জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের বাড়ি সিলেটে। তার জন্মস্থান সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ায়। দীর্ঘদিন রাজনীতি করেছেন সিলেটে। অতীতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন সিলেট ও কুলাউড়ায়। তবে সাফল্য পাননি। এখন তিনি জামায়াতে ইসলামীর আমির। তাই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তার নেতৃত্বাধীন জামায়াত সিলেট বিভাগে অতীতের তুলনায় ভালো ফল করবে বলে অনেকেই মনে করেছিলেন। দলের নেতাকর্মীরাও ছিলেন বেশ আত্মবিশ্বাসী। অন্তত চার থেকে পাঁচটি আসনে তারা জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সিলেট বিভাগে জামায়াতের ভরাডুবি হয়েছে। বিভাগের ১৯টি আসনের একটিতেও জয় পায়নি দাঁড়িপাল্লা। কেবলমাত্র একটি আসনে জামায়াত জোটের শরীক খেলাফত মজলিসের প্রার্থী দেয়ালঘড়ি প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন। আর এই ফলে দলের নেতাকর্মীরা চরম হতাশ। জামায়াতের এই ভরাডুবি নিয়ে সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনেও বেশ আলোচনা হচ্ছে। অবশ্য সিলেট বিভাগে জামায়াত অতীতেও তেমন সুবিধা করতে পারেনি। সর্বশেষ ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেটের ১টি আসনে চারদলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জয় পেয়েছিল জামায়াত।
সিলেট জামায়াতের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা ও কয়েকজন সমর্থকের সঙ্গে গতকাল শুক্রবার কথা বলে জানা যায়, সিলেট বিভাগে দলের এমন বিপর্যয়ে নেতাকর্মীরা হতবাক। তারা অত্যন্ত হতাশ। প্রত্যাশার ধারের কাছেও পৌঁছাতে না পারায় দলের অভ্যন্তরে তোলপাড় চলছে। পরাজয়ের কারণ নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। তারা জানান, দলের অনেকে মনে করছেন প্রার্থী বাছাই এবং জামায়াত জোটের শরীক/খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস এই দুই দলকে আসন ছাড়ের হিসাবে গরমিল হয়েছে। সরাসরি জামায়াতের প্রার্থী থাকলে জেতার সম্ভাবনা ছিল এমন আসন জোটসঙ্গীকে দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে দলের অভ্যন্তরে বেশি আলোচিত হচ্ছে সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা-ফেঞ্চুগঞ্জ-বালাগঞ্জ) আসন নিয়ে। এখানে প্রথমে প্রার্থী করা হয়েছিল দক্ষিণ সুরমা উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, জামায়াত নেতা মাওলানা লোকমান আহমদকে। ভোটের রাজনীতিতে তিনি অভিজ্ঞ। কিন্তু শেষ মুহূর্তে খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের চাওয়া রক্ষা করতে গিয়ে এখানে জামায়াত নিজেদের প্রার্থী সরিয়ে রাজনীতিতে নবাগত মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন রাজুকে প্রার্থী করে। তিনি প্রায় ৪০ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন বিএনপি প্রার্থীর কাছে। একইভাবে আরও একাধিক আসন জোটের সঙ্গে আসন সমঝোতায় জামায়াত ভুল করেছে বলে তাদেরই কেউ কেউ মনে করছেন।
দলীয়সূত্র জানায়, সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে এবার ১০টি আসনে সরাসরি জামায়াত প্রার্থী, আটটিতে খেলাফত মজলিস ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়ে ১১ দলীয় জোটের আসন ভাগাভাগি হয়। আর একটি আসন ছিল জোটের সব সঙ্গীর জন্য উন্মুক্ত।
জামায়াত সরাসরি যে ১০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল তার মধ্যে অনন্ত ৫টিতে জয়ের প্রত্যাশা করেছিল। এসব আসনে জয় পেতে তারা মরিয়া হয়ে কাজ করেছে। এমনকি অন্য এলাকার জামায়াত ও শিবির নেতাকর্মীরা জয়ের জন্য টার্গেট করা ওই সব আসনে গিয়ে কাজ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথাও তারা সফল হতে না পেরে এখন হতাশায় ভুগছেন। এ নিয়ে দলে চাপা ক্ষোভ-অসন্তোষও বিরাজ করছে।
সিলেট-১ (মহানগর-সদর), সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার), সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা), মৌলভীবাজার-১ (জুড়ী-বড়লেখা) ও মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনে জয়ের ব্যাপারে জামায়াত আশাবাদী ছিল। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ-২ আসনে ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শিশির মনির ও সিলেট-৬ আসনে ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বিজয়ী হবেন বলে জামায়াতের দৃঢ় আশা ছিল। কিন্তু নির্বাচনে শিশির মনির বিএনপির প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা নাছির উদ্দিন চৌধুরীর কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছেন। তবে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন সিলেট-৬ আসনে সেলিম উদ্দিন। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী এমরান আহমদ চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ৯ হাজার ৯১৭ ভোট, আর সেলিম উদ্দিন পেয়েছেন ১ লাখ ১ হাজার ৫৬৯ ভোট।
বিভাগের মধ্যে কেবলমাত্র সিলেট-৫ আসনে জামায়াত জোটের শরীক খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান জয়ী হয়েছেন। এখানে বিএনপি জোটের প্রার্থী ছিলেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, আর বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন মামুনুর রশীদ। ৩ প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে অল্প ব্যবধানে জিতেছেন আবুল হাসান।
সিলেট বিভাগে নিজেদের ফল নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে বৃহস্পতিবার রাতেই মিডিয়ায় বক্তব্য দেন সিলেট মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমির ড. নুরুল ইসলাম বাবুল। তিনি বলেন, এই ফল আমাদের প্রত্যাশার সঙ্গে একেবারেই মিলছে না। একাধিক আসনে জয়ের ব্যাপারে আমরা শতভাগ আশাবাদী ছিলাম।
সিলেট মহানগর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিলেট বিভাগের ফল নিয়ে আমাদের দলের নেতাকর্মীরা হতাশ। একাধিক আসনে জয়ের ব্যাপারে আমরা দৃঢ় আশাবাদী ছিলাম। কেন এমন হলো তা খতিয়ে দেখা হবে।’