দরজায় কড়া নাড়ছে ভোট। শেষ সময়ের প্রচারে ব্যস্ত প্রার্থীরা। কে জিতবেন, কে হারবেন অথবা কোন দল সরকার গঠন করছে কিংবা কোন দল বসছে বিরোধীদলীয় আসনেÑ চলছে তার হিসাব-নিকাশ। কে কত শতাংশ ভোট পেতে পারেন তারও চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে ভোটের মাঠে। তবে ঢাকা -৫ আসনে ভোট হচ্ছে একটু ভিন্ন আমেজে। এ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
জামায়াত নেতারা বলছেন, দলের প্রধান হওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেলে ডা. শফিক হতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলে তিনি হবেন বিরোধীদলীয় নেতা। এজন্য এ আসনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে তাদের দল। তাদের প্রত্যাশা ডা. শফিকের মতো পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ এ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়লাভ করবেন। এ আসনের নেতৃত্বে সারা দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করবে জামায়াত।
অন্যদিকে প্রধান প্রতিপক্ষের দলনেতাকে হারাতে কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। গত রবিবার দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ আসনে জনসভা করে মিল্টনকে জয়ী করার আহ্বান জানিয়েছেন। বিএনপির নেতাকর্মীরাও আটঘাট বেঁধে প্রচার চালাচ্ছেন।
গতকাল মিরপুরের কাফরুল ১০ নম্বর গোল চত্বর, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া ঘুরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। সর্বত্রই ভোটের আলোচনা। নিজ আসনের পাশাপাশি দেশের অন্য আলোচিত আসনগুলোও চলে আসছে চায়ের টেবিলে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা মন্ত্রী কে হবেনÑ সেই আলোচনাও করছেন কেউ কেউ। বেশিরভাগ মানুষই নিরপেক্ষ হিসেবে আলোচনা করছেন। অনেকে মার্কা বা নেতার পক্ষেও কথা বলছেন।
এলাকা জুড়ে জামায়াত আমিরের দাঁড়িপাল্লা মার্কার ফেস্টুনসহ নানা প্রতিকৃতি দেখা গেছে। মিল্টনের ধানের শীষের প্রচারও চোখে পড়ার মতো। শেওড়াপাড়ায় চায়ের দোকানে কথা হয় ব্যবসায়ী আলমাছ উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন হলেই বোঝা যাবে কে জেতে, কে হারে। এখন এগুলো নিয়ে আলাপ করে লাভ নেই। আজকে বলব ওমুক জিতবে, ১৩ তারিখই আমার দোকানে হামলা হবে। এর দায়ভার কি আপনি নেবেন?’
কাজীপাড়া মীনাবাজারের পাশের গলিতে কথা হয় গৃহিণী খাইরুন নাহারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সবাই প্রতিশ্রুতি দেয় কিন্তু বাস্তবায়ন করে না। সবাইকেই তো দেখলাম, এবার জামায়াতের আমিরকে ভোট দেব। দেখি তিনি কী করেন।’ তার পাশে থাকা আরেক কর্মজীবী নারী শাহান আরা বলেন, ‘নারীদের নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে জামায়াত। আমাদের বাচ্চা আছে, যদি কাজের সময় কিছুটা কমে, এটা আমাদের জন্য ভালো হবে।’
কাফরুলে চায়ের দোকানদার মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘পাকিস্তান আমলের দল জামায়াত। যুদ্ধের সময় অনেক কিছু করেছে। এগুলো এখনকার ছেলেমেয়েরা দেখেনি বা মনে নেই। ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে আমরা অবশ্যই সব বিষয় চিন্তা করব।’ তার দোকানে বসে থাকা এক খরিদ্দার বলেন, ‘সব প্রার্থীই ভালো। যেই জিতুক, এলাকার উন্নয়ন হবে। আমরা ভালো থাকলেই হলো।’
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি সংস্থা ‘সোচ্চার’ ঢাকা-১৫সহ চারটি আসনের জরিপের ফল প্রকাশ করেছে। এতে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানকে ৩৯ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে চান বলে জানিয়েছেন। আর বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মিল্টনকে ভোট দিতে চান ৩০ শতাংশ ভোটার। ১২ দশমিক ১ শতাংশ তাদের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করতে চাননি এবং ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেননি।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪, ১৩, ১৪ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ড (মিরপুর-কাফরুল) নিয়ে ঢাকা-১৫ আসন গঠিত। তালতলা, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, কাফরুল, মিরপুর ১০, মিরপুর ১৪, কচুক্ষেত ও পূর্ব সেনপাড়াসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এ আসনে পড়েছে। এ আসনের ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫১ হাজার ৭১৮ জন, যার মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৭২ হাজার ৯০২ জন। অর্থাৎ, মোট ভোটের প্রায় ৪৯ শতাংশ নারী।
নারীদের প্রাধান্য দিয়ে প্রচার চালাচ্ছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে নারী ভোটারদের মধ্যে বিরোধীপক্ষের কোনো ‘অপপ্রচার’ যাতে প্রভাব বিস্তার না করতে পারে, সেই লক্ষ্যে নারীদের নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনা করেছে দলটি। বাড়ি বাড়ি গিয়ে আমিরের পক্ষে ভোট চাইছেন মহিলা জামায়াত ও ছাত্রীসংস্থার নেতাকর্মীরা। প্রতিটি ওয়ার্ডে নারী-পুরুষ কর্মীদের নিয়ে আলাদা টিম করে ভোট চাওয়া হচ্ছে। নারী কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতে গিয়ে হেনস্তার শিকার হলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায় জামায়াত। এরই মধ্যে একাধিকবার নারী কর্মীরা রাস্তায় নেমে মিরপুরে মিছিলও করেছেন।
ঢাকা-১৫ আসনে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোটের নেতারা। এজন্য সারা দেশের নির্বাচনী প্রচার শুরু করা হয় মিরপুর থেকে। ২২ জানুয়ারি বিকেলে মিরপুর ১০ নম্বর আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জোটের শরিক দল জাগপার সহসভাপতি রাশেদ খান বলেন, ‘সারা দেশের মানুষ ভোট দেবে এমপি নির্বাচিত করতে আর এই এলাকার মানুষ ভোট দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করবেন।’ ওইদিন থেকে পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, দিনাজপুর, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, কুমিল্লা ও রাজশাহীসহ সারা দেশে নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দিচ্ছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচটি জনসভা করেছেন তিনি।
তবে দেশের যে প্রান্তেই জনসভা করেন না কেন, সন্ধ্যার পর নেতাকর্মীদের নিয়ে মিরপুর চলে যান ডা. শফিক। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ছোট ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে তার সখ্য এরই মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশেষ গুরুত্ব তৈরি করেছে। তার প্রচারের সময় নারীদের সরব উপস্থিতি ও আগ্রহ লক্ষ করা গেছে।
গতকাল সোমবার নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার শেষ দিনে ঢাকার বিভিন্ন আসনে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন ডা. শফিক। বিকেলে ঢাকা-১৫ আসনে নেতাকর্মীদের নিয়ে বড় শোডাউন করেছে জামায়াত। দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে ঢাকসু ভিপি সাদিক কায়েকমসহ জনপ্রিয় নেতারা অংশ নেন।
এ আসনে কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি শিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলাম নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছেন। আলাপকালে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। নারী, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ সবার মাঝে ডা. শফিকুর রহমানকে নিয়ে বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়েছে। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত এ আগ্রহ বলে দিচ্ছে ফল কী হবে।’
তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় নাগরিক সমস্যাগুলো অবহেলিত। পরিকল্পনার অভাব ও দায়িত্বহীনতার কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে পরিচালিত একটি সরকারই এসব সংকট থেকে মানুষকে মুক্তি দিতে পারে। ড্রেনেজ সমস্যা, জলবদ্ধতা, গ্যাস সংকট, সংকীর্ণ রাস্তা ও অব্যবস্থাপনার মতো প্রতিটি সমস্যাকে ধরে ধরে আইডেন্টিফাই করে ইনশাআল্লাহ ডা. শফিকুর রহমান সমাধান করবেন।’
দেশের অন্য এলাকার মতো দীর্ঘদিন ধরে এ আসনেও বিএনপি-জামায়াত জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচন করেছিলেন। তবে নিবন্ধন না থাকায় বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন। আওয়ামী লীগের অধীনে হওয়া সেই নির্বাচনে তৎকালীন সরকারদলীয় প্রার্থী কামাল আহমেদ মজুমদারের কাছে পরাজিত হন।
অন্যদিকে শফিকুল মিল্টন যুবদলের মহানগর নেতা। তিনি সম্প্রতি এক প্রচারণায় অংশ নিয়ে বলেছেন, ‘ডা. শফিকুর রহমান একসময় এ আসনে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করেছেন। তখন আমরা তার পক্ষে ভোট চেয়েছি। কিন্তু এবার হিসাব ভিন্ন, বিএনপির ভোট না পেলে তাদের কী অবস্থা হয় সেটা ১২ তারিখ প্রমাণ হবে।’
জামায়াতের আমিরের বিপক্ষে লড়ে চাপ অনুভব করছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি বিএনপির পক্ষ থেকে লড়ছি। কোনো চাপ বোধ করছি না। আমি মিরপুরের সন্তান। আমি আশা করছি এলাকাবাসী তাদের এলাকার সন্তানকে ভোট দেবেন। এ আসনের বাসিন্দারা নিরাপদে থাকবে। নারীরা নিরাপদে থাকবে।’
বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা এলাকার মানুষদের সঙ্গে পরিচিত এবং সেই কারণে তাদের প্রার্থী শফিকুল মিল্টন কিছুটা সুবিধা পেয়েছেন। কাফরুল এলাকার বাসিন্দা ও বিএনপি কর্মী আলী আকবর বলেন, ‘শফিকুল ভাইয়ের জন্মস্থান এই এলাকা। ভোটারারা সাধারণত নিজেদের সন্তান রেখে অন্যদের ভোট দেন না।’
জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলছেন, ডা. শফিকুর রহমান অভিজ্ঞ ও স্বচ্ছ চরিত্রের মানুষ। তিনি শুধু মিরপুর নয়, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেরও মন জয় করেছেন। মিরপুরের মানুষ যোগ্য প্রার্থী চিনতে ভুল করবে না।