প্রার্থী আছে প্রচার নেই

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানুষের দোরগোড়ায়। প্রচারের শেষ সময়ে প্রার্থীরা এখন ব্যস্ত ভোটারদের কাছে টানতে। দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সভা-সমাবেশ, মিছিল ও গণসংযোগের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছেন। এর মধ্যেও কেউ কেউ প্রার্থী থাকলেও নেই মাঠের প্রচারে। সীমিত পর্যায়ে শুধু ব্যানার লাগিয়ে প্রচারের কাজ শেষ করেছেন। ভোটাররা তাদের অনেককে চেনেনও না। এমন চিত্রই দেখা গেছে ঢাকার কয়েকটি সংসদীয় আসন ঘুরে।

আওয়ামী লীগবিহীন এবারের নির্বাচনে কার্যত বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এর বাইরে কিছু ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও ভোটের মাঠে মূল লড়াই হচ্ছে এ দুই জোটের মধ্যে।

ঢাকা জেলা ও মহানগরের ২০টি আসনে এবার প্রার্থী রয়েছেন ১৮৬ জন। এর মধ্যে বেশ কিছু স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থীরা সর্বত্র সরব। এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এককভাবে নির্বাচন করছে। পাশাপাশি বাম জোট থেকে শতাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন তাদের প্রার্থীরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকাসহ সারা দেশেই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে। হাতেগোনা কয়েকটি আসনে ত্রিমুখী লড়াই দেখা যেতে পারে।

এদিকে রাজধানীর ঢাকার অলিগলি ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেলেও বাস্তবে প্রচারণার চিত্র দ্বিপক্ষীয় বলেই মনে করছেন ভোটাররা। তারা বলছেন, এলাকায় নিয়মিত বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের পক্ষে মিছিল হচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রার্থীরা বাসাবাড়িতে গিয়ে সরাসরি ভোটও চাইছেন। তবে এর বাইরে অংশ নেওয়া বেশিরভাগ দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতীকের পক্ষে তেমন প্রচার শেষ মুহূর্তেও চোখে পড়ছে না। এ কারণে অনেক ভোটারের কাছেই এবারের নির্বাচন ‘নির্বাচনী উৎসব’ হিসেবে ধরা দিচ্ছে না বলে জানিয়েছেন তারা। রাজধানীতে এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ঢাকা-৮ আসন। আসনটিতে ১১ জন প্রার্থী অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট সমর্থিত এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পেরেছেন। এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেফায়েত উল্লা, জাতীয় পার্টির মো. জুবের আলম খান, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ত্রিদ্বীপ কুমার সাহাকে প্রচারণা করতে দেখা গেছে।

আসনটির ইস্কাটন গার্ডেন, বেইলি রোড, পল্টন ও মতিঝিল এলাকা ঘুরে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (মার্ক্সবাদী) এএইচএম রাফিকুজ্জামান আকন্দ, গণ অধিকার পরিষদের মেঘনা আলমের কিছু ব্যানার-ফেস্টুন দেখা যায়। অন্যদিকে বাংলাদেশ জাসদের এএফএম ইসমাইল চৌধুরী, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এসএম সরওয়ার ও মুক্তিজোটের মো. রাসেল কবিরের ব্যানার-ফেস্টুন চোখে পড়েনি।

১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার ও ইস্কাটন গার্ডেনের বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, মির্জা আব্বাসের পক্ষে লোকজন আসে। লিফলেট দিয়ে যায়। রাস্তায় বের হলে অন্যান্য প্রার্থীর প্রচারের ব্যানার দেখা যায়। তবে এলাকায় অন্য কোনো দলের প্রার্থীদের ভোট চাইতে আসতে দেখিনি।

একই ওয়ার্ডের আরেক বাসিন্দা মো. কবির বলেন, মির্জা আব্বাস আর নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে চিনি। এর বাইরে কাউকেই চিনি না। শুনেছি আরও ছয়-সাতজন প্রার্থী আছেন।

অন্যদিকে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী নির্বাচন করছেন ঢাকা-১২ আসনে। আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীক না থাকলেও বিএনপি জোটের প্রার্থী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক। এর বাইরে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সাইফুল আলম খান মিলন রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এ তিন প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এর বাইরেও আসনটিতে আরও ১২ জন প্রার্থী রয়েছেন।

আসনটির কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি অলিগলি ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির কল্লোল বণিক, গণসংহতি আন্দোলনের তাসলিমা আখতার, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের (মুক্তিজোট) মুনতাসির মাহমুদ, আমজনতার দলের তারেক রহমানের প্রচারের ব্যানার চোখে পড়েছে। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, হাতেগোনা কয়েকজনের বাইরে অন্য প্রার্থীদের দেখা পাননি তারা।

রাজাবাজারের বাসিন্দা জেসমিন আক্তার বলেন, বাসায় কোদাল, দাঁড়িপাল্লা আর ফুটবলের পক্ষে ভোট চেয়ে গেছে। রাস্তায় বের হলে তো দেখা যায় অনেক প্রার্থী দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের অনেককেই চিনি না। ভোটের দিন সিদ্ধান্ত নেব কাকে ভোট দেওয়া যায়।

ভোটের পরিস্থিতি কী জানতে চাইলে একই এলাকার আরেক বাসিন্দা মনোয়ার খান বলেন, আসনটিতে ধানের শীষ প্রতীক না থাকায় একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তবে সন্ধ্যার পর মাঝেমধ্যে মিছিল হয়। দু-একজন প্রার্থীকে দেখা যায়, তারা প্রচার চালাচ্ছেন। বাকি প্রার্থীরা চলতি পথে ভোট চেয়ে যান।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪, ১৫, ১৬, ১৭, ১৮, ২২ ও ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড তথা ধানম-ি, নিউ মার্কেট, কলাবাগান, হাজারীবাগ থানা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১০ আসন। আসনটিতে নয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে মূলত বিএনপি ও জামায়াত জোটের প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

আসনটিতে বিএনপির মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন রবিউল আলম রবি, জামায়াতে ইসলামীর অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার। এর বাইরে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীও রয়েছেন।

আসনটির কলাবাগান, কাঁঠালবাগান, নিউ মার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন সমর্থিত প্রার্থীদের ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে। এর বাইরে আসনটিতে বাংলাদেশ লেবার পার্টি, জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট), আমজনতার দল ও জনতার দলের প্রার্থী থাকলেও তারা প্রচার-প্রচারণায় নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

এই আট আসনের পাঁচটি জায়গায় আট-দশজন ভোটারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তাদের মতে, বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হলেও আসনটিতে অন্য প্রার্থীরা অচেনা। কলাবাগানের বাসিন্দা ও মুদি ব্যবসায়ী জামাল আকন্দ বলেন, ভোট হলেও পরিবেশ খুব ঠা-া। ভোটারদেরও আগ্রহ খুব একটা নেই। বিএনপি ও জামায়াতের লোকজন আসে, ভোট চেয়ে যায়। আগে যেমন ভোটের উত্তাপ ছিল, বিশেষ করে ২০১৮ সালে, এবার তেমনটা দেখা যাচ্ছে না।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড মোহাম্মদপুর এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ আসন। এখানে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। তিনি তার দল থেকে পদত্যাগ করে ধানের শীষে লড়ছেন। অন্যদিকে ১১-দলীয় জোটের হয়ে রিকশা প্রতীকে লড়ছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক। স্থানীয়দের মতে, মূল লড়াই হবে এ দুই প্রার্থীর মধ্যে। আসনটিতে আরও সাতজন প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে ইনসানিয়াত বিপ্লব, গণঅধিকার পরিষদ (জিওপি), বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ সমর্থিত প্রার্থী রয়েছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সোহেল রানা ও শেখ মো. রবিউল ইসলাম।

আসনটির নূরজাহান রোড, বাঁশবাড়ি, বেড়িবাঁধ এলাকা ঘুরে ধানের শীষ, রিকশা, ঘুড়ি ও মই প্রতীকের বাইরে অন্য প্রার্থীর পোস্টার চোখে পড়েনি। কিছু জায়গায় ধানের শীষ ও রিকশা মার্কার নির্বাচনী ক্যাম্প চোখে পড়লেও অন্য প্রার্থীদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বাঁশবাড়ি এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মান্নান বলেন, আমি ১৯৯১ সাল থেকে ভোট দিয়ে আসছি। এমন ভোটের প্রচার আগে কখনো দেখিনি। এতদিন গেল এখন পর্যন্ত প্রার্থীদেরই চোখে দেখলাম না।

নূরজাহান রোডের ব্যবসায়ী শামিম হোসেন বলেন, এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেই। ধানের শীষের যে প্রার্থী, তাকেও আগে চিনতাম না। মামুনুল হক রয়েছেন, তিনিও এলাকায় বিশেষ পরিচিত নন। এর বাইরে নাকি আরও ছয়-সাতজন প্রার্থী আছেন, কিন্তু তাদের চিনি না। ফলে আসনটিতে ভোটের আমেজ কম।