ডিজিএফআই ও র‌্যাব বিলুপ্ত চান সাবেক সেনাপ্রধান 

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেছেন, তিনি দায়িত্ব পালনকালে জানতে পেরেছিলেন যে, সামরিক গোয়েন্দা শাখা ডিজিএফআইর (প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর) অফিসে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’র কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ভিজিটে আসত এবং একটি কক্ষে তাদের কাজ করতে দেওয়া হতো। গতকাল সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি র‌্যাব থেকে সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ফিরিয়ে আনা এবং র‌্যাব ও ডিজিএফআই’র বিলুপ্ত করা হোক বলে মন্তব্য করেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম-খুনের অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে গতকাল দ্বিতীয় দিনের মতো সাক্ষ্য দেন ইকবাল করিম ভূঁইয়া। জবানবন্দি শেষে তাকে জেরা শুরু করেন আসামির আইনজীবী আমিনুল গনি টিটু। আংশিক জেরা শেষে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী জেরার দিন ধার্য করে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত ট্রাইব্যুনাল। এর আগে গত রবিবার প্রথম দিনের জবানবন্দি দেন এ মামলার প্রথম সাক্ষী ইকবাল করিম ভূঁইয়া।

গতকাল জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ‘আমি আমার দায়িত্ব পালনকালে জানতে পারি যে, মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিকের ছত্রছায়ায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর কিছু ব্যক্তি নিয়মিত ডিজিএফআইর অফিস ভিজিট করে এবং সেখানে যে সাতটি মিটিং রুম ছিল তার একটিতে তাদের কাজ করতে দেওয়া হতো। তারা বিভিন্ন সময় কিছু ব্যক্তিকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করে তার তালিকা ডিজিএফআই’র হাতে দিত। তবে ডিজিএফআই এ তালিকার কোনো কার্যকরী ব্যবস্থা নিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই।’

ইকবাল করিম বলেন, একজন কনিষ্ঠ অফিসার র‌্যাব থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমার অফিসে আসেন। র‌্যাব থেকে যারা ফিরে আসত তাদের আমি প্রথম প্রশ্ন করতাম যে তারা কতজন মানুষ হত্যা করেছে? এই অফিসারকে আমি একই প্রশ্ন করেছিলাম। সে উত্তরে বলল ছয়জন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ছয়জনকে কি তুমি সরাসরি হত্যা করেছে? উত্তরে সে বলল দুজনকে সে সরাসরি হত্যা করেছে এবং বাকি চারজনকে হত্যার সময় সে সেখানে উপস্থিত ছিল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম প্রতি হত্যার জন্য কত টাকা করে পেয়েছ? উত্তরে সে বলল দশ হাজার। আমি বললাম টাকা দিয়ে কি করেছ? টাকাগুলো সে গ্রামের মসজিদে অনুদান হিসেবে দিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় ঘটনাতে একজন লে. কর্নেল আমার সঙ্গে সাক্ষাতে আসেন। আমি তাকেও জিজ্ঞাসা করি কয়জনকে হত্যা করেছে? সে বলল ছয়জন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কেন করেছ? সে বলল ঊর্ধ্বতন অফিসারের আদেশ পালন করেছি।’

সাক্ষী ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি শুনেছি র‌্যাব যাদেরকে হত্যা করতো তাদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ইট পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো।’ তিনি বলেন, ‘র‌্যাবের এসব কর্মকাণ্ড দেখে আমি বিভিন্ন ডিভিশন এবং প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ভিজিট করতে থাকি এবং অফিসারদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে মোটিভেট করতে শুরু করি। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর যত কমান্ডিং অফিসার আছে তাদের ঢাকায় এনে জুনিয়র অফিসারদের প্রতি তাদের কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করি। তাদের স্মরণ করিয়ে দেই শেখ মুজিব এবং জিয়া হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ততার কারণে অনেক অফিসারের ফাঁসি হয়েছে। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় আরও কিছু সামরিক অফিসার ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে হাজতবাস করছে।’

তিনি বলেন, ‘এত কিছুর পরও যখন বুঝতে পারি ক্রসফায়ার থামছে না, তখন আমি ডিজিএফআই, বিজিবি এবং র‌্যাব থেকে অফিসার নিয়ে আসা ও পোস্টিং বন্ধ করে দিই। আমাকে অনেকে মনে করিয়ে দেন যে আমি যা করছি, তা বিদ্রোহের শামিল। আমার উত্তর একটাই ছিল যে হাশরের ময়দানে আমাকে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। পোস্টিং বন্ধ করার প্রতিক্রিয়াও ছিল মারাত্মক। আমি প্রতিনিয়ত অফিসার পোস্টিং করার জন্য টেলিফোন পেতে থাকি। একসময় র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ আমার অফিসে আসেন এবং র‌্যাব অফিসার দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান। তাকে কোনো কথা দিইনি।’

ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, ‘র‌্যাবের কর্মকাণ্ডের কারণে আমার দায়িত্বকালীন সময়টি ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। কিছু করতে না পারার বেদনা আমাকে সব সময় আচ্ছন্ন করে রাখত। আজ সুযোগ এসেছে সেই করতে না পারার কাজটি সম্পন্ন করার। অনেকেই ভাবছেন আমি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। এ ব্যাপারে আমার ব্যাখ্যা হলো আমরা যতই অস্বীকার করার চেষ্টা করিনা কেন সেনাবাহিনী কলুষিত হয়েছে। আমাদের উচিত হবে না, আমাদের আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ এসেছে তা হেলায় হারানো। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুন্ন হবে না, বরং সেনাবাহিনী গৌরবের উচ্চ শিখরে আসীন হবে।’

জবানবন্দির শেষ দিকে তিনি বলেন, ‘আমি চাই র‌্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার এবং সেটি সম্ভব না হলে সামরিক সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত। আমি আরও চাই ডিজিএফআইও বিলুপ্ত করা হোক। কারণ এই সংস্থাটি আয়না ঘরের মতো অপসংস্কৃতির জন্ম দেওয়ার পরে টিকে থাকার বৈধতা হারিয়েছে।’