সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। সকাল সাড়ে ৭টায় একযোগে ২৯৯ আসনে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে ঢাকাসহ সারা দেশেই নিরাপত্তাব্যূহ রচনা করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারি করা হচ্ছে। কালো টাকার বিস্তার ও ভোট কেনাবেচা প্রতিরোধ করতে পুলিশ সদর দপ্তরসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। টাকা বিলিকারীদের ধরতে প্রতিটি আসনের আনাচে-কানাচে সাদা পোশাকের পুলিশ সক্রিয় রয়েছে।
ইতিমধ্যে সৈয়দপুর, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় জামায়েতে ইসলামীর নেতাসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে সারা দেশে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী সরকারের আমলে কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় এবার নির্বাচনী সহিংসতা বাড়তে পারে। ফলে ইসির সংহত অবস্থান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকরী ভূমিকার বিকল্প নেই। নির্বাচন উপলক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে উৎসবমুখরতা রয়েছে। গত তিনটি নির্বাচনে মানুষ এমন ॥পরিবেশ পায়নি। এ কারণে মানুষ নির্বিঘেœ ভোটকেন্দ্রে যেতে আগ্রহী হলেও নাশকতা-সহিংসতার শঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সারা দেশেই সর্বোচ্চ নিরাপত্তা : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে সহিংসতা ঠেকাতে দেশ জুড়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকরী করতে মাঠে রয়েছেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। নাশকতা ঠেকানোর সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়েছেন তারা। সারা দেশেই মোতায়েন করা হয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের। অন্যসব বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), আনসার, কোস্টগার্ড, র্যাব এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ৯ লাখ ৭০ হাজার ৯৪৮ জন সদস্য মাঠে রয়েছেন। তারা সারা দেশে ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্র ও ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৯ জন ভোটারকে নিরাপত্তা দিচ্ছেন। এর বাইরে বিএনসিসির ১ হাজার ৯২২ ক্যাডেট ও ৪৫ হাজার ৮২০ জন গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার ও দফাদার) মোতায়েন থাকছে।
নির্বাচন ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ৯০ শতাংশ কেন্দ্রে সিসিটিভি দিয়ে ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ২৫ হাজার ভোটকেন্দ্রে বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি চলবে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, ‘নির্বাচনের নিরাপত্তায় পুলিশ ছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী, বিজিবি এবং আনসার বাহিনীর অংশগ্রহণ থাকছে। নির্বাচনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত রয়েছেন প্রায় ৬ লাখ আনসার সদস্য। কোনো ভোটকেন্দ্রে মব-সহিংসতা হলেই ভোট বন্ধ করা হবে। ভোটকে ঘিরে তিন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এবারের ভোট পুলিশের জন্য আস্থা ফেরানোর সুযোগ। ভোটকে কেন্দ্র করে যে কোনো সহিংসতা ঠেকাতে তারা প্রস্তুত।’
বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেছেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় শৈথিল্য বা গাফিলতি গ্রহণযোগ্য হবে না। নাশকতা, সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা দৃঢ়ভাবে প্রতিহত করতে হবে।’
২৯২ আসনে টাকা বিলির তথ্য : পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, গত ২২ দিন ধরে একে অপরকে ঘায়েল করতে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয়। সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়ায়। প্রার্থীদের টাকা খরচের পরিমাণও বেড়ে যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তথ্য রয়েছে ২৯২টি আসনে টাকা বিলি করা হয়েছে। প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকরা গোপনে ভোটারদের টাকা দিয়েছে। তথ্য পেয়ে পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নড়েচড়ে বসেছে, কয়েক দফা বৈঠক করেছেন সংস্থাগুলোর প্রধানরা। যেসব প্রার্থী টাকা বিলি করছেন এবং যারা গ্রহণ করছেন তাদের তালিকা তৈরির পাশাপাশি গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে সব মহানগর পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের কাছে বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। বার্তা পেয়ে তালিকা করার কাজ শেষ করেছে পুলিশের সবকটি ইউনিট। প্রার্থীদের কাছ থেকে যারা টাকা নিয়েছেন বা নেবেন তাদের গ্রেপ্তার করার পাশাপাশি প্রার্থীদের তাৎক্ষণিক সাজা দিতে বলা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতকে সারাক্ষণ সক্রিয় রাখতে বলা হয়েছে।
সব আসনের আনাচে-কানাচে পুলিশ : নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রায় সব আসনেই প্রার্থীরা টাকা বিলি করছেন বলে আমরা তথ্য পেয়েছি। এ ব্যাপারে আমরা নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করেছি। কমিশনও নির্দেশনা দিয়েছে, যারা এসব করছে তাদের আইনের আওতায় নিতে।’ তিনি বলেন, ‘প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার প্রমাণ মিললেই গ্রেপ্তার। যেসব প্রার্থী বা তাদের লোকজন টাকা বিলি করবেন তাদেরও আইনের আওতায় নেওয়া হবে। টাকা নেওয়ার দৃশ্য গোপনে ভিডিও করছে প্রতিটি আসনের আনাচে-কানাচে থাকা আমাদের লোকজন। ভোটের দিন পর্যন্ত এ তৎপরতা চলবে।’
প্রতিটি ভোট কেনা হচ্ছে ১০ হাজার টাকায় : পুলিশের ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘ভোটারদের ৫ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হচ্ছে। অথচ নির্বাচন কমিশন বলেছে, প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ভোটারপ্রতি ১০ টাকা ব্যয় করতে পারবেন প্রার্থীরা। একজন প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয় সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভোটারপ্রতি ব্যয় ১০ টাকা নির্ধারণ করেছিল ইসি। আইনে সর্বোচ্চ নির্বাচনী ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করে দেওয়া থাকলেও বাস্তবে এটি কতটুক মানা হয় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।’
মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধও ঠেকানো যাচ্ছে না : পুলিশসূত্র জানায়, টাকা বিলির বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের পরামর্শে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস বা এমএফএসে (বিকাশ, নগদ, রকেট প্রভৃতি) বিশেষ বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত সোমবার রাত ১২টা থেকে এ নির্দেশনা কার্যকর হয়েছে। ১২ ফেব্রুয়ারি রাত ১১টা ৫৯ মিনিট পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে। ৯৬ ঘণ্টা গ্রাহকরা নির্দিষ্ট কিছু সেবা ব্যবহার করতে পারলেও ক্যাশ-ইন বা ক্যাশ-আউটের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা বন্ধ থাকবে। কালো টাকার দৌরাত্ম্য বন্ধে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আলোকে বাংলাদেশ ব্যাংক, দুদক, এনবিআর, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তারপরও ভিন্ন উপায়ে টাকা লেনদেন হচ্ছে।
বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটরের ব্যবস্থা : আজকের নির্বাচনে ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রার্থী এক হাজার ৭৩২ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৪৯ জন। ঢাকা মহানগরীর ১৩টি সংসদীয় আসনের বিষয়ে গতকাল ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার ও রিটানিং কর্মকর্তা শরফ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন করতে ঢাকা মহানগরীর ১ হাজার ৪শটি কেন্দ্রকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ বা ‘র্ঝুকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’ তিনি জানান, গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে শতভাগ সিসিটিভি ক্যামেরা এবং দায়িত্বরতদের শরীরে বডি ক্যামেরা থাকবে। পুরো নির্বাচনী এলাকায় ৮০ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট এবং পর্যাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ভোট গণনাকেন্দ্রে বিদ্যুৎ বিভ্রাট এড়াতে জেনারেটরের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ে ফল ঘোষণার চেষ্টা করা হবে। নির্বাচনে বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি নেই এবং কেন্দ্রে ভোটারের ব্যাপক উপস্থিতি আশা করা হচ্ছে।
জঙ্গিদের বিষয়ে সতর্ক র্যাব : র্যাব মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, নির্বাচনে জঙ্গি হামলার শঙ্কা দেখছে না র্যাব, তবু সতর্ক রয়েছে। নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও পর্যাপ্ত জনবল রয়েছে। ঝুঁকি তাদের যারা নির্বাচনকে ব্যাহত করবে, জাল ভোট দেওয়ার চেষ্টা করবে এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। সুষ্ঠু এবং সুন্দরভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হবে। নির্বাচনের ফলাফল না মেনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও নাশকতা করলে কঠোর ব্যবস্থা।