ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার মধ্যদিয়ে কেটে গেল রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। সরকার গঠনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি। এর মধ্যে গতকাল রবিবার ভোট-পরবর্তী প্রথম কার্যদিবসেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের পুঁজিবাজার। শেয়ারবাজারে ব্যাপক উত্থানের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। লেনদেনে টাকার পরিমাণের সঙ্গে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিটের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্সে যুক্ত হয়েছে ২০০ পয়েন্ট। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক সিএসসিএক্স সূচক আগের দিনের চেয়ে ২৮৩ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর প্রথম কার্যদিবস (৬ আগস্ট) ডিএসইর ডিএসইএক্স সূচক ১৯৭ দশমিক ১৫ পয়েন্ট এবং সিএসইর সিএএসপিআই সূচক ৪৬৭ দশমিক ১০ বৃদ্ধি পেয়েছিল।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিগত সময়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক সরকারের যে অনিশ্চয়তা ছিল সেটি কেটে যাওয়ায় শেয়ারবাজারে চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে। এখন গণতান্ত্রিক সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করলে পুঁজিবাজারের সঙ্গে দেশের অর্থনীতিও ঘুরে দাঁড়াবে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, দিন শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ২০০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৬০০ পয়েন্টে অবস্থান করছে। ডিএসই শরিয়াসূচক ৩০ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ১২৭ পয়েন্টে এবং ডিএস৩০ সূচক ৮৬ দশমিক ১৮ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ২ হাজার ১৪৫ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে।
ডিএসইতে ৩৯৪টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ৩৬৪টি কোম্পানির, যা শতাংশ হিসেবে মোট লেনদেনে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের ৯২ ভাগ। মূল্য কমেছে ২৬টির এবং অপরিবর্তিত আছে ৪টির।
এদিন ডিএসইতে ১ হাজার ২৭৫ কোটি ৯ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৭৯০ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচনের পর আজ প্রথম দিনে শেয়ারবাজারের যে চিত্র দেখা গেছে, সেটা বিনিয়োকারীদের প্রত্যাশা ছিল। আজকের লেনদেনে কোনো জুয়া খেলা হয়নি। কারণ অন্তর্বর্তী সরকার মার্জিন ঋণের ক্ষেত্রে কড়াকড়ি দিয়েছে। ফলে যারা লেনদেন অংশগ্রহণ করেছেন, তারা নিজের টাকায় অংশগ্রহণ করেছেন। বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এমনটি হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে নতুন সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনেক। সেজন্য অন্তর্বর্তী সরকার বিদেশি ও সরকারি যেসব কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছে, তাদের তালিকাভুক্ত করতে পারলে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে এবং বাজার স্থিতিশীল হয়ে উঠবে।
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে সূচকের বড় উত্থানের মধ্যে দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে টাকার পরিমাণে লেনদেন অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি উভয় পুঁজিবাজারে লেনদেনে অংশ নেওয়া অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ার এবং মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দাম বেড়েছে।
অন্য শেয়ারবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সিএসসিএক্স সূচক আগের দিনের চেয়ে ২৮৩ দশমিক ৮৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে অবস্থান করছে ৯ হাজার ৫৫৫ পয়েন্টে। সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৮৪ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ হাজার ৫১৮ পয়েন্টে, শরিয়াসূচক ১৯ দশমিক ১৯ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৯৩৮ পয়েন্টে এবং সিএসই ৩০ সূচক ৪৯৬ দশমিক ৪১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১৪ হাজার ৬৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
সিএসইতে ২৪৭টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে ২২টি কোম্পানির, কমেছে ১৭টির এবং অপরিবর্তিত আছে ৮টির।
এদিন সিএসইতে ২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ৯ কোটি ৪০ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট।
বাজার পরিস্থিতির বিষয়ে পুঁজিবাজারে স্টক ব্রোকারদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ডিবিএ) প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলাম বলেন, আজকের (গতকাল) বাজারের যে চিত্র দেখা গেছে, এটি আমাদের প্রত্যাশা ছিল। বিনিয়োগকারীরা দেড় যুগের বেশি সময় থেকে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অপেক্ষায় ছিল। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জনগণের সে প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। ফলে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিনিযোগকারীরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে তাদের অবস্থান জানান দিচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে দেশের পুঁজিবাজার ছিল বিধ্বস্ত, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নতুন সরকারকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বাজারে নির্ভরযোগ্য ও ভালো কোম্পানি নিয়ে আসতে হবে। কারণ বর্তমান বাজারে বিনিয়োগকারীদের চাহিদা থাকলেও সেই তুলনায় কোনো আইপিও সরবরাহ নেই।
আরেকটি বিষয় হলো নতুন সরকারকে অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে শেয়ারবাজারকে গুরুত্ব দিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। আশা করছি, তারেক রহমানের নেতৃত্বে একটি সুন্দর ও বিজ্ঞ মন্ত্রিসভা গঠন হবে। সব খাত থেকে পুঁজিবাজার ও বিনিযোগকারীদের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি।
একই প্রসঙ্গে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ারধারী পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশের পুঁজিবাজার ছিল অবহেলিত এবং লুটপাটের বাজার। যেখানে বিনিয়োগকারীদের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। একটি চক্র শেয়ারবাজারকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। জনগণ ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর মানবাধিকারের আশা ছেড়ে দিয়েছে। বিনিযোগকারীরা হতাশায় বাজার ছেড়ে চলে গেছেন। এখন গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে আসায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশা জেগেছে এবং তারা বিনিয়োগ করতে শুরু করেছেন। তবে এখন তাদের মনে পূর্বের অন্যায় ও অবিচারের ভয় রয়ে গেছে। সেজন্য নতুন সরকারের কাছে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনেক। তারা শেখ হাসিনার মতো স্বৈরাচারী সরকার দেখতে চায় না। আর সেই পদ্ধতিতে সরকার টিকে থাকাও সম্ভব নয়। সরকারকে টিকে থাকতে হলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে বিনিয়োগকারীদের গুরুত্ব দিয়ে টিকে থাকতে হবে।
বিশেষ করে নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেসব বিষয় বাস্তবায়নে দ্রুত উদ্যোগ নিতে হবে এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে দেশ-বিদেশের বিনিয়োগকারীরা আবার পুঁজিবাজারে ফিরে আসবেন এবং দেশের অর্থনীতি লাভবান হবে।
তিনি বলেন, রবিবারের (গতকাল) সূচক-লেনদেন ও বাজারে অংশগ্রহণকারীর চিত্র দেখে বোঝা যাচ্ছে, বিনিয়োগকারীরা ফিরে আসতে শুরু করেছেন। তারা একটি সুন্দর ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজার দেখতে চাচ্ছেন। তবে এটাও সত্য বিগত সময়ের ব্যাপক অনিয়মের ধকল বাজারকে আরও কিছুদিন বয়ে বেড়াতে হবে। ফলে আরও কিছুদিন বাজার মন্দাভাব বিরাজ করতে পারে। তবে আমার আত্মবিশ্বাস, বাজার স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়াবে এবং বিনিযোগকারীদের আস্থার জায়গায় পৌঁছাবে।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, দেশে এখন জাতীয়তাবাদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। জনগণ তাদের দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচিত সরকারের মাধ্যমে দেশে উন্নয়ন কর্মকা- শুরু হবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসবে। আবার সরকারকে কাজ করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে একটা নতুন জোয়ার আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে বেসরকারি খাতের সঙ্গে দেশের পুঁজিবাজারেও গতি আসবে বলে আমি মনে করি।