দেশে বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীদের ওপর হামলা এবং ফলাফল কারচুপির অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট। ফলাফল কারচুপির সঠিক সমাধান এবং হামলা বন্ধ না হলে রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছেন জোটের নেতারা। গতকাল শুক্রবার রাতে জামায়াতে ইসলামীর মগবাজারে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জোটের বৈঠক শেষে এমন ঘোষণা দেন শীর্ষ নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। এ সময় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ইরানসহ জোটের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সারা দেশে নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ এনে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর এবং পরিবার হুমকির সম্মুখীন। অনেকে আহত হয়েছেন। বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হচ্ছে। যারা বিজয়ী হয়েছেন তারা আপনাদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করুন। গণতান্ত্রিক উত্তরণের শুরুটাই যদি বিরোধী দল ও মতের মানুষদের নিপীড়নের মধ্য দিয়ে হয়, তা আমাদের জন্য লজ্জাজনক হবে। এভাবে চলতে থাকলে আমরা বাধ্য হব কঠিন হতে।’
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে জয়-পরাজয় থাকবে। কিন্তু সেই জয় নিয়ে যদি প্রশ্ন থাকে তাহলে সেটা প্রতিকার হতে হবে, ইতিবাচক রাজনীতি থেকে বঞ্চিত করবেন না। নেতাকর্মীদের ওপর হামলা বন্ধ করুন। না হলে এর দায়ভার আপনাদের নিতে হবে। আমাদের বাধ্য করবেন না। বাধ্য হলে রাজপথেও নামব।’
জামায়াত আমির বলেন, ‘নির্বাচনের ফল ঘোষণা নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। ফল পরিবর্তন করা হয়ছে। বেশ কিছু জায়গায় ফলাফল হঠাৎ করেই দুই ঘণ্টা, চার ঘণ্টা লাপাত্তা। অনেক জায়গায় আমাদের প্রার্থী বিপুল ভোটে এগিয়ে ছিলেন, পরে হঠাৎ তিনি নেই। আরেকজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনের ফলাফল শিটে ঘষামাজা করার অনেক প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। নির্বাচন কমিশন একেক দলের সঙ্গে একেক রকম আচরণ করছে। ফ্যাসিবাদী আচরণ শুরু হয়েছে।’
তিনি বলেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর আসনে যে কারণে ভোট কাউন্ট করেছে, একই কারণে মামুনুল হকের আসনে ভোট বাতিল করেছে। নির্বাচন কমিশন কি একেক আসনে একেকজন? তাহলে কেন এমন হলো? সেক্রেটারি জেনারেলের আসনসহ অনেক আসনে ফল নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা তাদের মতামত তুলে ধরবেন। আমাদের নিজেদের পর্যবেক্ষণও জাতির সামনে তুলে ধরব।’
তিনি আরও বলেন, ‘একটি নির্বাচন হয়েছে, আমরা চাই কালো ছায়া দূর হোক। যদি আবার কোনো কালো ছায়া ফিরে আসে, তবে আমরা লড়ে যাব। ফ্যাসিবাদ আমাদের বিরুদ্ধে নয়, ফ্যাসিবাদ দেশবাসীর বিরুদ্ধে। তরুণ সমাজ রক্ত দিয়ে আমাদের যে নতুন বাংলাদেশ উপহার দিয়েছে, সেটা নষ্ট হতে দেব না।’
ডা. শফিক বলেন, ‘আমরা চাই দেশে পুরনো ধারার রাজনীতি না ফিরুক। আমাদের তরুণ সমাজ বুকের রক্ত দিয়ে আমাদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছে। আমরা কথা দিচ্ছি তাদের কথা রাখব। আমরা ছাড় দেব না। নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় আমাদের চুল পরিমাণ সরে আসার কোনো সুযোগ নেই।’
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এ নির্বাচনে সুস্পষ্টভাবে ফলাফল কারচুপি করা হয়েছে। একটা সময় পর্যন্ত নির্বাচন সুন্দর হয়েছিল। কিন্তু পরে কিছু আসনকে টার্গেট করে ফলাফল কারচুপি করা হয়েছে। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ কিছু নেতার আসন টার্গেট করে ফল পাল্টে দেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, “এ নির্বাচনে প্রকাশ্যেই দুটি পক্ষ ছিল। একপক্ষ সংস্কার করে নতুন বন্দোবস্ত চালু করতে চায়। আর একপক্ষ সংস্কার চায় না, পুরনো ফ্যাসিবাদের কাঠামো দিয়ে দেশ চালাতে চায়। যে জনগণ সংস্কারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে, সেই ভোট ১১ দলের পক্ষেই দেওয়া হয়েছে। গণভোটে ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। ১১-দলীয় জোটের এই ফলাফল কারচুপি করা হয়েছে।”
নাহিদ আরও বলেন, ‘প্রার্থীরা ফলাফল কারচুপির প্রমাণসহ অভিযোগ নির্বাচন কমিশনকে জানাবে। নির্বাচন কমিশনের আচরণের ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী আমরা কী সিদ্ধান্ত নেব। আমরা ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় থাকতে চাই। কিন্তু নির্বাচনের পর যারা নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের বাড়িঘরে হামলা করেছেন, তারা সাবধান হয়ে যান। তা না হলে জনগণ রাস্তায় নেমে আসবে।’
খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘একটি নির্বাচন হয়েছে। এখানে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, দেশের স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্ব তাদের। সেটা যদি কোনোভাবে নষ্ট হয়, এর দায় তাদের নিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘এ নির্বাচনের প্রতিক্রিয়া ইতিবাচকভাবে ব্যক্ত করতে চাই। ভোটগ্রহণের সময় কোনো বিশৃঙ্খলা হয়নি। ভোটগ্রহণ যেভাবে সুন্দর হয়েছে, গণনা ঠিক তার উল্টো হয়েছে। এই ভোট গণনার মাধ্যমে এ দেশের মানুষের ভাগ্য ছিনতাই করা হয়েছে। আমরা দেশের মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যাব।’
ফলাফল ‘সাজানো’ ষড়যন্ত্র হয়েছে : গত বৃৃহস্পতিবার নির্বাচনের পরে রাত ৪টায় রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন কমিশনে গিয়ে মৌখিকভাবে অভিযোগ দেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। পরে সাংবাদিকদের বলেন, ভোট গণনার কাজে নির্বাচন কমিশনের যারা জড়িত ছিলেন, রিটার্নিং অফিসার, সহকারী রিটার্নিং অফিসার এবং ইসির সদস্যরা ফল ঘোষণার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকভাবে বিলম্ব করছেন। ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতাদের আসনগুলোতে দায়িত্বরত এজেন্টদের কাছ থেকে পাওয়া শিট অনুযায়ী রাত ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ফল ঘোষণা করার কথা ছিল, কিন্তু তা হয়নি।
এদিকে গতকাল শুক্রবার সকালে জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, ‘প্রিয় দেশবাসী, বৃহস্পতিবার সারা দিন শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দেওয়ার জন্য আপনাদের সবাইকে জানাই আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ। তবে, নির্বাচনের ফল তৈরি ও ঘোষণার ধরন আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। অনেক জায়গায় আমাদের প্রার্থীরা অল্প ভোটে রহস্যজনকভাবে হেরে গেছেন। ফলাফলে বারবার গরমিল ও সাজানো দেখা যাচ্ছে এবং প্রশাসনও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেনি বলে মনে হচ্ছে। এসব কারণে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে।’ এতে আরও বলা হয়, ‘আমরা সবাইকে ধৈর্য ধরার অনুরোধ করছি। আমাদের জোটের পরবর্তী ঘোষণা না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। একটি মানবিক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আমাদের ন্যায়ের লড়াই চলবেই, ইনশাআল্লাহ।’
গতকাল রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণা সমাপ্ত হওয়ার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নজরুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি আসনে বিজয়ী হয়েছে। বিএনপির সঙ্গে জোটে যারা যুক্ত ছিলেন, তাদেরও অনেকেই বিজয়ী হয়েছেন। কাজেই আমরা মনে করি এর মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছর বাংলাদেশের কল্যাণের দায়িত্ব জনগণ বিএনপি এবং বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ওপর অর্পণ করেছেন।’
নির্বাচনী পরিবেশে শতভাগ সন্তুষ্ট কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে বিএনপির শতভাগ সন্তুষ্ট হওয়া কঠিন ব্যাপার। তবে মোটামুটি খুশি।’ তিনি বলেন, ‘আগের অনেক নির্বাচনে বহু প্রাণহানি বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদেরও ক্ষতি হয়েছে অনেক। এবার তেমন কিছু হয়নি। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে দীর্ঘদিন ভোট না দিতে দিতে ভোট না দেওয়ার যে একটা সংস্কৃতি আমাদের জনগণের মধ্যে গড়ে উঠেছিল, সেটা পুরোপুরি আমরা ফিরিয়ে আনতে পারিনি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা ২৯২টি আসনে প্রার্থীদের মনোনীত করেছিলাম। ধারণা ছিল আমাদের সব প্রার্থীই জিতবেন। ইনশাআল্লাহ আগামী নির্বাচনে নিশ্চয়ই আমাদের ফল আরও ভালো হবে।’
অন্যদিকে সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে এনসিপি এবং ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র ও দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ অভিযোগ করেন। তিনি লিখেন, সারা দেশে বিভিন্ন স্থানে এনসিপি এবং ১১ দলীয় জোটের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে। তাদের বাড়িঘর এবং পরিবার হুমকির সম্মুখীন। বিজয়ীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘আপনাদের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করুন। গণতান্ত্রিক উত্তরণের শুরুটাই যদি বিরোধী দল ও মতের মানুষদের নিপীড়নের মধ্য দিয়ে হয় তা আমাদের জন্য লজ্জাজনক হবে।’