অবশেষে স্থগিত হলো চট্টগ্রাম বন্দরের অনির্দিষ্টকালের শ্রমিক-কর্মচারী ধর্মঘট। আসন্ন রমজান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে এবং অন্তর্বর্তী সরকার এনসিটি চুক্তি থেকে সরে আসায় কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির ও ইব্রাহিম খোকন স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ ঘোষণা দেওয়া হয়। এদিকে এ ঘোষণার পরপরই চট্টগ্রাম বন্দরের সব কার্যক্রম গতকাল সকাল ৮টা থেকে সচল ছিল। আন্দোলন কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা দিয়ে বন্দর সচল করার পর এবার আটক করা হলো বন্দর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির অন্যতম সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকনকে। এর আগে গত রবিবার পাঁচজনকে আটক করা হয়েছিল।
ইব্রাহিম খোকনকে আটকের কথা স্বীকার করে মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার আমিনুর রশিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাকে র্যাবের একটি দল বন্দর এলাকা থেকে আটক করে বন্দর থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে। পুলিশ ইব্রাহিম খোকনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে দেখছে।
এদিকে এ আটকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এএম নাজিম উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহা, শ্রম সংস্কার কমিশনের সদস্য তপন দত্ত, স্কপ চট্টগ্রাম জেলার সমন্বয়ক এস কে খোদা তোতনসহ বিভিন্ন নেতা এর প্রতিবাদ জানান। বিবৃতিতে নেতারা বলেন, প্রশাসন শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ পরিহার করে বারবার শ্রমিকদের সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। গতকাল (রবিবার) বন্দরের পাঁচজন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আর আজ (গতকাল) সোমবার আবার ইব্রাহিম খোকনকে আটক করে প্রশাসন পরিকল্পিতভাবে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার উসকানিতে লিপ্ত হয়েছে।
এর আগে গতকাল সকাল থেকে বন্দরের জেটিতে জাহাজ ভেড়া এবং জাহাজ থেকে পণ্য নামানো ও জাহাজে পণ্য ওঠানোর সব কাজই হয়েছে। এ ছাড়া বহির্নোঙরেও মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে ছোট জাহাজে পণ্য খালাস কার্যক্রম হয়েছে। বন্দরের বিভিন্ন গেট দিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও লরির চলাচল ছিল খুব বেশি। এতে বন্দরকেন্দ্রিক এলাকা জুড়ে দীর্ঘ যানজটেরও সৃষ্টি হয়। এর আগে গত রবিবার মধ্যরাতের পর বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করেন, সরকারের নৌ উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন ও বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এনসিটি টার্মিনাল ইজারা নিয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। এ সরকারের সময়ে আর চুক্তি হচ্ছে না। এতে আমরাও আমাদের কর্মসূচি থেকে সরে এসেছি। তবে আমাদের যেসব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সেগুলো প্রত্যাহার করে নিতে হবে। এজন্য আমরা ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত করেছি। ১৬ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি জানানো হবে।
এদিকে এনসিটি টার্মিনাল ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে গত সপ্তাহের পুরোটা সময় ছিল আন্দোলন। শনিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বন্ধ ছিল বন্দরের সব ধরনের কার্যক্রম। গত মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টা কর্মসূচির পর বুধবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচির পর শুক্র ও শনিবার স্থগিত রেখে রবিবার থেকে আবারও অনির্দিষ্টকালের কর্মসূচি দিয়েছিল বন্দর রক্ষা পরিষদ। আন্দোলনকারীরা চার দফা দাবিতে এ কর্মসূচি দিয়েছিল। গত রবিবার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এ সরকার এনসিটি টার্মিনাল ইজারা চুক্তি করছে না। কিন্তু এ সময়ের মধ্যে আন্দোলনকারী ১৫ নেতাকর্মীকে মোংলা ও পায়রা বন্দরে বদলি করা হয়। তাদের মধ্যে ১৪ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এবং তাদের নামে থাকা বরাদ্দকৃত বাসাও বাতিল করা হয়। আবার পাঁচজনকে পুুলিশ আটক করে মামলাও দিয়েছে। এখন শ্রমিকদের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে সব শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রমজানের নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অনেক পণ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে পারবে না। এতে বিশাল ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে বলে ব্যবসায়ী নেতারা দফায় দফায় সরকারের কাছে অনুরোধ করেছেন বিষয়টি সমাধানের জন্য।