নাহিদ ইসলাম বললেন

বিভিন্ন বাহিনীতে থাকা অপরাধীদের বিচার করা হবে

সামাজিক বৈষম্য দূর করে ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, পুরনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ভেঙে নতুন রাষ্ট্রকাঠামো গড়ে তোলা হবে। বিভিন্ন বাহিনীর ভেতরে গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত লুকিয়ে থাকা সব অপরাধীকে শনাক্ত করা হবে। তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকৃত দায়ীদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি বিধান করা হবে। গতকাল রবিবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।

নাহিদ ইসলাম বলেন, দীর্ঘ ১৫ বছর ফ্যাসিবাদী শাসনে খুনি হাসিনা গুম, হত্যা, বিনাবিচারে কারাবন্দি, হামলা, নির্যাতন, মিথ্যা মামলা করার ক্ষেত্রে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে। এতে আওয়ামী লীগ ও তার ছাত্রলীগসহ সব অঙ্গসংগঠন, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, ডিজিএফআই, এনএসআই এমন সব সরকারি বাহিনী ও সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে কাজে লাগিয়েছে। তার এই অপকর্মে ব্যবহৃত হয়েছে জনপ্রশাসন, বিচার বিভাগ, সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান। দেশব্যাপী একটি শক্তিশালী গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ১৮ বছর বয়সী সব সক্ষম তরুণ-তরুণীর জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ চালু করা হবে। একইসঙ্গে সশস্ত্র ব্যবস্থাকে আধুনিক ও উচ্চপ্রযুক্তি নির্ভর করা হবে। আমাদের লড়াই হবে সেই ‘নিপীড়নের ব্যবস্থা’ ও ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’ সমূলে উৎপাটন করা, যা আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সব প্রবণতা সমাজ থেকে মুছে ফেলা।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বিগত সরকারের সমালোচনা করে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, ভারতনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি থেকে বের হয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা হবে। আমরা কারও সঙ্গে শত্রুতা চাই না। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে কারও পুতুল রাষ্ট্র হতেও রাজি নই। পুলিশ বাহিনীকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব করে তিনি বলেন, পুলিশ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে ‘জনসেবক বাহিনী’ রাখা হবে। কেন্দ্রীয় দলীয়করণ ও ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে এই বাহিনীর নিয়োগ ও পদায়ন সম্পূর্ণ উপজেলাভিত্তিক করা হবে।

নাহিদ বলেন, বাংলাদেশকে দখলমুক্ত করতে হবে, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে ইন্ডিয়ার আধিপত্য থেকে দেশকে দখলমুক্ত করতে হবে। মানবাধিকার ও গণতন্ত্র হরণকারী ফ্যাসিবাদী শক্তির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বলয় থেকে দেশকে দখলমুক্ত করতে হবে। চাঁদাবাজি, আধিপত্য ও দুর্নীতির থেকে দখলমুক্ত করতে, স্বল্পশিক্ষিত, অযোগ্য, অসৎ, লোভী, বেপরোয়া, দুর্নীতিগ্রস্ত ও পক্ষপাতদুষ্ট রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী ও আমলাদের প্রভাব থেকে দেশকে দখলমুক্ত করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রাইভেট প্র্যাকটিস সম্পূর্ণ বন্ধের ঘোষণা দেন নাহিদ ইসলাম। তবে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের মাধ্যমে বৈকালিক সেবা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা থাকবে বলে জানান তিনি। এছাড়া শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষকদের বেতন ও মর্যাদা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও জানান নাহিদ ইসলাম।

ভাষণে বিগত শাসনামলে পাচার হওয়া প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করে তিনি বলেন, লুণ্ঠনকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা একটি পাবলিক ট্রাস্টের অধীনে জনগণের কল্যাণে ব্যয় করা হবে। এছাড়া ব্যাংক ও উন্নয়ন প্রকল্প থেকে হওয়া বিগত দিনের লুটপাটের বিচার করা হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের গত ১৮ মাসের কর্মকাণ্ড এবং নাম উল্লেখ না করে একটি রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, ফ্যাসিবাদের পতনের পর একটি দল রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বে মেতে উঠেছে। জনগণ এই দুর্বৃত্তদের চিনে ফেলেছে।

ভোটারদের প্রতি তিনি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি এনসিপিসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত প্রার্থীদের ভোট দিয়ে চাঁদাবাজি, আধিপত্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানান। এছাড়া দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ভেজাল খাদ্য প্রতিরোধ এবং প্রবাসীদের অভিবাসন খরচ কমানোর বিষয়ে ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথরেখা তুলে ধরেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্ব থেকে আসা এনসিপির এই আহ্বায়ক।