নতুন সরকারের যত চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে নিতে আগামী সরকারকে একাধিক কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। শিল্প ও ব্যবসা সচল করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাত সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোসহ আর্থিক খাতের নানা বিষয়কে ভবিষ্যতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন অর্থ উপদেষ্টা।

গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব চ্যালেঞ্জের কথা জানান তিনি।

অর্থ উপদেষ্টা বলেন, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অর্থনীতিকে কার্যকরভাবে চালু (অ্যাক্টিভেট) করা। ব্যবসা ও শিল্প খাত সচল না হলে কর্মসংস্থান হবে না। আর কর্মসংস্থান না হলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে না। কারণ বাংলাদেশের শিল্পভিত্তি এখনো দুর্বল। দেশটি এখনো সীমিত কয়েকটি রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভরশীল। হংকং বা সিঙ্গাপুরের মতো মডেলে বাংলাদেশ এগোতে পারবে না, বরং দেশীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) শক্তিশালী করাই বাস্তবসম্মত পথ।

পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি এখনো একটি বড় চাপ বলে মনে করেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, শুধু মুদ্রানীতির মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। সরবরাহ ব্যবস্থা, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য ও বাজার ব্যবস্থাপনাসহ সবকিছু মিলিয়েই মূল্যস্ফীতি একটি বহুমাত্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি, কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত নীতির ওপর নির্ভরশীল।

ব্যাংকিং খাতকে সবচেয়ে জটিল ও কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করেন অর্থ উপদেষ্টা। তার ভাষায়, খেলাপি ঋণ, দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও আস্থাহীনতার কারণে এখনো ব্যাংক খাত পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে আমানতের প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে, তবে ঋণ বিতরণ এখনো কম। মানুষের আস্থা পুরোপুরি ফেরেনি।

এর পরই পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট উন্নয়নে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, ব্যাংকনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট উন্নয়ন অপরিহার্য। ব্যবসা-বাণিজ্য শুধু ব্যাংকের ঋণের ওপর নির্ভর করে টেকসই হতে পারে না। কারণ পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা, আদালতকেন্দ্রিক জটিলতা ও নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতার কারণে সংস্কার কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কার্যকর করাকে আগামী সরকারের চ্যালেঞ্জগুলোর একটি বলেও মন্তব্য করেন অর্থ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, যদিও কিছু কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে, তবে নীতিগত সংস্কার পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। করনীতি নিয়ে একটি গাইডলাইন রিপোর্ট রেখে যাওয়া হচ্ছে, যা পরবর্তী সরকার ব্যবহার করতে পারবে।

তবে জ্বালানি খাতকে ভবিষ্যতের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। উপদেষ্টা বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, অফশোর ড্রিলিং এবং বিকল্প জ্বালানি বিশেষ করে সৌরশক্তি উন্নয়নে আরও জোর দিতে হবে। সৌর জ্বালানির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ খাতে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি বলেও জানান তিনি। এছাড়া পাচার করা অর্থ উদ্ধারের প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, কারা, কোন দেশে অর্থপাচার করেছে সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। তবে বিদেশ থেকে অর্থ ফেরত আনার প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ। তিনি বলেন, বেসটা তৈরি হয়েছে। এখন দরকার সরকারি সংস্থা ও এজেন্সিগুলোর মধ্যে সমন্বয়।