ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহ্বান জামায়াত আমিরের

জুলাই অভ্যুত্থানকে সফল করার জন্য আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নেতাকর্মী-সমর্থকদের ভোটকেন্দ্র পাহারা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কোনো দুর্বৃত্ত যাতে আপনাদের ভোটকে এদিক-সেদিক করার দুঃসাহস না দেখায়। আপনারা জুলাইয়ে যেমন পাহারাদারি করেছেন বীরের মতো, এখন জুলাই অভ্যুত্থানকে সফল করার জন্য ১২ তারিখ একইভাবে পাহারা দেবেন। গতকাল রবিবার রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ডিআইটি প্রজেক্ট খেলার মাঠে ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলামের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে এ কথা বলেন তিনি। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। নির্বাচনে জয়ী হলে নাহিদ ইসলামকে মন্ত্রী করার ঘোষণা দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই নাহিদ ইসলামরা আগামীতে বাংলাদেশ নামের উড়োজাহাজের পাইলট, ক্যাপ্টেন হিসেবে বসে যাবে। আর আমরা পেছনের সিটে প্যাসেঞ্জার হিসেবে বসব। আমরা বিশ্বাস করি, তারা বাংলাদেশকে সঠিক গন্তব্যে নিয়ে যাবে।’

তিনি আরও বলেন, এখানে জামায়াতে ইসলামীসহ ১১ দলের দলের যারা আছেন তাদের সবাইকে বলব ‘আমাদের কাছে একটা ভোট বড়ই দামি। একটা সিট বড়ই দামি। আমাদের প্রত্যেকের একটা ভোট দরকার এবং এখানকার একটা সিটও দরকার। এই ভোটগুলা শাপলার বাক্সে ঢোকানো পর্যন্ত এখন থেকে পাহারাদারি করবেন।’

জনগণ নির্বাচনে দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, মামলাবাজ ও দখলদারদের প্রত্যাখ্যান করবে বলেও মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘যেসব অপকর্ম করে আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় জাতিকে কষ্ট দিয়েছে, একই অপকর্ম এই লোকগুলো ৬ তারিখ সকাল (২০২৪ সালের ৬ আগস্ট) থেকে শুরু করে দিল। আমরা বিনয়ের সঙ্গে তাদের অনুরোধ করলাম মজলুম ছিলেন জালিম হবেন না। মজলুমের কষ্ট তো বোঝার কথা। তা এখন মানুষকে কষ্ট দিচ্ছেন কেন? কিন্তু না। আমরা লক্ষ করলাম, বেপরোয়া গতিতে চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মামলাবাজি শুরু হয়ে গেল।’ তিনি বলেন, এই সাড়ে ১৫ বছর যারা বাংলাদেশের মাটিতে ছিলেন না, পালিয়ে গিয়ে অন্য কোনো জায়গায় নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করেছিলেন, ফিরে এসে তারাই মামলা-বাণিজ্য করেছেন। বক্তব্যে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জামায়াত আমির। ৫৯ জন ভয়াবহ ঋণখেলাপি ও ব্যাংক ডাকাতকে কেন মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে এমন প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘এদের বগলের নিচে আশ্রয় দিয়ে এমপি বানিয়ে আপনারা করবেন দুর্নীতি দমন! এগুলো শুনলে প্যাঁচাও হাসবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘১০ টাকা দরের চালের আশ্বাসটা ছিল ভুয়া। এই কার্ডগুলো সে রকম ভুয়া। এসব ভুয়া কার্ডকে আগামী ১২ তারিখ জনগণ ইনশাআল্লাহ লাল কার্ড দেখাবে।’ তিনি বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যে আকাক্সক্ষা নিয়ে এ দেশের মানুষ রক্ত দিয়েছিল, ১২ তারিখ সেই রক্তের ঋণ পরিশোধের দিন। এই রক্তের সঙ্গে যারা বেইমানি করবে, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।’

জাতির ভাগ্যবদলের জন্য পাঁচ বছর সময় যথেষ্ট উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, ‘১২ ফেব্রুয়ারির পর জনগণের আকাক্সক্ষার ভিত্তিতে যে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে, সেখানে কোনো সামাজিক অপকর্ম চলতে দেওয়া হবে না। এরপর বাংলাদেশ রাস্তা খুঁজে পেয়ে যাবে এবং সেই মহাসড়ক ধরে সামনে এগিয়ে যাব। জামায়াত জাতিকে মিথ্যা কোনো আশা দেয় না।। বাংলাদেশের মানুষের জীবন, সম্পদ এবং ইজ্জত এই তিনটার পাহারাদার হব আমরা। শুধু ঢাকা-১১ আসনের জন্য নয়, আমরা বাংলাদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যেকের হকের ওপর পাহারাদারি করব।’

বিচার বিভাগ নিয়ে তিনি বলেন, বিচার একেকজনের জন্য একেক রকম হবে না। সাধারণ একজন মানুষ অপরাধ করলে ওই নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য বিচার করে তার যে শাস্তি হবে, দেশের রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রী একই অপরাধ করলে তাদেরও ছাড় দিয়ে কথা বলা হবে না।’

মানুষের ঋণ শোধ করতে চাই নাহিদ ইসলাম : সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা-১১ আসনে এনসিপি মনোনীত প্রার্থী ও দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এই এলাকার শত শত মানুষের জমি, শত শত খাসজমি, সাধারণ জলাশয় দখল করে ভরাট করে ফেলা হয়েছে। শত শত পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। যারা রাজনীতির ময়দানে ছিলেন, তারাই ভূমিদস্যু হিসেবে এ কাজগুলো করেছেন অথবা ভূমিদস্যুদের সহায়তা করেছেন। আগস্টের আগে যারা প্রধান দুই দল হিসেবে পরিচিত ছিল, তাদের এখানকার স্থানীয় নেতারাই ৩০ বছর ধরে ভাগবাঁটোয়ারা করে ভূমি দখল করেছেন। ৫ আগস্টের পরে একজন চলে এসেছেন। আর এখানে যিনি দখলদারি ও চাঁদাবাজি করতেন, তিনি তার স্থানে চলে গেছেন। এই এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে তারা জনগণের বিরুদ্ধে সবসময় কাজ করে গেছেন।’

১২ ফেব্রুয়ারি জনগণের সামনে ভূমিদস্যু, দখলদার, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী ও ঋণখেলাপিদের পরাজিত করার সুযোগ এসেছে বলে মন্তব্য করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচিত হলে এই এলাকার অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা হবে। নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। ঢাকা-১১ আসন থেকে ভূমিদস্যুদের সিন্ডিকেট চিরতরে নির্মূল করা হবে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আমি কয়েক দিন এই আসনের বিভিন্ন জায়গায় পালিয়ে ছিলাম। ঢাকা-১১ আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। আমার জীবনের ২৮টি বছরও এই এলাকা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। এখন আমি চাই ঢাকা-১১ আসনের মানুষের প্রতি ঋণ শোধ করতে।’

ঢাকা-১১ আসনে নাগরিক সুবিধা নেই বলে জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ঘনবসতি থাকা সত্ত্বেও এই এলাকায় পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, স্কুল ও সরকারি হাসপাতালের অভাব রয়েছে; স্বাস্থ্য খাত প্রায় পুরোপুরি প্রাইভেটের ওপর নির্ভরশীল এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে মাত্র ১৫টি, সরকারি হাইস্কুল নেই। ভাটারা-বাড্ডার প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ ইনফরমাল অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং শিক্ষিত বেকার ৮-১০ শতাংশ। বর্ষায় সামান্য বৃষ্টিতেই প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়, কারণ মাত্র ৩০-৩৫ শতাংশ এলাকায় পরিকল্পিত ড্রেনেজ আছে; খাল ও নদী দখল-ভরাট হওয়াও বড় কারণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সারা দেশে জয়ী হবে এবং দেশকে দখলদার ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে সবাইকে তাদের প্রার্থীদের সমর্থন দিতে হবে।’

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও দেশের মানুষের ভাগ্যে মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। শাসকের পরিচয় বদলালেও শোষণ, লুটপাট ও দুর্নীতির রাজনীতি বহাল রয়েছে। সেই রাজনীতির চূড়ান্ত অবসান ঘটাতেই ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্য গড়ে উঠেছে। জুলাই বিপ্লবের প্রশ্নে কোনো আপস নয়; ব্যালটের মাধ্যমেই সন্ত্রাস ও লুটপাটের রাজনীতিকে বিদায় জানাতে হবে।’

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ‘ব্যালটবিপ্লব’ আখ্যা দিয়ে মামুনুল হক বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা পূরণ করতে হবে। কোনো আপস নয়, কোনো নমনীয়তা নয়। তিনি ঢাকা-১১ আসনের ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমি যদি এই আসনের ভোটার হতাম, শাপলা কলি প্রতীকে নাহিদ ইসলামকেই ভোট দিতাম।’