প্রায় ৩ দশক পরে জেগে উঠেছে হাজারও মানুষের স্বপ্নের ঠিকানা পদ্মার চর। রাক্ষুসে পদ্মার ছোঁবলে মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার প্রায় ৪টি ইউনিয়নের ২৫টি গ্রাম পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। প্রায় ৩০ বছর আগে বিলীন হওয়া উপজেলার সাবেক লৌহজং ইউনিয়নের পাটলি ও গাউপাড়া মৌজা, কুমারভোগ ইউনিয়নের রানিগাঁও ও খড়িয়া মৌজা, গাঁওদিয়া ইউনিয়ন রানাদিয়া মৌজায় এবং শরিয়তপুরের সীমানা কলিকাল ও আডম মৌজার সীমানায় পদ্মার চর জেগে উঠে। যা আনুমানিক দৃশ্যমান হয়েছে প্রায় দুই হাজার একর জমি।
দীর্ঘ ৩০ বছরের প্রতীক্ষা শেষে এই নতুন চর বাস্তুহারা মানুষের জন্য স্বস্তি ও আশার উপলক্ষ্য হয়ে এসেছে। পৈতৃক ভিটেমাটি ফিরে পাওয়ার আশায় বুক বাঁধছেন নদী ভাঙনের শিকার মানুষগুলো। নদীর মাঝখানে জেগে ওঠা এই নতুন ভূমি এখন হাজারও মানুষের চোখে নতুন স্বপ্নের বীজ বুনছে।
স্থানীয়রা নতুন জেগে উঠা চরের মাটি উর্বর ও চাষাবাদে খুব উপযোগী বলে তারা মনে করছেন। ইতোমধ্যে জমিতে চাষাবাদ ও যাতায়াত শুরু করেছেন।
সেখানে অতীতে নিজেদের কিংবা পূর্ব পুরুষদের বসতি ছিল। এ চরকে ঘিরে অতীতে ভিটেমাটি হারানো মানুষ চাষাবাদ করে সবুজ বিপ্লবের স্বপ্ন দেখছেন। এদিকে চর জেগে উঠার পর শতাধিক অধিবাসী দলবদ্ধভাবে জেগে ওঠা নতুন চরে মাপজোপ করতে যান। এ চরটির আয়তন কত তা নির্দিষ্টভাবে জানা না গেলেও প্রাথমিকভাবে বেসরকারি একটি সূত্র জানিয়েছে এ চরটিতে প্রায় দুই হাজার একরের বেশি জমি রয়েছে।
এ দিকে পদ্মায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে প্রতিবছরই বিলীন হয়ে থাকে লৌহজংয়ের বিভিন্ন এলাকা। তবে গত বছর সরকার কঠোর পদক্ষেপের কারণে পদ্মায় বালু উত্তোলন করতে পারেনি। ফলে দ্রুত চরগুলো জেগে উঠেছে বলে জানান স্থানীয়রা। তাদের দাবী অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ রাখলে লৌহজংয়ে আর ভাঙন দেখা দিবে না। তাই সরকারের পদক্ষেপ যেনো অটল থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন চর শুধু আবেগ নয়, অর্থনীতির জন্যও আশাব্যঞ্জক। এখানে পরিকল্পিতভাবে কৃষি কাজ শুরু হলে স্থানীয় খাদ্যের চাহিদা মিটবে। তবে চরের জমি দখল নিয়ে যাতে কোনো সংঘাত সৃষ্টি না হয়, সেদিকে প্রশাসনের সজাগ দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
স্থানীয়দের মতে নব্বই দশকের শেষভাগে এক ভয়াবহ ভাঙনে বিলীন হয়ে গিয়েছিল এই জনপদ। ভিটেমাটি, ফসলি জমি আর শৈশবের স্মৃতি সবই তলিয়ে গিয়েছিল নদীর অতল গহ্বরে।
সেই সময়কার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে সরজমিনে গিয়ে কথা বলেন দেশ রূপান্তর প্রতিবেদক। তারা জানান, প্রায় ২৬ বছর আগে এক রাতেই পাউপাড়া গ্রামটি মানচিত্র থেকে মুছে গিয়েছিল। নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারগুলো তখন বাধ্য হয়ে বিভিন্ন বাঁধ বা রাস্তার ধারে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কতটা ভয়ংকর অতীত ছিল৷ একমাত্র তারাই বুঝবে যাদের সর্বনাশ করেছে পদ্মা। ভিটেমাটিহীন পরের জমিতে থাকতে হয়েছে এতগুলো বছর৷ আর আল্লাহর নিকট দোয়া করতাম যে কবে বসত বাড়ির জমিগুলো জেগে উঠবে৷ অবশেষে জেগেছে। কিছুদিন জমিতে ফসলি রোপণ করব৷ তারপর সম্ভব হলে ঘর তুলব বলে জানান তারা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পদ্মার বুকে জেগে উঠা ধূ ধূ বালুচরের কিছু অংশে ইতোমধ্যে ঘাস জন্মানো শুরু করেছে। কেউ কেউ উৎসাহী হয়ে নিজের সীমানা নির্ধারণের চেষ্টাও করছেন।
নদী ভাঙনের শিকার প্রবীণ খালেক মিয়া ও রানীগাও গ্রামের বাসিন্দা মোশারফ বলেন, ৩০ বছর আগে আমার সব এই নদী নিয়ে নিয়েছিল। ভাবিনি মরার আগে আবার নিজের মাটির দেখা পাব। এখন শুধু চাই সরকার যেন আমাদের আইনিভাবে এই জমি ফিরে পেতে সাহায্য করে।
সাবেক রানাদিয়া গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, জেগে উঠা এ চরে অতীতে নিজেদের ও পূর্ব পুরুষদের বসতি ছিল৷ আর এস রেকর্ডের পরে ১৯৯৫ সালে লৌহজং উপজেলা থেকে বেশ কয়টি গ্রাম পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়৷ প্রায় ৩০ বছর পর পদ্মা নদীতে চর জেগে উঠেছে সাবেক লৌহজং ইউনিয়ন, পাটলী মোজার ৫০, গাউপাড়া ৬০, গাওদিয়ায় ২৫ ও রানাদিয়া মৌজায় ২৫ ভাগ জমি জেগে উঠেছে৷ এছাড়াও শরিয়তপুরের কলিকাল ও আডম মৌজার জমি জেগেছে৷ বর্তমানে আর এস রেকর্ড মালিকরা তাদের পৈত্রিক জমি চিহ্নিত করে চাষাবাদ করছে৷
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ হাসান উদ দৌলা জানান, নদী ভাঙন, খাল দখল ও জলাবদ্ধতার কারণে লৌহজং কৃষিখাতে ব্যাপক লোকসান হচ্ছিল। তবে এসকল আর জেগে উঠায় অনেকটা ক্ষতিপূরণ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা সবাইকে সেবা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছি। সরকারিভাবে কৃষি অধিদপ্তর তাদের সহায়তা করা হবে।
এ বিষয়ে লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ববি মিতু দেশ রূপান্তরকে বলেন, পদ্মায় জেগে উঠা চর জেগেছি বিষয়টি অবগত রয়েছি। যাদের জমি অবশ্যই সরকারিভাবে তাদের কাগজপত্র দেখে তাদেরই বুঝিয়ে দেওয়া হবে৷ তবে সময় সাপেক্ষে। আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এক সময় পদ্মা বিলীন হওয়া জমির মালিক আমাদের নিকট কোনও আবেদন করেনি। তারপর আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি দেখব।