কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা পাল্টাপাল্টি হুমকি ও বাকযুদ্ধের পর ওমানে পরোক্ষ আলোচনায় বসে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ ৮ মাসের অচলাবস্থা কাটিয়ে সে বৈঠকের মধ্য দিয়ে আবারও কূটনীতির টেবিলে ফেরে দুই দেশ। সে বৈঠকে স্থগিত হয়ে থাকা পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ই নমনীয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তবে আলোচনার পরিধি বাড়ানো হলে তা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাত ডেকে আনতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ফিদান। গতকাল বৃহস্পতিবার ফিনান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই দাবি করেছেন তিনি। এদিকে, গত বুধবার হোয়াইট হাউজে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে; ইরানের সঙ্গে আলোচনা কীভাবে এগোবে তা নিয়ে ‘সীমানির্দেশক’ কোনো চুক্তি হয়নি বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের শঙ্কা ছিল, ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির পাশাপাশি দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার সীমিত করার বিষয়টিও যুক্ত করার জন্য ট্রাম্পকে কূটনীতি সম্প্রসারিত করতে চাপ দেবেন নেতানিয়াহু। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে কোনো একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যায় কি না, তা দেখতে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান আলোচনা অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে, তেহরানের পরমাণু চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনা ব্যাহত করতে ইসরায়েল চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছেন ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি। আলোচনা ব্যাহত করে তারা নতুন একটি যুদ্ধ উসকে দিতে চায়, যেন পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে, বলেছেন তিনি।
হাকান ফিদানের বরাত দিয়ে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানিয়েছে, ওয়াশিংটন তাদের দীর্ঘদিনের দাবি, ইরানকে পুরোপুরি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে। এ অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে। অতীতে এ বিষয়টিই ছিল আলোচনা না হওয়ার অন্যতম বড় কারণ। ফিদান আরও বলেছেন, সুস্পষ্ট সীমারেখার মধ্যে ইরানের পরমাণু সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম মেনে নিতে যুক্তরাষ্ট্র আগ্রহ রয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক সংকেত। তিনি আরও বলেছেন, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি)-এর স্বাক্ষরকারী ইরান বরাবরই বলে আসছে, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ তাদের সার্বভৌম অধিকার। ফিদানের মতে, ইরান এখন সমৃদ্ধকরণের মাত্রায় সীমা নির্ধারণ এবং কঠোর আন্তর্জাতিক পরিদর্শন মেনে নিতে প্রস্তুত, যা ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির শর্তের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। তিনি আরও বলেছেন, ইরানিরা এখন বুঝতে পারছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো প্রয়োজন। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও উপলব্ধি করছে যে, ইরানের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাদের জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা অর্থহীন। তবে ফিদান সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি পারমাণবিক ইস্যুর পাশাপাশি ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের বিষয়টিও একসঙ্গে আলোচনায় আনতে চায়, তাহলে মূল পারমাণবিক আলোচনা স্থবির হয়ে পড়তে পারে। তিনি আরও বলেছেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র সব বিষয় একসঙ্গে আলোচনায় আনতে চায়, তাহলে পারমাণবিক বিষয়েও অগ্রগতি হবে না। এর ফল হতে পারে অঞ্চলে আরেকটি যুদ্ধ।
এই প্রেক্ষাপটের মধ্যেই বুধবার ওয়াশিংটনে বৈঠক করেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। ধারণা করা হচ্ছিল সে বৈঠকে ইরানে তীব্র হস্তক্ষেপের জন্য ট্রাম্পকে চাপ দেবেন নেতানিয়াহু। কিন্তু ট্রাম্প সে ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে ইঙ্গিত দেননি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী। শুধু বলেছেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থ অবশ্যই আমলে নিতে হবে। গত বছর জানুয়ারিতে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট আসনে বসার পর থেকে এ নিয়ে সাতবার তার সঙ্গে নেতানিয়াহুর বৈঠক হলো। তবে তার এবারের ওয়াশিংটন সফরে তেমন আড়ম্বর ছিল না। শুধু সংবাদমাধ্যমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। নেতানিয়াহু-যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হতে যাওয়া পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনায় প্রভাব রাখার সুযোগ খুঁজছেন। রয়টার্স জানিয়েছে, বুধবার দুই নেতা আড়াই ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। একে ‘অনেক ভালো বৈঠক’ বলে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। কিন্তু জানিয়েছেন, তাদের এ বৈঠকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়নি। ট্রাম্প নেতানিয়াহুর অনুরোধ প্রকাশ্যে গ্রহণ করা থেকেও বিরত থাকেন।
এদিকে, কাতারের দোহায় আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলি লারিজানি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে শুরু হওয়া নতুন আলোচনা যখন ‘গুরুত্বপূর্ণ পর্বে’ রয়েছে সে সময় ইসরায়েল আলোচনাকে লাইনচ্যুত করার অজুহাত সাজাচ্ছে। তিনি বলেন, ইসরায়েল যেচে এই প্রক্রিয়ায় নিজেদের জড়িয়েছে, আর তাদের উদ্দেশ্য হলো আলোচনাকে ব্যাহত করা; ইসরায়েলের কৌশল হচ্ছে অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করা।