ভোটের দিন চলেই এলো! রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী প্রচারে দুই জোটের শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে সময়ের অস্থিরতা ও উত্তেজনা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি নেই নির্বাচনের মাঠে। ফলে লড়াই এখন নতুন সমীকরণে, নতুন স্নায়ুচাপে।
মাঠের লড়াই যত ঘনাচ্ছে, ততই বাড়ছে হিসাব-নিকাশ, জল্পনা-কল্পনা আর রাজনৈতিক তাপমাত্রা।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জয়ী হলে রাষ্ট্রক্ষমতায় তাদের প্রত্যাবর্তন ঘটবে নতুন অধ্যায়ে। আর শফিকুর রহমানের জামায়াত বিজয়ী হলে সেটি হবে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আরেক সূচনা। একদল স্লোগান দিচ্ছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, অন্য দল আহ্বান জানাচ্ছে ‘চলো একসাথে গড়ি বাংলাদেশ’। জাতির সামনে বাংলাদেশের রাজনীতির মোড় ঘোরানো এক সিদ্ধান্তের মুহূর্ত।
কে জিতবে? রাজনীতির আকাশে ভবিষ্যদ্বাণীর মেঘ ততই ঘন হচ্ছে। তবে এ ভবিষ্যদ্বাণী করতে জ্যোতিষীর দরকার নেই বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসই যথেষ্ট। সিলেটের ছেলে বা জামাই, স্ত্রী চিকিৎসক, মেয়ের বাবা আর নামের শেষে অবধারিতভাবে ‘রহমান’, এই চার সূত্র মিললেই দেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী কে হতে পারেন, তা নিয়ে এখন আড্ডা থেকে ফেসবুক স্ট্যাটাস, সবখানেই আলোচনা।
তারেক রহমান নাকি শফিকুর রহমান?
জাতীয় সংসদ নির্বাচন এসে দাঁড়িয়েছে এক অদ্ভুত সমাপতনে। রাজনীতির ময়দানে মুখোমুখি দুই প্রধান শক্তি বিএনপি ও জামায়াত আর দুই শীর্ষ কাণ্ডারির নামের শেষ শব্দ একই রহমান। প্রশ্নটা তাই এখন আর ‘কে জিতবে’ নয়; প্রশ্নটা হয়ে উঠেছে সরকারপ্রধান হচ্ছেন কোন রহমান?
ইতিহাসের পাতায় ‘রহমান’ অধ্যায় : বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর গত পাঁচ দশকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে যারা ছিলেন, তাদের পথ ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কেউ রাষ্ট্রপতি, কেউ প্রধানমন্ত্রী, কেউ প্রধান উপদেষ্টা, কেউ আবার সামরিক শাসনের মাধ্যমে ক্ষমতায়। কিন্তু আশ্চর্য মিল রাষ্ট্রক্ষমতার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই পুরুষের নামের শেষ উপাধিই রহমান।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি। সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে রাষ্ট্রপতি শাসন, দুই ব্যবস্থারই কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকলেও প্রবাসী সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের সরকারপ্রধান। শাসনব্যবস্থার নানান ঘটনায় এখন সেই দল আওয়ামী লীগ কার্যত নিষিদ্ধ ও নির্বাসিত।
অন্যদিকে ১৯৭৫ সালের রক্তাক্ত রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে রাজনীতির কেন্দ্রস্থলে উঠে আসেন জিয়াউর রহমান। সামরিক অভ্যুত্থান থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়। আজ সেই উত্তরাধিকার বহন করছেন তার পুত্র তারেক রহমান, যিনি এখন প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে আলোচনার শীর্ষে।
ভোটের আগের দিনের বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস ইঙ্গিত দিচ্ছে ক্ষমতার চূড়ান্ত উচ্চতায় পৌঁছাতে হলে নামের শেষে ‘রহমান’ থাকা এক ধরনের অলিখিত শর্ত! কাকতালীয় নাকি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি, সেটা রায় দেবে ব্যালট বাক্সই।
ভোটের দিন তাই দেশের রাজনৈতিক অঙ্কটা দাঁড়াচ্ছে খুব সোজা সমীকরণে, ক্ষমতার চাবি যাবে কার হাতে আর আগামী দিনের সরকারপ্রধান হবেন কোন রহমান এ প্রশ্নের উত্তর দিতে এখন আর সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
এদিকে দেশের রাজনীতির দ্বিদলীয় আলোচনায় চলে আসা দীর্ঘদিনের চর্চা দুই দলের প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমান।
জিয়াউর রহমানের বড় সন্তান তারেক রহমান সিলেটের জামাই। সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত শেষে যিনি গিয়েছিলেন দক্ষিণ সুরমার সিলাম ইউনিয়নের বিরাইমপুরে শ^শুরবাড়ি ‘রাহাত মঞ্জিল’-এ। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে বরণ করেছিল বিরাইমপুরের বাসিন্দারা। ডা. জুবাইদা রহমানের পৈতৃক বাড়িতে সিলেটের জনসভা দিয়েই নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন তারেক রহমান।
আলোচনায় আছেন জামায়াতের প্রধান শফিকুর রহমান। দায়িত্ব পেলে পাঁচ বছরে দেশের চেহারা পাল্টে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এই রহমান। ঐতিহাসিক আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে সিলেটের শেষ নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ ঘোষণা দেন। মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় নির্বাচনী জনসভায় জামায়াত আমির বলেন, ‘দুর্নীতি দূর হলেই দেশের শিল্প ও অর্থনীতি নতুন গতিতে এগিয়ে যাবে।’ আবার হবিগঞ্জে অন্য এক নির্বাচনী জনসভায় তিনি বলেন, ‘টাকার বিনিময়ে আর বিচার বিক্রি হবে না।’
শফিকুর রহমান মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার স্ত্রী ডা. আমিনা বেগম অষ্টম জাতীয় সংসদের সদস্য ছিলেন।
রয়েছে আরেকটি কাকতালে আলোচিত এ দুই রহমানই কন্যাসন্তানের বাবা।
ভোটের সকালে বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্ক তাই দাঁড়াচ্ছে এক অদ্ভুত সমীকরণে, নাম ‘রহমান’, শিকড় সিলেট, ইতিহাস ভারী, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। বাংলাদেশের হবু প্রধানমন্ত্রী কি ‘সিলটি ভাই’, নাকি ‘দুলাভাই’?
হ্যাঁ, ভোটের দৌড়ে আপাতত ‘ভাই’-এর চেয়ে এগিয়ে আছে ‘দুলাভাই’! অন্তত একাধিক জরিপ এমনটিই ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে জরিপের পাকা ধানে মই দেওয়ার ঘটনাও কিন্তু কম নয়। রাজনীতিতে অপ্রত্যাশিত ঘটনাই যেন এখন নিয়ম। যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথাই ধরা যাক। নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে সিএনএন প্রায় সব বড় গণমাধ্যম ও খ্যাতনামা জরিপ সংস্থা হিলারি ক্লিনটনের জয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিল। তাদের পরিসংখ্যান বলছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়ের সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কিন্তু ফলাফল এলো সম্পূর্ণ ভিন্ন ট্রাম্পের অবিশ্বাস্য বিজয়। পরে বিশ্লেষকরা জানান, জরিপকারীরা ‘সাইলেন্ট ভোটার’দের মনস্তত্ত্ব ধরতে ব্যর্থ হয়েছিল, যারা প্রকাশ্যে মত দেননি, কিন্তু ভোটকেন্দ্রে গিয়ে চমক দেখিয়েছেন।
ভারতের ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের বুথফেরত জরিপ জানাচ্ছিল, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট ৪০০-এর বেশি আসন পাবে। সেই পূর্বাভাস কিন্তু বাস্তবের ভোট গণনায় ভিন্ন গল্প বলল বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। তাদের ক্ষমতায় যেতে হয়েছে জোটের শরিকদের সমর্থন নিয়ে।
এই ঘটনাগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয় রাজনীতির মাটির নিচে যে ফল্গু নদীর মতো চোরাস্রোত বইতে থাকে, তা সবসময় দৃশ্যমান নয়। জনমত কখনো কখনো নীরব থাকে, কিন্তু সিদ্ধান্তের মুহূর্তে বিস্ফোরিত হয়। তাই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিবর্তন, কিংবা সম্পর্ক-রাজনীতির অদ্ভুত রূপান্তর এসব যদি বিস্ময় মনে হয়, তবে হয়তো আমাদেরই ভাবতে হবে আমরা কি সত্যিই সময়ের স্রোত বুঝতে পারছি, নাকি আবারও কোনো ‘সাইলেন্ট স্রোত’ আমাদের অগোচরেই দিক বদলে দিচ্ছে?
জরিপ বা পরিসংখ্যান সবসময় সত্যি কথা বলে না। পরিসংখ্যান নিয়ে মজার উক্তি বা কৌতুক হলো, ‘পরিসংখ্যান হলো বিকিনির মতো, যা যা দেখায় তা আকর্ষণীয়, কিন্তু যা লুকিয়ে রাখে তা আসল’। এই কৌতুককর কথাটি বোঝায় যে, পরিসংখ্যানের সংখ্যাগুলো সঠিক তথ্য দিলেও, তার পেছনের আসল পরিস্থিতি বা উদ্দেশ্য লুকিয়ে রাখতে পারে।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যেন একেবারে নতুন মোড় নিয়েছে। গত দেড় বছরে ‘অনেক কিছুই ঘটেছে’, যা আগে কল্পনাতেও ছিল না। ফলে হঠাৎ রাজনৈতিক সমীকরণ পাল্টে গেলে, কিংবা পরের ঘরের দুলাভাইয়ের চেয়েও নিজ ভাইয়ের প্রতি দরদ উথলে উঠলে তাতে অবাক হওয়ার খুব বেশি কারণ থাকে কি? তখন অন্তত অদ্ভুত সেই সমাপতনকে ‘হায় ব্রুটাস’ না বলে ‘হায় ম্যাটিকুলাস’ বলবে সবাই!
ভোটের রাজনীতির মারপ্যাঁচ যদি খুব বেশি ‘ম্যাটিকুলাস’ না হয়, তাহলে হয়তো ‘সিলটি দুলাভাই’-এর জন্য জেন-জি রিল ভিডিওতে গীতিকার রামকানাই দাশের সুরে বেজে উঠবে ‘ক্ষমতায় আইলো রে নয়া দামান!’
লেখক : রাজীব নন্দী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক