ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যে প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে, তা ছিল নির্ভরযোগ্য এবং সুপরিচালিত, যা গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ নির্বাচনে লড়াই ছিল প্রকৃত অর্থেই প্রতিযোগিতামূলক, যেখানে মৌলিক স্বাধীনতাকে সম্মান করা হয়েছে। গতকাল শনিবার ঢাকায় ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সদস্য (এমইপি) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের (ইইউইওএম) এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলা হয়।
ইইউইওএমের প্রধান ইভার্স ইজাবস গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ওপর মিশনের প্রাথমিক প্রতিবেদন সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করেন।
ইভার্স ইজাবস বলেন, এ নির্বাচনের আইনি কাঠামো অনেকাংশেই আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল। নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও স্বচ্ছভাবে কাজ করেছে, যা অংশীজনদের আস্থা ধরে রেখেছে এবং নির্বাচনের সততা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করেছে। নির্বাচনের প্রতি জনআস্থা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ও ভোটারদের সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করার ক্ষেত্রে নাগরিক পর্যবেক্ষক, ফ্যাক্ট-চেকার, তরুণ ও নারী কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
প্রধান পর্যবেক্ষক জোর দিয়ে বলেন, নারীদের জন্য সীমিত রাজনৈতিক পরিসর তাদের সমান অংশগ্রহণকে ব্যাহত করেছে। এ ছাড়া কিছু এলাকায় বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যের কারণে সৃষ্ট বিক্ষুব্ধ জনতার আক্রমণের (মব অ্যাটাক) আশঙ্কা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে কিছুটা ব্যাহত করেছে। ইতিবাচক উদ্যোগ না থাকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও সংখ্যালঘুরা এখনো রাজনৈতিক পরিসরে পর্যাপ্ত প্রতিনিধিত্বের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।
তিনি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ক্রমবর্ধমান উত্তরণের সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং সেইসঙ্গে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার ও জবাবদিহি জোরদারের অভিপ্রায়ে একটি নতুন পথরেখা নির্ধারণ করার জন্য তাগিদ দেন।
ইইউইওএম সবমিলিয়ে ২২৩ জন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়। এর পাশাপাশি ইইউর সব সদস্য রাষ্ট্র, কানাডা, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড থেকে আসা পর্যবেক্ষকরা ৬৪টি জেলায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণে নিযুক্ত ছিলেন।
আইআরআই : মার্কিন কংগ্রেসম্যান ডেভিড ড্রেয়ারের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউটও (আইআরআই) এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছে। আইআরআইয়ের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নসহ যেসব প্রতিশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে নাগরিকরা ভোটের মাধ্যমে গণরায় দিয়েছে, সেই প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য তাগিদ দেওয়া হয়।
কমনওয়েলথ : জনগণ শান্তিপূর্ণভাবে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে বলে মনে করে কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দল। গতকাল ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন পর্যবেক্ষক দলের চেয়ারপারসন ও ঘানার সাবেক রাষ্ট্রপতি নানা আদ্দো আকুফো আদ্দো। এ বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন কমনওয়েলথ মহাসচিবের কাছে জমা দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
কমনওয়েলথ দলটি বলেছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে সংলাপের ফল হিসেবে তৈরি করা জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে কিছু রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল, যার মধ্যে একটি বড় দলের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ও রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিপুলসংখ্যক নারী ভোটার অংশ নিলেও প্রার্থী হিসেবে নারীর উপস্থিতি খুবই কম ছিল। পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন। অনলাইন হয়রানি ও বিদ্বেষমূলক প্রচারণা নারীদের জন্য বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে। যুবসমাজের সক্রিয়তা বাড়লেও রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে তাদের প্রভাব সীমিত বলে মন্তব্য করা হয়।