নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে তারেকের মন্ত্রিসভা থাকবেন শরিকরাও

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের পর অতিদ্রুত সরকার গঠনের জন্য মন্ত্রিসভা চূড়ান্ত করছেন দলটির চেয়ারম্যান এবং আগামী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রিসভায় প্রবীণদের পাশাপাশি নবীনরাও

থাকবেন। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মন্ত্রিসভা করতে চান তারেক রহমান। রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারাও আসবেন মন্ত্রিসভায়। গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে এমনটাই জানিয়েছেন বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা। সর্বশেষ ২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে ১০ অক্টোবর যে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়, তার সংখ্যা ছিল ৬০ জন। এবার মন্ত্রিসভায় সদস্য সংখ্যা অর্ধশতাধিক হতে পারে বলেও জানিয়েছেন নেতারা। সরকারে কোনো একটি দায়িত্ব পেতে পারেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানও। তাকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা অথবা বিশেষ সহকারী করা হতে পারে।

সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সরকার গঠনের শুরুটা হবে নবনির্বাচিত সদস্যদের শপথগ্রহণের মাধ্যমে। সংসদ সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দেবেন রাষ্ট্রপতি। প্রধানমন্ত্রী শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। এরপর নতুন প্রধানমন্ত্রী তার নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠন করবেন। নতুন মন্ত্রিসভা কত সদস্যের হবে সেটি নির্ধারণ করবে নির্বাচনে বিজয়ী দল।

বিএনপি নেতারা বলছেন, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন, প্রশাসনে গতি আনা, নীতিনির্ধারণে নতুন ভাবনা এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করতেই মন্ত্রিসভায় তরুণদের অন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে দলটির অভ্যন্তরে মন্ত্রিপরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনা চলছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিষয়টি দেখভাল করছেন। আগামী দু-এক দিনের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কারা কারা থাকছেন, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।

নির্বাচনে জয়লাভের পর গত শুক্রবার নিজ নির্বাচনী এলাকা ঠাকুরগাঁও থেকে ঢাকায় আসেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকায় ফিরে সরাসরি যান গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে। ভূমিধস বিজয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দলের চেয়ারম্যানকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান মির্জা ফখরুল। এ সময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহসহ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। তারা অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেন। জানা গেছে, বৈঠকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণের প্রস্তুতি, মন্ত্রিসভা গঠনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়।

মন্ত্রিসভায় কারা আসছেন জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির কেমন মন্ত্রিসভা হতে যাচ্ছে, তা দেখার জন্য দেশবাসীকে আর অল্প কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ চেয়ারম্যান নিজেই করছেন। প্রয়োজনে জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে আলাপ করছেন।’

বিএনপির এক ভাইস চেয়ারম্যান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির ২০০১-২০০৬ সরকারের সময়ের বেশ কয়েকজন মন্ত্রীকে এবারের মন্ত্রিপরিষদেও রাখার কথা ভাবছে বিএনপি। বিশেষ করে, বিএনপির বিগত সরকারের সময় যেসব মন্ত্রণালয় বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল, পরিচ্ছন্নদের নতুন সরকারের বিভিন্ন দায়িত্বে রাখা হবে।’

মন্ত্রিসভায় যারা থাকছেন : এবার বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে যারা মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেন, তারা হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ড. আবদুল মঈন খান পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, মির্জা আব্বাস গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, সালাহউদ্দিন আহমদ সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী পররাষ্ট্র অথবা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, আব্দুল আউয়াল মিন্টু শিল্প মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদে থাকতে পারেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও। আ ন ম এহসানুল হক মিলনকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় দেওয়া হতে পারে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানকে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। টেকনোক্র্যাট হিসেবে মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন ও ড. জিয়াউদ্দিন হায়দারও।

তবে বিএনপির আরেকটি সূত্র জানাচ্ছে, দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই সরকারের শুরুতে মন্ত্রিসভায় নাও থাকতে পারেন। তাকে নিয়ে দলের আরও বড় চিন্তা আছে।

এবার মন্ত্রিপরিষদে যুক্ত হচ্ছে একাধিক নতুন মুখ। তাদের মধ্যে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় (টেকনোক্র্যাট), চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ইসমাইল জবিউল্লাহকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় (টেকনোক্র্যাট), যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আইন মন্ত্রণালয়, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বিএনপি চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী (টেকনোক্র্যাট) হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন বলে আলোচনা আছে।

এ ছাড়া শ্যামা ওবায়েদ, মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপু, সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু, তানভীর আহমেদ রবীন (টেকনোক্র্যাট), শহীদুল ইসলাম বাবুল, হাবিবুর রশীদ হাবিব, সাঈদ আল নোমানও মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন। এর বাইরে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকে সরকারের কোনো দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

নির্বাচনে সবচেয়ে ভালো ফল হয়েছে, এমন অঞ্চল থেকে মন্ত্রিসভায় কাউকে কাউকে স্থান দেওয়া হতে পারে। সিলেট অঞ্চল থেকে আলোচনায় রয়েছে আরিফুল হক চৌধুরী ও খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের নাম।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও খুলনা-৫ আসনের ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ারকে হারানোর জন্য আলী আজগর লবিকে মন্ত্রিসভায় রাখতে পারে বিএনপি। এ ছাড়া কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের বিএনপি প্রার্থী শরীফুল আলম তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৪৩ হাজার ভোটে পরাজিত করার জন্য তাকে মন্ত্রিসভায় রাখা হতে পারে। বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফলে শরীফুল আলম পেয়েছেন ১ লাখ ৮৭ হাজার ১৫৯ ভোট। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আতাউল্লাহ আমীন রিকশা প্রতীকে পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৯৫ ভোট।

মন্ত্রিপরিষদে থাকবেন যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা : আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দাবিতে রাজপথে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলো নিয়ে জাতীয় সরকারের ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপি। ফলে নতুন মন্ত্রিপরিষদে থাকবেন যুগপৎ আন্দোলনের একাধিক নেতা। দলটির নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা একসঙ্গে ছিল, সরকার গঠন প্রক্রিয়াতেও তাদের অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা হবে। অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল কাঠামোর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনর্গঠন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণই হবে এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। আলোচিতদের মধ্যে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ড. রেজা কিবরিয়াকে অর্থ মন্ত্রণালয়, এনডিএম ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া ববি হাজ্জাজ, বিজেপির ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুরু এবং টেকনোক্র্যাট কোটায় ১২-দলীয় জোটপ্রধান ও জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারকেও মন্ত্রিসভায় নেওয়া হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে।