রত্যাশা এবং শাসকদের প্রতিশ্রুতি বারবার মার খাচ্ছে, কোন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণে স্বপ্নগুলো দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে তার ব্যাখ্যা বেশিরভাগ দলই দিচ্ছে না। ফলে বিশাল আয়োজন করে ইশতেহার ঘোষণা একটা আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। এর চুম্বক কথাগুলো নিয়ে জনগণকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা হয় কিন্তু ধারণা করা হয় যে এগুলোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দলের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বা অতীতের সংযোগ। উনি আমাদের পুরনো ভোটার, এর অর্থ তিনি আমাদের ভোট দেবেনই, ইশতেহারে যাই লেখা থাক না কেন।

নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ। কিন্তু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা না শক্তিশালী হলে অঙ্গ কি কর্মক্ষম থাকবে? যেমন পক্ষাঘাত হয় মাথায় কিন্তু অচল হয় হাত-পা। তেমনি শাসকদের দমন-পীড়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ না কাজ করলে নির্বাচন থাকলেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা তো দূরের কথা চর্চা করাও মুশকিল। গত তিনটা নির্বাচনের বিরোধিতার সঙ্গে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা এখানেই। গত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, ক্ষমতাসীনদের অধীনে নির্বাচন তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার শর্ত তৈরি করে। ফলে জনগণ বিশ্বাস করে সুষ্ঠু-অবাধ নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে সম্ভব নয়। অভ্যুত্থানের পর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জিজ্ঞাসা তৈরি হয়েছে, এবারের নির্বাচন কেমন হবে? জালিয়াতির অতীত উদাহরণ মানুষ ভুলেনি তাই আশঙ্কাও পিছু ছাড়েনি। নির্বাচনের আর কয়েকটা দিন বাকি। চলছে প্রতিশ্রুতি আর কথার লড়াই। নির্বাচনে জয়টাকে সম্ভব করতে অসম্ভব প্রতিশ্রুতি যেমন দিচ্ছে তেমনি নিজেরা যে কত ক্ষমতাধর সেই প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন প্রার্থীরা। ভাবখানা এই যে এই রকম ক্ষমতাসম্পন্ন মানুষকে সংসদে প্রতিনিধি হিসেবে পাঠালে এমন কোনো সমস্যা নেই যা তিনি সমাধান করতে পারবেন না। কেউ বলছেন তার কথায় সূর্য থেমে যায়, কেউ হুংকার দিচ্ছেন তার কথায় থানাকে উঠতে এবং বসতে হবে। কেউ কেউ আবার আরও একধাপ এগিয়ে বেহেশতের টিকিট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। হুঙ্কারও দেওয়া হচ্ছে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে, কীভাবে পেটের ভেতর থেকে দুর্নীতির টাকা বের করে আনা হবে সে প্রক্রিয়ার কথাও বলছেন কেউ কেউ। ১২ কোটি ৭৮ লাখ ভোটারের অর্ধেক নারী। তাদের ব্যাপারেও নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। সব মিলে এ যেন এক এলাহি কারবার।

সংখ্যা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচনের মুখে যখন অর্থনীতি হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় আশ্বাসের জায়গা, তখন সেই সংখ্যাগুলোর ওজন বাড়ে কয়েকগুণ। ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি, রাজস্ব প্রবৃদ্ধির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা, জনগণের জন্য নেওয়া কর্মসূচি নিয়ে কাগজে-কলমে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা দেখলে মনে হতে পারে বাংলাদেশ  ইতিমধ্যেই উন্নয়নের উচ্চতম ধাপে পা রাখতে চলেছে।  এই অঙ্কগুলো কি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে, নাকি আগের মতোই ভোটের আগের পরিচিত সংখ্যার রাজনীতি? বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ, রাজস্ব ঘাটতি, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে এই  অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতিগুলো প্রশ্ন তৈরি করে। 

মানুষ সংখ্যাকে পছন্দ করে, গুরুত্ব দেয়। কিন্তু সবসময় একই তাৎপর্য বহন করে না। জনগণের জন্য বরাদ্দ বাড়ানো হবে সেই ক্ষেত্রে সংখ্যা আর দ্রব্যমূল্য বাড়ছে সেই ক্ষেত্রে সংখ্যা একরকম অনুভুতি তৈরি করে না, জীবনে প্রভাবটাও একরকম নয়। সংখ্যা নিরপেক্ষ কিন্তু তার ব্যবহার নিরপেক্ষ নয়। ক্লাসে রোল কম হওয়া খুশির ব্যাপার কিন্তু বেতন কম হওয়া নিশ্চয়ই আনন্দের নয়। সংখ্যা আমাদের জীবনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। রাজনীতিতে তাই সংখ্যার গুরুত্ব অনেক বেশি। সহজেই ভোটারদের আকৃষ্ট করতে এই সংখ্যার ব্যবহার হয়ে আসছে বছরের পর বছর। রাজনৈতিক দল যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকে তখন নিজের সরকারের সফলতা দেখাতে কোনো বিষয়ে সংখ্যাকে বড় করে আবার কখনো ছোট করে দেখায়। যেমন, মূল্যস্ফীতি বা জীবনযাত্রার ব্যয়কে কমিয়ে দেখায় আবার জিডিপির প্রবৃদ্ধি বা মাথাপিছু আয়কে বেশি দেখানো হয়। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার যে শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে তাতে দেখা গেছে, কীভাবে গত পনের বছরে হাসিনা সরকার জিডিপির প্রবৃদ্ধিকে বাড়িয়ে দেখিয়েছিল। তাতে দলের ভাবমূর্তি বাড়লেও জনগণের দুর্দশা কমেনি। সরকার ক্ষমতা ছাড়ার পর অর্থনীতির ক্ষত বীভৎসভাবে উন্মোচিত হয়েছে যার খেসারত দিচ্ছে জনগণ।  কেউ যখন বলেন, ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করবেন তখন মনে হয় অর্থনীতি নিয়ে কি গভীর কোনো ভাবনা তারা ভেবেছেন? ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সাময়িক হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বা জিডিপি ধরা হয়েছে ৪৬২ বিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের বেশি হবে না এমন পূর্বাভাস দিচ্ছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিডিপি বেড়ে হবে কমবেশি ৪৮৫ বিলিয়ন ডলার। কেউ বলছেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়িয়ে ক্রমান্বয়ে ৭ শতাংশে উন্নীত করা হবে। কিন্তু এই পরিমাণ জিডিপি ধারাবাহিকভাবে বাড়াতে হলে কী পরিমাণ শিল্প, কৃষি, সেবা খাতের উন্নয়ন লাগবে তা কি বিবেচনায় আছে? জিডিপি তো হঠাৎ করে বাড়বে না। তারা কোনো হিসাব ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা হাজির করে বলেছেন কি? যদি শুধু বলা হয় দুই ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপি হবে তাহলে তা শুনতে ভালো কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য কি না সে ব্যাপারে সংশয় থেকেই যাবে। এখন যদি সাধারণ হার অনুযায়ী হিসাব করা হয়, তাহলে দেখা যাচ্ছে প্রথম ৫ বছরে জিডিপি হতে পারে ৬৮০ বিলিয়ন ডলার। কেন এমন সংখ্যার বৃদ্ধি?

কেউ বলেছেন মাথাপিছু আয় বাড়াবেন। এখনই যে আয় আছে তা মাথায় এবং খাতায় আছে মানুষের পকেটে কি আসে? এখন বলা হচ্ছে মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলার করা হবে। কিন্তু প্রতিবছর কী হারে বাড়বে সেটা বলা নেই। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাময়িক হিসাবে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২০ ডলার। টাকার অঙ্কে তা দাঁড়ায় বছরে ৩ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। দেশের শ্রমিক কৃষক, ছাত্র, গৃহিণী, শিশু, বৃদ্ধ তাদের কি মাসে ২৮ হাজার টাকা আয় আছে? কিন্তু মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে এত বেশি প্রবৃদ্ধি হওয়া সম্ভব নয়। ২০২৩-২৪ ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে মাথাপিছু আয় বেড়েছিল ৩ শতাংশের মতো। কত বাড়াতে পারবেন তারা, এবং কীভাবে বাড়াবেন এবং তার সুফল জনগণ কীভাবে পাবেন? যে কথা লেখার শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছিল, নির্বাচনে কে জিতবেন? কীভাবে তা নির্ধারিত হবে? প্রার্থী জিতলে কী করবেন এবং কীভাবে করবেন এইসব প্রশ্ন এবং তার উত্তর পেয়ে জনগণ সন্তুষ্ট হলে কি ভোট দেবেন? মধ্য দিয়েই কি জনমত তৈরি হবে? নাকি টাকা, পেশিশক্তি, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার আর প্রশাসনের খবরদারি দ্বারা নির্বাচন প্রভাবিত হবে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া দরকার ছিল। কিন্তু তা এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং প্রতিশ্রুতির বন্যায় ভেসে যাচ্ছে প্রতিজ্ঞা এবং জাবাবদিহি। মানুষের মধ্যে সেই চেতনা জাগিয়ে তোলাই নির্বাচনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু যখন ক্ষমতা দখল প্রধান উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় আর ক্ষমতা মানে সব কিছু ভোগ করার অবাধ সুযোগ তখন হারিয়ে যায় নীতি আর ঔচিত্যবোধ। সংসদ হলো আইনসভা। কথিত আছে আইন গরিবদের শাসন করে আর ধনীরা শাসন করে আইনকে। তাই টাকার খেলা যখন চলে তখন সংসদ হয়ে পড়ে ধনীদের ক্লাব। ব্যবসায়ীরা যখন প্রাধান্যে আসে তখন ভোটারদেরও ভাবা হয় ভোটের বাজারে পণ্য। এই পণ্য মানসিকতা থাকলে গণতন্ত্র কি কার্যকর হবে?

যখন শ্রমের বাজারে শ্রমিক পণ্য, ভোটের বাজারে ভোটার পণ্য তখন প্রতিশ্রুতি রক্ষার দায় কি দল বা প্রার্থীর থাকে? নির্বাচনগুলো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় প্রতিশ্রুতি রক্ষার দায় কেউ নেয়নি। পাঁচ বছর পর পর জনগণের ওপর কারা কর্র্তৃত্ব করবেন তার সম্মতি দেওয়াই কি নির্বাচনের লক্ষ্য হবে? অভ্যুত্থানের পর যে নতুন আশাবাদ তৈরি হয়েছিল তা ধূসর হয়ে যাবে কি পুরনো মানসিকতার কাছে। প্রতিশ্রুতি দেওয়া আর প্রতিশ্রুতি পালন না করার সেই পুরনো বৃত্তে থাকলে নির্বাচনে যেই বিজয়ী হোক না কেন হেরে যাবে গণতান্ত্রিক সমাজের আকাক্সক্ষা। জনগণ তো সেটা চায় না। এই না চাওয়ার প্রতিফলন যেন ঘটে তাদের ভোটে।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

rratan.spb@gmail.com