আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার ক্ষণগণনা। এরপরই সেই প্রত্যাশিত মুহূর্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। এ নির্বাচন সামনে রেখে গতকাল মঙ্গলবার কর্মব্যস্ত সময় পার করেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আনুষ্ঠানিক প্রচার না থাকলেও সকাল থেকে গুলশানের নিজ বাসভবনে বসে সারা দেশের নির্বাচনী খোঁজখবর নিয়েছেন তিনি। কথা বলেছেন কয়েকজন প্রার্থীর সঙ্গে। এ ছাড়া দুপুরে গুলশান কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ও নিজ নির্বাচনী আসন ঢাকা-১৭-এর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির নেতাদের সঙ্গেও কথা বলেছেন। গতরাতে গুলশানে রাজনৈতিক কার্যালয়ে নির্বাচনের সার্বিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক দিন পর নির্বাচন। সারা দেশের মানুষ মুখিয়ে আছে ভোট দেওয়ার জন্য। উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিএনপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে। জয়ের বিষয়ে আমরা শতভাগ আশাবাদী।’
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির নেতারা জানান, তারেক রহমান গতকাল দলীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এবং নিজ সংসদীয় আসনের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়কারী ও দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা আব্দুস সালামসহ সংশ্লিষ্ট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।
বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ও চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত দুদিন রাজধানী ঢাকায় নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন চেয়ারম্যান। শেষ করেছেন শেরেবাংলা নগরে বাবা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারতের মাধ্যমে। প্রচারে ব্যস্ত থাকার কারণে কার্যালয়ে বসতে পারেননি। আজকে (গতকাল) নির্বাচন পরিচালনা কমিটির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। নজরুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলকে নির্বাচন কমিশনে পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া সারা দেশে নির্বাচনী পরিবেশের খোঁজখবর নিয়েছেন।
তিনি বলেন, ১৭ বছর গুম, খুন, জেল, জুলুমের পর আগামী দিনে সুদিনের প্রত্যাশা নেতাকর্মীদের। নির্বাচনে দেশের জনগণ বিএনপিকে ভোট দিয়ে বিজয়ী করবে বলে আমাদের আশা। নির্বাচনে বিজয়ী হলে চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হবেন। বাবা-মায়ের মতো তিনিও সফল হবেন বলে আশা করছি।
এদিকে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান দেশ রূপান্তরকে জানান, বিএনপি চেয়ারম্যান গুলশান ২ নম্বরে গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকালে ভোট দেবেন। এরপর তিনি রাজধানীর কয়েকটি আসনের কেন্দ্র পরিদর্শনে যেতে পারেন।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, ৩০০ আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করবে বিএনপি। এর মাধ্যমে শুধু বিএনপি নয়, সারা দেশের মানুষ একটি সুন্দর আগামীর শুভসূচনা করবেন। এদিকে জয়লাভের আশা করলেও নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে এমন অভিযোগ করে সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক করেছেন দলটির চেয়ারম্যান। নেতাকর্মীদের ভোট দিয়ে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত ভোট কেন্দ্রে থেকে ফল বুঝে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।
২৯২টি আসনে বিএনপির প্রার্থীরা এবার ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের মধ্যে ৮৫ জনেরই ইতিপূর্বে সংসদ সদস্য হিসেবে জনগণের জন্য কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ ছাড়া বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে ১৯ জন এর আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেছেন।
গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের পথযাত্রায় বিএনপির ভূমিকা, অবদান ও প্রত্যাশার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১৬ বছরের স্বৈরাচারী দুঃশাসনকে চূর্ণ করে, চব্বিশের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের জনগণ আবারও মুক্তির স্বাদ পায়, গণতন্ত্রের পথ সুগম করে। অসংখ্য ব্যক্তি ও পরিবার রয়েছে, যাদের বছরের পর বছর ধরে ত্যাগের মহিমায় আমরা ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ পেয়েছি। জুলাই গণহত্যায় ১৩ আগস্ট পর্যন্ত সমগ্র বাংলাদেশে শহীদ হয়েছেন ৮৭৫ জন মানুষ, যার মধ্যে কমপক্ষে ৪২২ জন বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। দেশ জুড়ে শহীদ হওয়া সব শ্রেণি-পেশা-রাজনীতির মানুষগুলোর এ বিশাল অংশ যে বিএনপিরই নেতাকর্মী, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বরং আমাদের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের অনিবার্য ফল।’
তিনি বলেন, ‘বিজয়ের পেছনে রয়েছে অসংখ্য নির্যাতিত মানুষের বেদনার অপ্রকাশিত ইতিহাস। গুম হওয়া ছেলের ফেরার প্রতীক্ষায় ব্যথাতুর মায়ের ডাক, স্বামী হারানো বেদনাবিধুর স্ত্রীর অনন্ত আর্তনাদ, পঙ্গু বাবার জন্য সন্তানের হৃদয়বিদারক হাহাকার, আর কারাগারে বন্দি ভাইয়ের জন্য বোনের নীরব প্রার্থনা। তাদের সবার ১৬ বছরের রক্ত, শ্রম ও অশ্রু দিয়ে; প্রতিটি পরিবারের ক্ষোভ, ক্রোধ ও অব্যক্ত বিস্ফোরণ বুকে ধারণ করে; চলমান ছিল শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই।’
বিএনপি নেতারা বলেন, সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। মিথ্যা মামলায় কারাগারে নেওয়ার পর তিনি অসুস্থ হলে তাকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। বরং তাকে স্লো পয়জনিং করা হয়েছে। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত তাকে কষ্ট করতে হয়েছে।
দলটির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনগণের মতামতের প্রতিফলন পেতে সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। ভোটের ফল যাতে কেউ পাল্টে ফেলতে না পারে, সেজন্য কেন্দ্রে যারা এজেন্ট থাকবে তাদের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর করা রেজাল্ট সিট নিয়ে কেন্দ্র থেকে বের হবেন তারা।’
ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আশঙ্কায় বিএনপি নানা ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করছে। দলটির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছে। নির্বাচনের দিন বোরকা পরে ভুয়া ভোটার পাঠাতে পারে প্রতিপক্ষ। এজন্য নারী এজেন্টদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কেউ যাতে বেশি ব্যালট ব্যাক্সে ফেলতে না পারে, সেজন্য সতর্ক করা হচ্ছে এজেন্টদের। ব্যালট পেপার বইয়ের হিসাব রাখার জন্য বলা হচ্ছে। ভোট শেষে রেজাল্ট সিট নিয়ে এজেন্টদের বের হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ফলাফল পাল্টে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া আগের রাতে ব্যালট কেটে বাক্স ভরেছিল আওয়ামী লীগ। ব্যালট বাক্স কেন্দ্রে আসার পর তা খালি কি না, তা পরীক্ষা করবে বিএনপির প্রার্থীর এজেন্টরা।’