বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর সরকার গঠনের পথে হাঁটছে। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়া বিএনপি প্রধান তারেক রহমানকে দিল্লি সতর্কতার সঙ্গে উষ্ণ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলায় দেওয়া এক বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি একটি ‘গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থনের অঙ্গীকার করেন। একই সঙ্গে তিনি ‘দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার’ আগ্রহ প্রকাশ করেন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে ভারত কি পারবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোড়া লাগাতে? এক প্রতিবেদনে সে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। সংবাদমাধ্যমটি বলছে, মোদির এই বার্তার সুর ছিল ইতিবাচক, তবে অত্যন্ত সতর্ক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জেন-জি নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই দুই প্রতিবেশীর সম্পর্ক টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দুপক্ষের মধ্যেই এক অবিশ্বাসের দেয়াল।
দিল্লির কাছে বিএনপি কোনো অজানা শক্তি নয়। ২০০১ সালে তারেক রহমানের মা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি যখন ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতায় ফিরেছিল; তখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। (দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে) বিএনপি-জামায়াত আমল ছিল অস্থিরতা ও গভীর পারস্পরিক অবিশ্বাসে ভরা। অনেক বাংলাদেশি দিল্লিকে দোষারোপ করেন শেখ হাসিনার মতো একজন ক্রমশ স্বৈরাচারী হয়ে ওঠা শাসককে সমর্থনের জন্য। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানিবণ্টন, বাণিজ্য বাধা এবং উসকানিমূলক মন্তব্যের মতো পুরনো ক্ষোভ। বর্তমানে ভিসা সেবা অনেকাংশে স্থগিত, আন্তঃসীমান্ত ট্রেন ও বাস চলাচল বন্ধ এবং ঢাকা-দিল্লি ফ্লাইট সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। দিল্লির জন্য এখন প্রশ্ন বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা হবে কি না তা নয়, বরং প্রশ্ন হলো কীভাবে সেই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া হবে। একদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও উগ্রবাদ দমনের মতো নিজেদের ‘রেড লাইন’ বা স্পর্শকাতর ইস্যুতে নিজেদের কঠোর অবস্থান অক্ষুণœ রাখা, আর অন্যদিকে যে কারণে বাংলাদেশ ভারতের ঘরোয়া রাজনীতির আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এমন রাজনৈতিক কথাবার্তা কমানো। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সম্পর্কের ‘রিসেট’ বা নতুন সূচনা সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন সংযম এবং পারস্পরিক সহযোগিতা। লন্ডনের সোয়াস ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের শিক্ষক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন বিএনপি বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ এবং মধ্যপন্থি দল, যা ভারতের জন্য এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে নিরাপদ বিকল্প। তবে প্রশ্ন থেকে যায় তারেক রহমান কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন? তিনি স্পষ্টতই ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক স্থিতিশীল করতে চাইছেন। কিন্তু বলা যতটা সহজ, করা ততটা সহজ নয়। দিল্লিভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিসের কর্মকর্তা স্মৃতি পট্টনায়েক বলেন, বাংলাদেশের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ নেই। একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে তাদের সেই অধিকার আছে। অস্বাভাবিক ছিল, হাসিনার আমলে প্রায় কোনো যোগাযোগ না থাকা। তখন পেন্ডুলাম একদিকে বেশি হেলে পড়েছিল। এখন ঝুঁকি হচ্ছে, এটি অন্যদিকে খুব বেশি হেলে পড়ে কি না। বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসিত হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের দমন-পীড়নের ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। জাতিসংঘের মতে, ওই সহিংসতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতেই প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। তাকে প্রত্যর্পণ করতে ভারতের অস্বীকৃতি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গড়ার চেষ্টাকে আরও জটিল করেছে। গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকা সফর করেন এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।