বিএনপির ঘাটিখ্যাত কুষ্টিয়ার ৪টি সংসদীয় আসনের ৩টিতেই ভোট বিপর্যয় হয়েছে দলটির। তার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর হয়েছে নিরঙ্কুশ বিজয়। বিএনপির আন্তর্দলীয় কোন্দলের সুযোগে নিরবে সাংগঠনিক অবস্থানকে সুসংহত করে জামায়াত যে ভোটবিপ্লব ঘটিয়েছে তা সত্যিই অনুকরনীয় অধ্যায়ের সুচনা করেছে। দলীয় শৃঙ্খলা ফেরাতে দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নানা উদ্যোগ থাকলেও কোন সুফল বয়ে আনেনি। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে দ্বিধাবিভক্ত দলীয় নেতাকর্মীরা নানাবিধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ায় সাধারণ জনমনে সৃষ্ট তিক্ততার ব্যাপক প্রভাব পড়েছে বিএনপির ভোটবাক্সে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা কর্তৃক ঘোষিত বেসরকারী ফলাফলে যে চিত্র উঠেছে এসেছে তা হলো- কুষ্টিয়া-১ দৌলতপুর আসনে মোট ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৪ জন ভোটারের মধ্যে বিএনপির প্রার্থী ধানের শীষের প্রতীকে রেজা আহমেদ ওরফে বাচ্চু মোল্লা ১ লাখ ৬৫ হাজার ৯০৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা বেলাল উদ্দীন পেয়েছেন ৮৬ হাজার ৬৮২ ভোট পেয়েছেন।
কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনে ৪ লাখ ৭৮ হাজার ১ জন ভোটারের মধ্যে জামায়াত মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতিকের প্রার্থী আব্দুল গফুর ১ লাখ ৯২ হাজার ৮৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ধানের শীষ প্রতিকের প্রার্থী রাগীব রউফ চৌধুরী পেয়েছেন ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮২১ ভোট।
কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনে মোট ৪ লাখ ৪০ হাজার ৬০০ ভোটারের মধ্যে জামায়াত ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতিকের প্রার্থী মুফতি আমির হামজা ১ লাখ ৮২ হাজার ৪৭৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী জাকির হোসেন সরকার পেয়েছেন ১ লাখ ২৭ হাজার ৫৫৯ ভোট।
কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে ৪ লাখ ২৪ হাজার ৪১৬ জন ভোটারের মধ্যে জামায়াত ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী আফজাল হোসেন ১ লাখ ৪৮ হাজার ২০১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহম্মেদ রুমী পেয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬০৩ ভোট।
দলীয় আন্তর্কোন্দলের বিষয়ে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সাবেক কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক শামীমুল হাসান অপু বলেন, ‘কমিটি ভেঙে দেয়া এবং নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে একটা বিশৃঙ্খলা অসন্তোষ সৃষ্টি হয়এটা অস্বীকার করা অবকাশ নেই। এ সমস্যা সমাধানে সুনির্দিষ্ট ক্রুটি-বিচ্যুতি তুলে ধরে একাধিকবার সংবাদ সম্মেলন, বিক্ষেভ মিছিলসহ নানা কর্মসূচি পালিত হলেও তা কাজে দেয়নি। আমরা মনে করি, এখান থেকে শিক্ষা নিয়েই আগামীতে সংগঠন সুসংহত করার পথ খুঁজে বের করতে হবে।’
ভোট বিপর্যয়ের শিকার কুষ্টিয়া-৩ সদর আসনে বিএনপি দলীয় ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার জাকির হোসেন সরকার বলেন, ‘৫ আগষ্ট ফ্যাসিবাদি দুঃশাসনের অবসান পরবর্তীতে হঠাৎ করে বিএনপির জেলা পর্যায় হতে তৃণমূল পর্যায়ে ঢালাওভাবে কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা এবং পরবর্তীতে নতুন কমিটি গঠন প্রক্রিয়ার মধ্যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের দূরদর্শিতার অভাব ছিলো। এর ফলে দলের সকল পর্যায়ের অঙ্গ সংগঠন ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামতের প্রতিফলন না ঘটায় সাংগঠনিক মনস্তাত্ত্বিক আন্তর্দ্বন্দ্ব তীব্ররূপ ধারণ করে, যার নিরসনে কোন উদ্যোগই কার্যকর হয়নি। এছাড়া দলীয় প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার সময় ‘প্রাথমিক মনোনয়ন’ এই শব্দটি জুড়ে দেওয়ার ফলে জেলা পর্যায়ে মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাদের মধ্যে মনোনয়ন কর্নফার্ম করার দৌড়ে একটা অসুস্থ্য প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়। এসব সমস্যা দূরীকরণে কেন্দ্রিয় নেতা এবং দলের নীতি নির্ধারণ পর্যায়ের উদ্যোগে অনেক জেলাতে সমস্যার সমাধান হলেও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে এ উদ্যোগ সফল হয়নি। এ সুযোগে জামায়াতে ইসলামী তাদের সংগঠনিক কার্যক্রম গুছিয়ে নিতে পেরেছে। তবে খুব শীঘ্রই আমরা জেলার সর্বস্তরের দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলো শনাক্ত করবো এবং কিভাবে এখান থেকে উত্তোরণের পথ বের করা যায় সে বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
কুষ্টিয়ায় ভোট বিপ্লবের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী কুষ্টিয়া জেলার সেক্রেটারী জেনারেল সুজা উদ্দিন জোয়ার্দ্দার বলেন, ‘সুশৃংখল সাংগঠনিক কার্যক্রমই পারে দলের কাজকে সুসংহত ও গতিশীল করে তুলতে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়াতে ভোটবিপ্লব ঘটিয়ে সেটার প্রমাণ দিয়েছে আমাদের নেতাকর্মীরা। আমরা চাই, দেশ গড়ার স্বার্থে জয়-পরাজয়ের বিভেদ ভুলে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করতে।’