চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর জোট শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাবে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। কিছু আসনে ফল ঘোষণা করতে কেন দেরি হচ্ছে সেই প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান। তবে তিনি বলেছেন, ইতিবাচক ধারার রাজনীতি করবেন তারা। জোট শরিক দলের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১২টায় মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন জামায়াত আমির।
শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশবাসী আমাদের যতটুকু সহযোগিতা করেছেন তার জন্য আমরা তাদের অভিনন্দন জানাই। আমরা আশা করছি সরকার দ্রুত তার অফিশিয়াল ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আবার আমাদের চূড়ান্ত দৃষ্টিভঙ্গি জাতিকে জানিয়ে দেব। আপনারা আশ্বস্ত থাকতে পারেন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হবে ইতিবাচক ধারার রাজনীতি, কল্যাণ ধারার রাজনীতি, মানুষের জন্য রাজনীতি, দেশের জন্য রাজনীতি। আমরা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতার রাজনীতি করব না।’
কোরআর শরিফের একটি আয়াত পাঠ করে তার বাংলা অনুবাদ তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, ‘তোমরা ভালো কাজের সহযোগিতা করো আর কাজটি যদি মন্দ ও অকল্যাণকর হয়, তোমরা তার বিরোধিতা করো অথবা সহযোগিতা থেকে বিরত থাকো। আমাদের মূলনীতি হলো ভালো কাজের সহযোগিতা থাকবে, মন্দকাজ সেটা অধিকার রক্ষার জন্য আমাদের কথা বলতে হবে। আমরা আশা করছি বিস্তারিত বিষয়গুলো আমরা কাল-পরশুর মধ্যে পেয়ে যাব। এ সময়ের মধ্যে সরকার নির্বাচন কমিশন আশ্বস্ত করেছে তারা ফল দেবে। আমরা সেটা দেখার অপেক্ষায় আছি, তারা দেন কি না।’
শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিছু আসনে ফল ঘোষণা করতে দেরি হচ্ছে। এ বিষয়গুলো কিন্তু সুষ্ঠু ধারার রাজনীতির পরিচয় বহন করে না, এগুলো অসুস্থ ধারার রাজনীতি। এ বিষয়গুলো আমরা বিবেচনায় নেব। জাতিকে আমরা জানানোর দরকার মনে করব তা জানাব। যাতে ভবিষ্যতে মন্দকাজের চর্চার ধারাবাহিকতা না থাকে।’
জামায়াত কতটি আসনে জয়ের খবর পেয়েছে, সেই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কয়টি আসনে জয়ের খবর পেয়েছি তার সঠিক উত্তর নেই। কারণ, বেশ কয়েকটি আসনের ফল ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বলেছিল, সই করা শিট এসেছিল, সেখানে আমরা এগিয়ে আছি। এরপর বলছে পোস্টাল মিলিয়ে দেখতে হবে, এই আছে, সেই আছে। এইটা-ওইটা কী আমরা বুঝতে পারছি না। এই-ওই এর বাইরে এসে আমাদের মেসেজ দিলে আমরা আমাদের অবস্থান জানাব।’
কারচুপির আশঙ্কা বা ইঞ্জিনিয়ারিং দেখতে পারছেন কি না এ প্রশ্নে জামায়াত আমির বলেন, ‘অনেক কিছু হয়েছে, কিন্তু এখনই আমরা আপনাদের কোনো কিছু বলতে চাচ্ছি না। সবকিছু যখন ফাইনাল এসে যাবে তখন ১১ দল মিলে বসে কম্পাইল করে জানাব।’
ফল মেনে নেবেন কি না এ প্রশ্নে তিনি ইতিবাচক ধারার রাজনীতি করার কথা বলেন। ফল গণনায় দেরির জন্য কারা দায়ী তা পরীক্ষা করে দেখার কথাও জানান তিনি।
জামায়াতের ফেসবুক পেজে দলটির নির্বাচিত প্রার্থীদের তথ্য তুলে ধরার বিষয়ে এক প্রশ্নে ডা. শফিকুর বলেন, ফেসবুক পেজে আমরা যা পেয়েছি তা দিয়েছি, এটাকে চূড়ান্ত বলা যাবে না। অফিশিয়াল ফল ঘোষণা করা হয়নি। বেসরকারিভাবে প্রাথমিক ফল ঘোষণা করা হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে যে তথ্য আসছে, সে অনুযায়ী আমরা বলছি।
ফল ঘোষণার পর অভিযোগ তুললে লাভ হবে কি না, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘লাভ-লসের ব্যাপার। আমরা তো চিত্রটা তুলে ধরব। তখন কিন্তু উনাদের ফল ঘোষণাই কিন্তু চূড়ান্ত হবে না। ...আমরা চাই জনগণের রায়ে যেটাই হোক, সঠিকভাবে যেন আমাদের সামনে আসে।’
জামায়াত আমির জানান, ফল ঘোষণা নিয়ে তারা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। তিনি বলেন, ‘ফলাফলের শিট হাতে আসার পরেও কেন দিচ্ছে না, আমরা এর সমাধন চাই। ইনশাআল্লাহ আমাদের মুখে হাসি দেখবেন। আপনাদের (সাংবাদিক) মুখেও যেন হাসি থাকে।’
মামুনুল হক, নাহিদ ইসলামসহ জোট শরিক দলের বেশ কয়েকজন নেতা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে দিনের বেলা সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে জামায়াত আমির বলেন, ভোটের মতো ফল সুষ্ঠু হলে মেনে নেবেন। গতকাল সন্ধ্যা ৭টায় মিরপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘অগ্রিম বলা সমীচীন নয়। জনগণের ওপর আস্থা আছে। প্রাথমিক ফলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এটাকে নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে না। দেশের স্বার্থ আমাদের কাছে বড়। এ পর্যন্ত যে ফল এসেছে, বেশিরভাগ জায়গায় এগিয়ে আছে। আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে।’ তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী জন্মের পর থেকে বারবার নিষিদ্ধ হয়েছে। কখনো থেমে থাকেনি। যারা হাল ধরেছিলেন, তারা চলে গেছেন। কারও স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে, এবার কেউ জুলুমের শিকার হয়ে চলে গেছেন।
দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, অনেক শঙ্কা ছড়ানো হয়েছিল। বড় কোনো কেলেঙ্কারি হয়নি। সমাজে একসঙ্গে চলতে গেলে ভুলভ্রান্তি হতেই পারে।
নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে নিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রেও আমাদের দেখা হয়েছে। যেকোনো একজন জিতবে। আমরা একজনের জয় মেনে নেব। আমি নির্বাচিত হলে সবার পরামর্শ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করব। সরকারে গেলে সব দলকে পাশে চাইব। যেসব দেশের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আছে, তা বজায় রাখব, খোলা মন নিয়ে সবার প্রাপ্য দেব, আমাদেরটা বুঝে নেব।’
তিনি আরও বলেন, ‘এবার যত পর্যবেক্ষক এসেছে, অতীতে আসেনি। এগুলো নির্বাচন হওয়ার পক্ষে ভূমিকা রেখেছে। যারা নিজের অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করেছে, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’
প্রবাসীদের উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘গত তিন নির্বাচনে আমরা কেউই ভোট দিতে পারিনি। এবার প্রবাসীরাও ভোট দিতে পেরেছেন। তারা আমাদের জাতীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তারা অনেক অধিকার থেকেই বঞ্চিত ছিলেন। ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠা হলে বাকিগুলো এমনিই চলে আসবে। আমরা যদি তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করি, তারা আমাদের আরও উজাড় করে দেবেন।’
গতকাল সারা দিন ভোটের মাঠে সক্রিয় ছিলেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ভোটার, ভোটগ্রহণকারী কর্মকর্তা, নিজ দলের নেতাকর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। পাশাপাশি তিনি সারা দেশের নির্বাচন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জামায়াত আমির সকাল সাড়ে ৭টায় বাসা থেকে বের হয়ে ৮টা ২০ মিনিটে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ (বালক শাখা) কেন্দ্রে ভোট দেন। একই সঙ্গে গণভোটও দেন তিনি। ওই সময় তিনি বলেন, ‘আমরা জনগণের সরকার গঠনের ব্যাপারে আশাবাদী।’ কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা দলের নয়; ভোটের মাধ্যমে দেশের ১৮ কোটি মানুষের সরকার গঠনের জন্য ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ডা. শফিকুর রহমান।
তিনি আরও বলেন, ‘দেড় যুগ ধরে দেশবাসী ভোট দিতে পারেনি, আমিও পারিনি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ এই তিনটি নির্বাচনের সময় আমি কারাগারে ছিলাম। ফলে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ হয়নি। আজ আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহতায়ালা আমাদের সেই সুযোগ দিয়েছেন। আমি মহান রাব্বুল আলামিনের শুকরিয়া আদায় করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি নতুন সূচনা হোক এই দোয়া করি।’
এরপর জামায়াত আমির মিরপুর-১০ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে যান। এরপর একে একে কাজীপাড়া হাজি ইউসুফ আলী প্রাথমিক বিদ্যালয়, সরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ (বালিকা), ইব্রাহীমপুর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ, রোটারি উচ্চ বিদ্যালয়, সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, শেরেবাংলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাজি আলী হোসেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, হারম্যান মেইনার স্কুলসহ ১৬টি কেন্দ্র দফায় দফায় পরিদর্শন করেন তিনি।