সোমবার দুপুর ১টা। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের সামনে বাজছে একটি মাইক। তাতে চলছে ঢাকা-১৩ আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের প্রচার। পাঁচ থেকে সাত মিনিট পর একই স্থানে এসে যোগ হয় ধানের শীষের প্রার্থী ববি হাজ্জাজের প্রচার মাইক। উভয় মাইক থেকেই ভোট চাওয়া হচ্ছে ভোটারদের কাছে।
অথচ নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন আচরণ বিধিমালায় (২০২৫) প্রচারে মাইক, সাউন্ড সিস্টেম ও লাউডস্পিকারের ব্যবহার দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এতে বলা আছে, শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্রে মাত্রা ৬০ ডেসিবলের বেশি হতে পারবে না।
এদিন বিকেল সাড়ে ৪টায় একই স্থানে পথসভা করেন একই আসনের গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী খালেকুজ্জামান লিপন। তিনি অভিযোগ করেন, প্রার্থীরা প্রকাশ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। ২২ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সাতটি ওয়ার্ডে তিনি প্রচারণা চালিয়েছেন। কিন্তু একটি ম্যাজিস্ট্রেট টিমও চোখে পড়েনি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, মাঠে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী ম্যাজিস্ট্রেটদের কাজ কী? আইন লঙ্ঘন চোখে পড়লে তারা নিজেরাই কেন ব্যবস্থা নেবেন না?
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে প্রচার আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টায় শেষ হচ্ছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারে প্রায় সব প্রার্থীই কোনো না কোনোভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন। সংস্থাটি বলছে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়গুলো দেখলেও নির্বাচন কমিশন সক্ষমতার ঘাটতি থাকায় বিষয়গুলো এড়িয়ে যাচ্ছে। টিআইবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা জানায়।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনলাইন ও অফলাইন প্রচারসহ নির্বাচনের প্রায় প্রতিটি স্তরে দল এবং প্রার্থীরা আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘনসহ বিবিধ অনিয়ম করেছে। নির্বাচন কমিশন সক্ষমতার ঘাটতির কারণে এড়িয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেমন মেটা বা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে পর্যাপ্ত সমন্বয় করা হয়নি। প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রার্থীরা প্রচার চালালেও সেই বিতর্কিত কনটেন্টগুলো সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে না, কারণ এখানে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ জড়িত।
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধিমালা ২০২৫-এর ৬ ধারায় জনদুর্ভোগ সৃষ্টিকারী যেকোনো সভা-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এতে বলা হয়, জনগণের চলাচলে বিঘœ সৃষ্টি করতে পারেÑ এমন কোনো স্থান, সড়ক, মহাসড়ক ও জনপথে জনসভা, পথসভা কিংবা অন্য কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ করা যাবে না। একই নিষেধাজ্ঞা প্রার্থী ও দলের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে গত শুক্রবার আয়োজিত কর্মসূচিতে সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। গুরুতর আহত হন ঢাকা-১৮ আসনের প্রার্থী মহিউদ্দিন রনি। একই কর্মসূচিতে অংশ নেন ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এ ঘটনায় দুই প্রার্থীর বিরুদ্ধেই আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে।
ঢাকার বাইরেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ মিলছে। লক্ষ্মীপুর-৩ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ড. রেজাউল করিমকে নির্ধারিত সময়ের আগে প্রচার চালানো, ভোটারের কাছে নগদ অর্থ বিতরণ এবং ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার আশ্বাসের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় কঠোরভাবে সতর্ক করেছে নির্বাচন কমিশন।
গাজীপুর-৫ সংসদীয় আসনের কালীগঞ্জে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে বিএনপি প্রার্থীর এক প্রতিনিধি ফরিদ মৃধাকে জরিমানা করে উপজেলা প্রশাসন। স্কুলের মাঠে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবার আড়ালে এবং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে নির্বাচনী প্রচার চালানোর অভিযোগে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জাকিয়া সরওয়ার লিমা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।
নোয়াখালী-২ সেনবাগের কাবিলপুর ইউনিয়নের দিলদার মার্কেট এবং সেনবাগ থানার সামনে গত রবিবার বিএনপির প্রার্থী জয়নুল আবদিন ফারুক এবং স্বতন্ত্র কাপ-পিরিচ প্রতীকের প্রার্থী কাজী মফিজুর রহমানের কর্মী-সমর্থকরা সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় জড়ায়। এ সময় দুপক্ষের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে
সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের বাইরেও আইন লঙ্ঘনের গুরুতর ঘটনা ঘটেছে। ঋণখেলাপি প্রার্থী ও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও অনেকের মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা স্পষ্টভাবে আইন পরিপন্থী।
নির্ধারিত মানদন্ড পূরণ না করা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব দিয়েছে, এমন অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এসব পর্যবেক্ষকের বিষয়ে যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্ন আছে।
সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। নির্বাচনের অংশ হিসেবে মিছিল, সভা-সমাবেশ ও বক্তব্য পাল্টা বক্তব্য হওয়াটা স্বাভাবিক। তবে সবকিছু শালীনতার পর্যায়ে আছে।
কমিশনের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা নজরদারি কার্যকর রয়েছে, এমন দাবি করে তিনি কোনো ধরনের অভিযোগ নজরে এলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে অনুরোধ জানান।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মাসব্যাপী অভিযানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ৪৬১টি ঘটনা চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে ২৫৯টি ঘটনায় সরাসরি মামলা করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
প্রচার শেষ : ইসি বলছে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৭৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভোটগ্রহণ শুরুর পূর্ববর্তী ৪৮ ঘণ্টা এবং ভোটগ্রহণ সমাপ্তির পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা সব ধরনের জনসভা, মিছিল ও শোভাযাত্রা নিষিদ্ধ থাকবে। আজ ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে।